ভারতে তিন দিনের সরকারি সফরে আছেন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি. তাঁর আলোচ্য বহু সংখ্যক বিষয়ের মধ্যে পর্যবেক্ষকরা দুটি বিষয়কে বিশেষ করে আলাদা করেছেন: আফগানিস্তানের যুদ্ধ পরবর্তী গঠনে ভারতের ভূমিকা ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্ন- অংশতঃ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রচেষ্টা ভারতকে তাদের খুবই বেশী করে প্রচারিত গ্রীন হাউস গ্যাস দূষণ কমানোর প্রকল্পে যোগ দেওয়ার জন্য বিশ্বাস করানো. প্রসঙ্গতঃ, একটা ভিত্তি রয়েছে মনে করার যে, রাষ্ট্র সচিব খুব একটা ঠিক সুর এর জন্য বেছে নেন নি, এই রকম মনে করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতের দিকে সম্পর্কের মুখ একেবারে জোর দিয়ে ঘুরিয়ে আনা শুরু হয়েছিল জর্জ বুশ জুনিয়রের রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে, যখন ২০০৫ সালে ঘোষণা করা হয়েছিল, তথাকথিত “পারমানবিক চুক্তি” নিয়ে, যা শান্তিপূর্ণ পরমাণু বিষয়ে সহযোগিতার জন্য সমস্ত রকমের বাধা নিষেধ হঠিয়ে দিয়েছিল. বাস্তবে, এটা ছিল জর্জ বুশের পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে বলা যাতে পারে একমাত্র বড় সাফল্য – যা অনেকটাই তাঁর আফগানিস্তান, ইরাক ও অন্যান্য দিকে বিফল হওয়াকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল, বলে মনে করেছেন ভলখোনস্কি.

বারাক ওবামার প্রশাসন তাঁর প্রথম দফার রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে এই দিকে জোর দিয়ে এগিয়ে যাওয়াতে কিছুটা ঢিলে দিয়েছিল, আর অন্যদিকে – ভারতকে চেষ্টা করেছিল খুবই বিশিষ্ট এক ভূমিকা দিতে. আর সেটা হল – “স্ট্র্যাটেজিক ভাবে দিক পরিবর্তনের ঘোষণা” করে ও “এশিয়াতে ফিরে আসার” কথা বলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল ভারতকে এই স্ট্র্যাটেজিতে চিনের “প্রতিদ্বন্দ্বী” দেশ হিসাবে এক আঞ্চলিক ভাবে “ভারসাম্য” রাখার মতো শক্তি হিসাবে যোগ করতে চেয়েছিল. তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“একটা নির্দিষ্ট পর্যায় অবধি এই রাজনীতি ভারতের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে মেলে, যারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশের মতই চিনের প্রভাব বিস্তারের ফলে উদ্বিগ্ন. কিন্তু সেটা একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত: প্রথমতঃ, ভারত ও চিনের মধ্যে সম্পর্ক সফল ভাবেই বৃদ্ধি হচ্ছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে কোন রকম সমস্যার উপরে আটকে না থেকেই আর বিরোধ ভারতের পরিকল্পনাতে নেই, অন্য দিকে দ্বিতীয়তঃ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির আয়ত্বের মধ্যে ভেসে থাকলে, ভারতকে বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যগত ভাবেই জোট সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে, যেমন, ইরানের সঙ্গে”.

চিনকে আটকে রাখার জন্য স্ট্র্যাটেজিক নীতি থাকা স্বত্ত্বেও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের উপরেই বিশেষ বাজী ধরেছে আফগানিস্তানে নিজেদের রাজনীতির ক্ষেত্রে. পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রমাগত সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এই রকমের প্রভাবশালী সহযোগীর প্রয়োজন খুবই তীক্ষ্ণ ভাবে দেখা দিয়েছে. আর এখানে নিজের দিল্লী সফরের পরিকল্পনা করে জন কেরি এক বহু দূর থেকেও লক্ষ্য করা যায় এমন একটা ইঙ্গিত করেছেন, নিজের আগে থেকে ঠিক থাকা ইসলামাবাদ সফরকে বাতিল করে. এই প্রসঙ্গে বাতিলের কারণ বলা হয়েছে খুবই জড় ভাবে – বলা হয়েছে যে, সফর বাতিল করা হয়েছে সিরিয়ার সমস্যা তীক্ষ্ণ হওয়ার জন্য ও এই বাতিল হওয়ার অর্থ মোটেও পাকিস্তানকে কোন তাচ্ছিল্য করার উদ্দেশ্য প্রণোদিত নয়. আসলে স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, এই সফর বাতিল করা হয়েছে তুচ্ছ করেই ও আরও এই কারণে যে, ভারতের আলোচনা সঙ্গীকে নিজেদের দিকে বেশী করেই ঝুঁকিয়ে নেওয়ার জন্য, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“প্রসঙ্গতঃ, অন্যান্য পরিস্থিতি, যা এই সফরের সঙ্গেই হয়েছে, তা মোটেও এতটা সংজ্ঞাবহ ভাবে এই সফরের সাফল্য হবেই বলে দেখাচ্ছে না. এটা জানাই রয়েছে যে, ভারতই বিশ্বের মঞ্চে সম্ভবতঃ একমাত্র তালিবান আন্দোলনের সঙ্গে শান্তি প্রয়াসে সবচেয়ে অনিচ্ছুক দেশ. আর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ঘোষিত (এটা সত্য যে, আপাততঃ তা বাস্তবায়িত করা হয় নি) ইচ্ছা যে, তালিবান আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে যাওয়া, খুবই বড় সন্দেহের মুখে ফেলতে পারে ২০১৪ সালের পরে আফগানিস্তানে কোন রকমের মার্কিন – ভারত সহযোগিতার সম্ভাবনাকে”.

অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ভারত সফরের সময়ে কেরি উত্থাপন করেছেন, ততটাই একমাত্র অর্থবহ নয়. ব্যাপার হল যে, গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপতি ওবামার সুদূর প্রসারিত উদ্যোগে পরিবেশে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস ছড়ানো বন্ধ করার কথা হয়েছে. কথা হয়েছে এই ধরনের বিশাল পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রচার অভিযানের কোন ফলই হয় না ও তা স্রেফ প্রচার অভিযানেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়. কিন্তু এই ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের প্রশাসন, যারা ওবামার সমস্ত রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় মাপের সঙ্কটে পড়েছে, তারা খুবই সিরিয়াস ভাবে মানসিকতা নিয়েছে. আর কেরি চেষ্টা করছেন ভারতকে রাজী করাতে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের পরে বিশ্বের “তৃতীয় সর্ব্বোচ্চ” পরিবেশ দূষণের কারণ হিসাবে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস ছড়ানো দেশ হিসাবে, এই বিষয়ে একটা সীমাবদ্ধ করার ব্যবস্থা নিতে.

ভারতের জন্য এটা বাস্তবে জীবন- মৃত্যুর প্রশ্ন, বিশেষ করে এখন, যখন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির গতি মন্দ হয়েছে. বলা সোজা: “দূষণ কমাও”. কার্যক্ষেত্রে এটা হবে বহু মানুষের জীবনের মান কমে যাওয়া.

এই রকম পরিস্থিতিতে সেই সমস্ত “খুচরো” ব্যাপার, যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অভিবাসন সংক্রান্ত নিয়ম কানুন নিয়ে আলোচনার বিষয়ে বহু ভারতীয়ের অসন্তোষের দিকে এমন কি না তাকালেও চলে, সেই রকমই মনে করেছেন রুশ বিশেষজ্ঞ.