মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র সচিব জন কেরি প্রথম সরকারি ভাবে ভারত সফরে গিয়েছেন. তাঁর এই সফরের প্রধান ফলাফল হয়েছে ব্যবসায়িক সহযোগিতা বিষয়ে প্রসার নিয়ে সমঝোতা, প্রাথমিক ভাবে, জ্বালানী ক্ষেত্রে, উচ্চ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে, সামরিক ও নিরাপত্তা রক্ষা ক্ষেত্রে. প্রসঙ্গতঃ, সমস্ত পারস্পরিক বিরক্তির কারণ পররাষ্ট্র প্রধানের পক্ষে দূর করা সম্ভব হয় নি. এর ব্যাপারের প্রমাণ হয়েছে ২২০ জন আমেরিকার আইন প্রণেতার পক্ষ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা নেওয়ার জন্য হোয়াইট হাউসকে এক অভূতপূর্ব আহ্বান. তারা ভারতকে ব্যবসার ক্ষেত্রে বাছাই করে কাজের অপরাধে অভিযুক্ত করেছে. এই প্রসঙ্গে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব জন কেরির দিল্লী সফর তাঁর বর্তমানের আন্তর্জাতিক সফর সূচীর মধ্যে একটি মুখ্য ঘটনাই হয়েছে, যে দুই সপ্তাহের মধ্যে তিনি নিকটপ্রাচ্য ও এশিয়ার সাতটি দেশে গিয়েছেন. ভারতের রাজধানীতে মুখ্য সাক্ষাত্কার ও আলোচনা গুলি হয়েছে সোমবারে. চতুর্থ ভারত – মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক আলোচনা বৈঠকের পরে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব ভারতের পররাষ্ট্র প্রধান সলমান খুরশিদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, আমেরিকার কূটনৈতিক বিভাগের প্রধানকে স্বাগত জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ”.

তাঁর দিল্লী সফরের মুখ্য উদ্দেশ্য - আর্থ বাণিজ্য সম্পর্কের উন্নতি বলে জোর দিয়ে উল্লেখ করে জন কেরি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি আমেরিকার সেনেটের প্রতিনিধি দলের প্রথম সফরের সদস্য ছিলেন, যখন নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতের লিবারেল অর্থনৈতিক সংশোধনের সময়ে তাঁরা এসেছিলেন. তাছাড়া পাঁচ বছর আগে জন কেরি, সেনেটের আন্তর্জাতিক কমিটির প্রধান হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে পারমানবিক শক্তি সহযোগিতা নিয়ে মূল চুক্তিটি আমেরিকায় সমর্থন করানোর ব্যবস্থা করেছিলেন, কিন্তু প্রাক্তন সব কৃতিত্ব, মনে তো হয় না যে, আজ জন কেরিকে তাঁর বর্তমানের সমস্যা সমাধানে সহায়তা করবে. কারণ এর আগে ওয়াশিংটন ও দিল্লী প্রায় বাণিজ্য যুদ্ধের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছিল. সের্গেই তোমিন এই প্রসঙ্গে আরও বলেছেন:

“এই সফরের প্রাক্কালে মার্কিন কংগ্রেসের ১৮০ জন সদস্য ও ৪০ জন সেনেটর রাষ্ট্রপতি ওবামাকে ও পররাষ্ট্র সচিব জন কেরিকে আহ্বান করেছিলেন এক অভূতপূর্ব চিঠি দিয়ে, যেখানে তাঁরা আহ্বান করেছিলেন ভারতের উপরে চাপ বাড়ানোর জন্য, যাতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিরক্তির কারণ গুলিকে দূর করা সম্ভব হয়. “আমরা সত্বর ব্যবস্থা নিতে দাবী করছি আর আমাদের ভারতীয় সহকর্মীদের গোচরে আনতে বলছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমস্ত রকমের বাণিজ্যের হাতিয়ারকেই কাজে লাগাবে, যদি ভারত বর্তমানের বাছাইয়ের নীতি বদল না করে”, - বলা হয়েছে এই চিঠিতে”.

