তুরস্কে শোরগোল হওয়া গণ বিরোধের জায়গায় এবারে তথাকথিত “সামাজিক ফোরাম” শুরু হয়েছে. দেশের বড় শহর গুলিতে বহু সংখ্যক পার্কে বিরোধীরা মিলিত হচ্ছে, যাতে নিজেদের প্রতিরোধের, বিরোধী কাজকর্মকে এই নামেই তারা ডাকেন, তার সম্ভাবনা ও অর্থ নিয়ে আলোচনা করা যায়. আগ্রহের বিষয় হল যে, এই ধরনের প্রবণতা ব্রাজিলেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে থামতে না চাওয়া প্রতিবাদ এবারে আরও শান্তিপ্রিয় ও শান্ত চরিত্রের হতে চলেছে. কিন্তু এটাই দুই দেশের ঘটনার মধ্যে একমাত্র মিল নয়, যা আমাদের পৃথিবীর দুটি ভিন্ন গোলার্ধে রয়েছে.

তুরস্ক ও ব্রাজিলের গণ বিক্ষোভের ঘটনার মধ্যে মিল ও অমিল নিয়ে নিজের মত “রেডিও রাশিয়াকে” দিয়েছেন “একবিংশ শতকে তুরস্ক” ইনস্টিটিউটের আমেরিকা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ওজদেমির আকবাল, তিনি বলেছেন:

“তুরস্ক ও ব্রাজিলের ঘটনার মধ্যে মিল ও অমিল নিয়ে মন্তব্য করার আগে আমার ইচ্ছে হয় আমাদের দেশে ধরে নেওয়া স্বৈরতন্ত্র নিয়ে কিছু বলার. এটা প্রশ্নটাই ঠিক করে না করা হয়েছে, আমাদের দেশে কোন স্বৈরতন্ত্র নেই. এখানে অন্য ব্যাপার নিয়ে বলার প্রয়োজন রয়েছে – “প্রতিনিধিত্ব মূলক গণতন্ত্র” ও “সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রের” মধ্যে তফাত নিয়ে. প্রতিনিধিত্ব মূলক গণতন্ত্রে সবকটি মতই হিসেবে আনা হয়. আর সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রে প্রশাসনের নীতিতে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকেই বিবেচনা করা হয় ও সংখ্যালঘুদের অবস্থানকে উপেক্ষা করা হয়ে থাকে. স্বাভাবিক ভাবেই, এটা বিশাল পরিমানে জনতার মধ্যে বিরক্তির উত্পাদন করে ও সংখ্যালঘুদের বাধ্য করে সক্রিয় কাজকর্ম করতে. আমার দৃষ্টিকোণ থেকে তুরস্ক ও ব্রাজিলে বর্তমানে এটাই হচ্ছে. এই ক্ষেত্রে তুরস্ক ও ব্রাজিলের ঘটনা একটা একই রকমের চরিত্র প্রতিফলিত করেছে.

দ্বিতীয়তঃ, যেমন ব্রাজিলও নিজেদের উন্নতিশীল অর্থনীতি নিয়ে নিজেদের এলাকার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে, তেমনই তুরস্ক আজ খুবই শক্তিশালী স্থানীয় ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে. দুই দেশই আজ নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে গেলেও, বলা যেতে পারে যে, পরম্পরা মেনেই নিজেদের অর্থনৈতিক সূচক গুলিকে ভাল করছে.

বিভিন্নতা নিয়ে যা বলা যেতে পারে, তা হল যে, এখানে আলাদা করা দরকার প্রাথমিক ভাবে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষা শক্তির এই সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ নিয়ে. আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ব্রাজিলের পুলিশ অনেক কম শক্তি প্রয়োগ করেছে. তুরস্কে এই ছবি একেবারেই অন্য রকমের. তাছাড়া, অনেকটাই আলাদা হল দুই দেশের নেতাদের কথা বলার সুর. যদি ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি দিলমা রুস্সেফ্ফ ঘোষণা করে থাকেন যে, “ব্রাজিলের যুব সমাজের জন্য তিনি গর্ব বোধ করেন”, “সেই সব মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে পেয়েছেন, যারা দেশের মন্ত্রীসভার পদত্যাগ দাবী করেছে” ও “সামাজিক পুনর্গঠন বাস্তবায়ন করা – এটা প্রশাসনের কর্তব্য”, তাহলে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের প্রতি সম্পূর্ণ অন্যভাবে দৃষ্টিপাত করেছেন. অর্থাত্, দুই দেশের ঘটনার মধ্যে কিছু একটা মিল রয়েছে, কিন্তু তফাতও রয়েছে”.

কিছুটা অন্যরকম ভাবে এই পরিস্থিতির দিকে দেখেছেন আমাদের আরেক আলোচনা সঙ্গী – সাও পাওলো শহরের তুরস্ক- ব্রাজিল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি প্রফেসর মুস্তাফা গিওকটেপে, তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“তুরস্ক ও ব্রাজিলের বিরোধের মধ্যে কোন মিল নেই. কোন এক রকমের ষড়যন্ত্র বলে মনে করার কারণ হয়েছে শুধু একটাই, সেটা হল যে, একই সময়ে শুরু হওয়া. তুরস্কে ইস্তাম্বুলের লোকদের অহিংস বিরোধই পরে খুবই গুরুতর রাজনৈতিক ও আদর্শের বিরোধে পরিণত হয়েছে, যা প্রায় সারা দেশকেই এর মধ্যে টেনে এনেছে. ব্রাজিলের ঘটনার মধ্যে কোন রকমের আদর্শগত কারণই নেই.

এখানে গণ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে জনগনের বিভিন্ন স্তরের মানুষ. তাদের মধ্যে, যেমন অংশ নিয়েছে আমার ছাত্ররাও. তাদের মধ্যে একজন – খুবই দরিদ্র, অন্যজন – ধনী ও তার বেশ কয়েকজন আত্মীয় এই দেশের পার্লামেন্টের সদস্য. ব্রাজিলের মিছিলের লোকরা রাস্তায় নেমেছেন কোন নির্দিষ্ট আদর্শের স্লোগান নিয়ে নয়. তারা বেরিয়েছেন, যাতে প্রশাসনের নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য নিজেদের অসন্তোষকে প্রকাশ করতে পারেন – আর সেটা হল, পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির জন্য অসন্তোষ. সমাজবাদীরা চেয়েছিল এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে, কিন্তু তারাও ভীড়ের পক্ষ থেকে খুব শক্তিশালী বাধার সামনে পড়েছে, তাদের পতাকা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে. জনগন প্রতিবাদ করেছেন সেই স্লোগান দিয়ে “অহিংস ও রাজনৈতিক দল বিহীণ” ভাবে.

তুরস্কে এই মিছিল এবারে প্রতিবাদে পরিণত হয়েছে দেশের প্রশাসন ও সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে. ব্রাজিলে জনগন নিজেদের রাষ্ট্রপতি দিলমা রুস্সেফ্ফকে সম্মান করেন. ব্রাজিলের মিছিলের লোকরা দেশের দুর্নীতি গ্রস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মিছিল করেছে, তারা দেশের ইমেজ তৈরী করার জন্য প্রকল্পে অনিয়ন্ত্রিত রকমের অর্থ বরাদ্দের বিরুদ্ধে, যা করা হয়েছে দেশে ফুটবলের বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য, তার বরং চেয়েছে দেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থার জন্য ভাল করার দাবী জানিয়েছে, কিন্তু তারা দেশের মন্ত্রীসভা বা রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে একেবারেই নয়”.

আপনারা এই ঘটনা গুলির প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের মত শুনলেন, যা বর্তমানে তুরস্ক ও ব্রাজিলে হয়েছে. এই মূল্যায়ণ আমরা দেখতেই পাচ্ছি যে, খুবই বিভিন্ন ধরনের – যেমন সমস্যা গুলিও ভিন্ন রকমের, যা এই দুই দেশের মধ্যে রয়েছে. কিন্তু বাস্তব হল যে, যেমন তুরস্কে, তেমনই ব্রাজিলে নিজেদের সরকারের নীতির সঙ্গে অনেকেই একমত নন – আর এই বাস্তব কারণ, সমস্ত রকমের পূর্বাভাসেই হিসেবের মধ্যে আনা দরকার.