মানসিক ভাবে ভারসাম্য হারিয়েছে, বিশ্বাসঘাতক, নাকি স্রেফ ঠগ? পশ্চিমের মুখ্য সংবাদ মাধ্যম গুলি একসঙ্গেই আমেরিকার বিশেষ বাহিনীর বিরুদ্ধে এডওয়ার্ড স্নোডেনের দেওয়া এক সারি সন্দেহ করার মতো খবর ছেপে, তার পরে আবার সকলে মিলে তার কাদের অসাধু উদ্দেশ্য ও গোপন কারণ নিয়ে প্রামাণ্য উদ্ধারের কাজে. কিন্তু সিরিয়াস বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন: যে মানুষ, সজ্ঞানে – তার ওপরে আবার নিজের হাঁ না লুকিয়ে - বিশেষ বাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলতে পেরেছে, সে খুবই আত্মনির্ভরতার উদাহরণ দিতে পেরেছে.

এডওয়ার্ড স্নোডেন ইন্টারনেটে নাগরিকদের উপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গোয়েন্দাগিরির ব্যবস্থার উপর থেকে গোপনীয়তার আবরণ ছিঁড়ে দিয়েছে. বুজ অ্যালেন কোম্পানীর ২৯ বছর বয়সী এই কর্মী, যে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার পাখার নীচে বসে কাজ করেছে, সে সেই তথ্য উন্মোচন করেছে যে, গ্রাহকদের সামাজিক সাইটের কাজকর্ম, অংশতঃ ফেসবুক, গুগল ও স্কাইপে – আর তা শুধু মার্কিন নাগরিকদেরই নয়, বরং আরও অন্যান্য অনেক দেশের, - আমেরিকার বিশেষ বাহিনীর তরফ থেকে কপি করা হয় ও তা আড়ি পেতে শোনাও হয়. এই ধরনের সুযোগ আমেরিকার বিশেষ বাহিনীর জন্য করে দেয় কিছু টেলিফোন পরিষেবা কোম্পানী, অংশতঃ কোম্পানী ভেরিঝোন. যেমন দেখা গেল যে, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কথাবার্তাও শীর্ষ সম্মেলন ও ফোরামের সময়ে আড়ি পেতে শোনে.

আমেরিকা ও ইউরোপের নেতৃস্থানীয় সংবাদ মাধ্যম স্নোডেনের দেওয়া দলিল প্রকাশ করেছে. আর তারপরে, নিজেদের উদ্দেশ্য করা সেই বিশেষ বাহিনীর ও হোয়াইট হাউসের প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা রকমের প্রকাশের অযোগ্য মন্তব্য শোনার পরে, ঠিক করেছে এই তথ্য ফাঁস করে দেওয়া লোকটিকেই খারাপ প্রমাণ করতে – তার “মানসিক পরিস্থিতির চিত্র” তৈরী করতে. নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার মতে, স্নোডেন সেই যুবা বয়সেই প্রমাণ দিয়েছে তার মানসিক ভারসাম্যহীনতার, সে তার মায়ের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলত না আর এমনকি প্রতিবেশীদের সম্ভাষণেরও উত্তর দিত না. এর থেকে সিদ্ধান্ত: স্নোডেন – বিশ্বাসঘাতক, যে সমাজে বিশ্বাসের অর্থই বোঝে না. সে “আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে!” – এই রকম নিন্দা করেছেন এই প্রবন্ধের লেখক এক মনস্তাত্বিক ডেভিড ব্রুকস. তাঁর মতে, স্নোডেন – একটা সাধারণ ঠগ: একলা মানুষ, যার মনে হতে পারে যে বিবেক ও বুদ্ধি রয়েছে, কিন্তু সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ খুবই দুর্বল. অন্যান্য প্রকাশনা আরও দূরে গিয়েছে, তারা রোগীর মানসিক রোগের ইতিহাস ছেপেছে.

এই ধরনের সিদ্ধান্ত মনে তো হয় না যে, বাস্তবের সঙ্গে কোন রকমের মিল আছে, বিশ্বাস করেন রাশিয়ার রাজ্যসভার আন্তর্জাতিক কাজকর্ম সংক্রান্ত পরিষদের সদস্য সেনেটর ইগর মরোজভ, তিনি বলেছেন:

“এমন একজন ব্যক্তি, যে নিজেকে এই ধরনের সামাজিক কাজের জন্য প্রস্তুত করেছে, তার মনের জোর খুবই শক্তিশালী হওয়া উচিত্. এই ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাওয়া – এটা ইতিমধ্যেই স্নোডেনকে প্রমাণ করে দেয় যে, খুবই শক্তিশালী, মানসিক ভাবে ভারসাম্য যুক্ত এক ব্যক্তিত্ব বলে. আজ সে স্রেফ নিজের আগে থেকে পরিকল্পিত ব্যবহারের পথ নির্দেশিকা অনুযায়ী কাজ করে চলেছে – যাতে নিজেকে রক্ষা করে নিজের ব্যক্তিত্বকে পরবর্তী কালেও বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়. সে শুধুশুধুই হংকং বেছে নেয় নি: আমি মনে করি যে, উইকিলিক্সের বিশেষজ্ঞরাও তাকে ফিরে যাওয়ার জন্য সঠিক রাস্তাই বের করে দিয়েছে”.

এখন স্নোডেন যা সহ্য করছে, তা এমনকি প্রত্যেক মানসিক ভাবে সুস্থ ও প্রশিক্ষণ পাওয়া লোকের পক্ষেও সহজ সাধ্য ব্যাপার নয়, এই কথা বিশেষ করে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র গুপ্তচর বিভাগের প্রাক্তন কর্মী লেভ করলকোভ বলেছেন:

“চাপ অত্যন্ত বেশী. আর মোটেও প্রত্যেকে এই রকম চাপ সহ্য কতে পারবে না. সে এই পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই নিয়েছে – তার মানে হল, সে এর জন্য প্রস্তুত. যে মানুষ, এই ধরনের মানসিক পদক্ষেপ নিতে তৈরী আছে, তার জানা উচিত্ সমস্ত রকমের দায়ভার সম্বন্ধেও. অন্য ব্যাপার হল যে, কারো তাকে আড়াল করা উচিত্”.

কিভাবে আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমের স্নোডেন সম্বন্ধে সম্পর্ক বদলেছে, তা নিয়ে অবাক হওয়ার মতো কিচ্ছু নেই – এটা একই ভাবে উইকিলিক্স নিয়ে স্ক্যান্ডালের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে. একই ধরনের মত্ত অবস্থায় সেখানের প্রকাশনা জুলিয়ান আসাঞ্জের ফাঁস করে দেওয়া ব্যাপার প্রচার করেছিল – আবার সেই রকমের উত্সাহ দেখিয়ে তারা আসাঞ্জের উপরে নোংরা মাখিয়েছিল.

স্নোডেনের প্রতি “জাতীয় স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা” সংক্রান্ত দোষারোপ সম্বন্ধে যা বলা যেতে পারে – তা হল যে, এটা বিবেক সংক্রান্ত প্রশ্ন, তা আমরা এখানের কাঠামোর বাইরেই রাখব. সে নিজেই আমেরিকার বিশেষ বাহিনীকে বলেছে বিশ্বাসঘাতক – তারা মানুষের ভিত্তি মূলক অধিকারের উপরেই হস্তক্ষেপ করে – ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তার উপরে.

স্নোডেনকে সংবাদ মাধ্যম এর মধ্যেই “কম্পিউটার যুগের রবিন হুড” বলে নাম দিয়েছে. অনেকাংশেই ভরসা করে মনে করা যেতে পারে যে, যদি বেশীর ভাগ লোক তার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সহমত না হতেও পারে, তবে তা বুঝতে পারে. আন্তর্জাতিক ভাবে সহানুভূতি, আর – যা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমেরিকার সমাজেরই – সেই দেশের সমাজ আর প্রশাসনের পক্ষে নয়.