আমেরিকার উচ্চ পর্যায়ের লোকদের বিরক্তির উদাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে বৃহত্ মার্কিন কোম্পানীদের পক্ষ থেকে এক লবি করার সংস্থা বানানো – ভারতে সঙ্গে স্বচ্ছ বাণিজ্যের জন্য জোট. দিল্লীতে পর্যবেক্ষকরা বলেছেন যে, আমেরিকার লোকদের এমনকি চিনের সঙ্গে, যাদের সঙ্গে তারা বিগত কয়েক দশক ধরেই বাণিজ্য বিষয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে, তাদের জন্যও এই রকমের সংস্থা নেই.

আমেরিকার ব্যবসার পক্ষ থেকে তীক্ষ্ণ অসন্তোষের কারণ হয়েছে অংশতঃ, ভারতের প্রশাসনের পক্ষ থেকে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক যন্ত্রপাতি ও পরিবেশ বান্ধব জ্বালানী শক্তি উত্পাদনের যন্ত্রপাতি শুধুমাত্র স্থানীয় কোম্পানীর কাছ থেকে কিনতে চাওয়া (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের কাজকে বলা হয়েছে সংরক্ষণশীল কাজ বলে). তাছাড়া, ভারতের ওষধি নির্মাণ কোম্পানী গুলির পক্ষ থেকে আমেরিকার ওষুধের মূল মৌল গুলি স্থানীয় শিল্প ব্যবহার করে বিশাল পরিমানে তৈরী করাকে মনে করা হয়েছে, আমেরিকার বুদ্ধিজাত সম্পত্তির অধিকার হরণ করা বলে. দিল্লীকে আমেরিকা থেকে পারমানবিক রিয়্যাক্টর বিক্রী করার পথে প্রধান অন্তরায় হয়েছে ২০১০ সালে ভারতের পার্লামেন্টে নেওয়া দায়ভার সংক্রান্ত আইন, যা প্রশাসনকে বাধ্য করেছে সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তিতে তাদের উপরে কোন রকমের দুর্ঘটনা, বিপর্যয় বা প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে ক্ষতির ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ক্ষতিপূরণের ভার সংক্রান্ত শর্ত যোগ করতে.

নিজেদের পক্ষ থেকে ভারতের কাছেও আমেরিকার বিরুদ্ধে অভিযোগের এক বিশাল তালিকা রয়েছে.

দিল্লীর পক্ষ থেকে একটি খুবই গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়েছে আফগানিস্তান থেকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা জোটের ফিরে যাওয়া, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোট রয়েছে. দিল্লীতে আশঙ্কা করা হয়েছে যে, এই শক্তি প্রত্যাহারের পরে সেখানে তালিবরা ক্ষমতায় আসবে ও সারা এলাকায় কট্টরপন্থী ঐস্লামিক মতবাদ প্রসারিত হবে. এই প্রসঙ্গে জন কেরি নিজের দিল্লী সফরের সময়ে ভারতের সহকর্মীদের আশঙ্কাকে দূর করার চেষ্টা করেছেন এই বলে যে, “আফগানিস্তান এর পরে কোন দিনও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের পালিয়ে থাকার ঘাঁটি হবে না”. প্রসঙ্গতঃ তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, “আফগানিস্তানের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা এখনও অনেক দূরের বিষয়”.

পররাষ্ট্র সচিব কেরি দিল্লী শহরে যে খবর দিয়েছেন, তা হল যে, আগামী মাসে ভারতের রাজধানীতে আসছেন মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জোসেফ বাইডেন. তাঁকেই এখানে সমস্ত কঠিন সমস্যার গ্রন্থি খুলতে হবে, যা পশ্চিমের ও পশ্চিমের নয় এমন দুটি নেতৃস্থানীয় গণতান্ত্রিক দেশের সম্পর্কের মধ্যে উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে.