মঙ্গলবারে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সুশীল কুমার শিন্ডে বিরোধী দলের এক প্রাক্তন নেতার প্রতি অভূতপূর্ব রকমের প্রশংসা করেছেন, বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের প্রতি – তাঁর ব্যক্তিগত গুণ ও কাজকর্মের সাফল্য, আর মোদ্দা কথা হল – তাঁর দেশের ধর্ম নিরপেক্ষ চিত্রের প্রতি অভিনন্দন উপযুক্ত অবস্থানের জন্য. মনে হচ্ছে, এটা স্রেফ তাঁর প্রতি সম্মানের জন্য বা এমনকি বিরোধীদের দলে ভাঙন ধরানোর জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকারই নয়. বরং খুব সম্ভবতঃ, এটা ভারতের ক্ষমতাসীন জাতীয় কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে নতুন এক জোট সঙ্গী খুঁজে বের করার চেষ্টা, যিনি, কংগ্রেসের মধ্যে উজ্জ্বল নেতার অনুপস্থিতির কারণে, এই জোটের নেতৃত্ব দিতে পারেন আগামী নির্বাচনে, আর তাতে জয়লাভ সম্ভব হলে – প্রধানমন্ত্রীর আসন নিতে পারেন.

বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে একেবারে এই কথা গুলিই বলেছেন: “নীতিশ কুমার – খুবই ভাল মানুষ, তাঁর রাজনীতি উন্নতির ভালোর জন্যই হচ্ছে, আর তাঁর রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষার জন্য অবস্থান প্রশংসার যোগ্য”.

কিসের জন্য বিহারের মুখ্যমন্ত্রী, যাঁকে কয়েকদিন আগেও মনে করা হয়েছে বিরোধীদের এক সবচেয়ে উজ্জ্বল নেতা, এত বেশী রকমের প্রশংসা পেয়েছেন মন্ত্রীসভার সদস্যের কাছ থেকে? এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সব শুরু হয়েছে জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে, যখন বিরোধী পক্ষের প্রধান শক্তি – ভারতীয় জনতা পার্টি, যারা আরও কিছু ছোট মাপের দলের সঙ্গে একজোট হয়ে জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা বানিয়েছে, তারা ঠিক করেছিল ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলের ও জোটের নেতৃত্ব কে দেবেন. বিজয়ী হতে পারলে এই ব্যক্তি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন. এই পদে খুবই জানা রকম ভাবেই নির্বাচিত হয়েছিলেন গুজরাত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী”.

আর যদিও শ্রী মোদীকে এগিয়ে দেওয়া সকলেই অপেক্ষা করেছেন, তবুও বিজেপি দলের নেতৃত্বের এই সিদ্ধান্তে নীতিশ কুমার অসন্তুষ্ট হয়েছেন, যিনি শুধু নিজের রাজ্যেই মন্ত্রীসভায় নেতা নন, বরং এই এনডিএ জোটে দ্বিতীয় বড় দলের – অর্থাত্ জনতা দল (ঐ) এর নেতাও বটে. তাঁর দল জোট ছেড়ে বের হওয়ার কথা ঘোষণা করেছে, তারা এই জোটে গত সতেরো বছর ধরে বিজেপি দলের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে.

তার প্রত্যুত্তরে বিহারের বিধানসভায় বিজেপি দলের সদস্যরা নীতিশ কুমারের নেতৃত্বে স্থানীয় মন্ত্রীসভার প্রতি অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিল, যদিও আগে তারাও এখানে এই জনতা দলের সঙ্গেই একসাথে জোটে ছিল. কিন্তু এই অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হয় নি – আর তার মূল কারণ হল নীতিশ কুমারকে সমর্থন করেছেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এখানকার বিধানসভার সদস্যরাই. তাই বরিস ভলখোনস্কি মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন:

“খুবই স্বাভাবিক যে, নীতিশ কুমারের বিরোধী পক্ষের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া, সেই জোটকে খুবই দুর্বল করে দিয়েছে. তাই খুব একটা অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয় যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ঐকতান শুরু হয়েছে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি প্রশংসা করে. আজ এরই মধ্যে অন্তিম না হলেও সর্বশেষ হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সুশীল কুমার শিন্ডের ঘোষণা”.

প্রসঙ্গতঃ, নীতিশ কুমারের প্রশংসা – এটা স্রেফ কৃতজ্ঞতা স্বীকার নয়.আসলে, যদি মনোযোগ দিয়ে ভেবে দেখা হয়, তবে সমস্ত পরিস্থিতির পিছনে এই আঞ্চলিক নেতার উচ্চাকাঙ্ক্ষাও রয়েছে, আর রয়েছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে নেতৃত্ব নিয়ে খুবই জটিল পরিস্থিতি.

বোঝাই যাচ্ছে যে, রাষ্ট্রের ধর্ম নিরপেক্ষ চরিত্র নিয়ে অটল থাকা সংক্রান্ত সমস্ত কথাবার্তা – এটা শুধু ভেঙে যাওয়ার আপাত কারণ. বড় করে দেখা হলে, নরেন্দ্র মোদীকে রাজনীতিতে ধর্ম পালকদের নীতি মেনে চলা লোক বলে মনে করেন শুধু তাঁর বিরোধী পক্ষের সবচেয়ে বেশী উত্তেজিত লোকরাই, যারা নিয়মিত ভাবে তাকে সেই প্রমাণ না হওয়া ২০০২ সালের গুজরাতের দাঙ্গায় মুসলমানদের ধ্বংস করার বিষয়ে প্রশ্রয় দেওয়া নিয়ে মনে করিয়ে দিয়ে থাকে.

ব্যাপার হল যে, নীতিশ কুমার বিহারের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও খুব একটা কম নয় এমন দেখার মতো, সাফল্য অর্জন করতে পেরে, যেমন পেরেছেন মোদী তাঁর গুজরাতে, নিজেই এই মোর্চার আগামী নেতা ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা পুষে রেখেছিলেন. তাই বিজেপি দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন মোদীর মতো এই রকমের একজন দ্ব্যর্থক নেতার উপরে হওয়াতে, তিনি স্রেফ ক্ষুব্ধ হয়েছেন.

আর সেই ব্যাপারটা যে, নীতিশ কুমারকে অমনি তাঁর এই কদিন আগের বিরোধীরা সমর্থন দিয়েছে, তাতেও কিছু অস্বাভাবিক নেই. ভারতে, যেখানে রাজনৈতিক জোট ভাঙে ও গড় খুবই তাড়াতাড়ি, সেখানে ছোট দলের এক জোট থেকে অন্য আরেক জোটে যাওয়া ব্যাপারটা – খুবই অভ্যস্ত বিষয়, তাই বরিস ভলখোনস্কি যোগ করেছেন:

“এখানে মনে রাখতে হবে যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস আজ নেতৃত্বের বিষয়ে একেবারেই স্পষ্ট সমস্যার সামনে উপস্থিত হয়েছে. বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী বয়সের কারণে মনে তো হয় না যে, আরেক বার প্রধানমন্ত্রী হতে যাবেন, আর নেহরু - গান্ধী ক্ল্যানের কম বয়সী সন্তান ও উত্তরাধিকারী রাহুল গান্ধী হয় নিজে দায়িত্ব নিতে রাজী হচ্ছেন না, অথবা স্রেফ ভয় পাচ্ছেন একই রকমের পরাজয়ের, যা রাজ্য স্তরে তাঁর নেতৃত্বে দলের নির্বাচনের ক্ষেত্রে হয়েছে”.

এই ভাবেই, কংগ্রেসের একটা আচমকা সুযোগ জুটে গিয়েছে: নেতা হিসাবে নিজের নির্বাচনী প্রচারে দেশের এক ছোট দলের হলেও এক জনপ্রিয় নেতাকে তুলে ধরার. এর ফলে, একদিকে যেমন নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানো সম্ভব হবে, তেমনই অন্য দিকে – এমন এক প্রধানমন্ত্রীকে পাওয়া সম্ভব হবে, যিনি নিজের কাজের ক্ষেত্রে সব সময়েই বাধ্য থাকবেন জোটের বড় সহযোগীদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে.