বিগত কয়েক দিনের ঘটনায় ভারতীয় বিরোধী পক্ষের মধ্যে ফাটল এখন সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ভাবে এক প্রশ্ন তুলেছে: কি ভাবে এটা ২০১৪ সালে হতে যাওয়া নির্বাচনের উপরে প্রতিফলিত হবে? প্রসঙ্গতঃ, এখানে কথা হচ্ছে শুধু সেটা নিয়েই নয় যে, পার্লামেন্টের আগামী গঠনে রাজনৈতিক শক্তিরা কি ভাবে জায়গা নেবে, বরং সেটা নিয়েও যে, বিভিন্ন এলাকার মধ্যে সম্পর্ক কি ধরনের হতে চলেছে, আর তারই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্য গোষ্ঠীর প্রভাবশালী জোটের দেশের কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক কি ধরনের হবে.

বাস্তবে, ভারতে শুধু দুটি দলই রয়েছে, যারা সারা দেশ জোড়া দল বলে দাবী করতে পারে. এটা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, যারা এই দেশকে, দেশের অন্য সমস্ত রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত মেয়াদের চেয়ে বেশী সময় ধরে শাসন করেছে, আর বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক বিজ্ঞানে, যে দলকে “সব্বাইকে ধরা দল” বলে, সেই রকমের দল হয়ে রয়েছে, বর্তমানে তারাই জাতীয় প্রগতিশীল জোটের নেতৃত্ব করছে. এছাড়া রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি. প্রসঙ্গতঃ, শেষের দলটির একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাধা রয়েছে – তারা ভারতের ধর্মীয় ভাবে সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগনের উপরে অর্থাত্ হিন্দুদের উপরেই নির্ভরশীল, আর তাই সংজ্ঞার কারণেই দেশের সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে ভোট পেতে পারে না, যারা দেশের জনসংখ্যার মোট ২০ শতাংশ ও বিশেষ করে মুসলিমদের, যাদের সংখ্যা, ভারতে কিছু তথ্য অনুযায়ী এখনই শতকরা ১৫ ভাগের বেশী. এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“তাই খুবই স্বাভাবিক যে, যাতে দেশের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া যেতে পারে, তাই বিজেপি দলকে বাধ্য হতে হয়েছে অন্যান্য আকারে ছোট দলের সঙ্গে জোট তৈরী করতে, যাদের প্রভাব একটি বা দুটি রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ. কিন্তু এখানে আদর্শগত বাধার উদয় হয়: এই ধরনের কিছু দল বিজেপির কাছ থেকে দাবী করেছে নিজেদের রাজনীতিতে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা ঘোষণা করার, আবার অন্য দলগুলি বরং উল্টোটাই চায় যে, বিজেপি যেন হিন্দুত্বের আদর্শে অটল থাকে – আর হিন্দু নিয়ম কানুন মেনেই চলে”.

এইটাই ঘটেছে এই সপ্তাহে, যখন বিজেপি প্রথমে নিজেদের ভবিষ্যত নেতা কে হবেন, তা ঠিক করেছে ও কার নেতৃত্বে বিরোধী পক্ষ হয়ে আগামী নির্বাচনে জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা জোটের নেতৃত্ব দেবে – আর তার পরেই এক প্রভাবশালী দল, যারা এই মোর্চায় সামিল ছিল, তারা এর প্রতিবাদে জোট ছেড়ে বের হয়ে গিয়েছে.

নির্বাচনী প্রচারের নেতা ও ভোটে সাফল্য হলে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হয়ে আশানুরূপ ভাবেই নির্বাচিত হয়েছেন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – তিনি এমন একজন রাজনীতিবিদ, যাকে, যদি ২০০২ সালে গুজরাতে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সময়ে তাঁর ভূমিকার কথা ধরা হয় ও যে ক্ষেত্রে তাঁর সম্মতি ছিল বলেই ভাবা হয়ে থাকে, তবে ধর্ম নিরপেক্ষ নেতা বলে ভাবাই কঠিন. বিহার রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল, ঐক্যবদ্ধ জনতা দল, সেই সময়েই বিজেপির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কথা ঘোষণা করেছে. ফলে জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চায় বিজেপির রয়ে গিয়েছে শুধু দুটি প্রভাবশালী জোট সঙ্গী – শিব সেনা দল, যাদের মহারাষ্ট্রে প্রভাব রয়েছে ও পাঞ্জাবের শিরোমণি আকালি দল.

কিন্তু মোদীর নিজেকে ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা, তত্ক্ষণাত শিব সেনার পক্ষ থেকে খুবই তীক্ষ্ণ মন্তব্যের কারণ হয়েছে: তাদের নেতা উদ্ভব থ্যাকারে ঘোষণা করেছেন যে, তাদের দল বিজেপি দলকে সমর্থন করবে ও জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চায় থাকবে শুধু সেই ক্ষেত্রে, যদি বিজেপি হিন্দুত্বের নীতিগত বিষয়ে তাদের অবস্থান অনড় রাখে.

আপাততঃ, নিজেদের অবস্থান শিরোমণি আকালি দল খোলসা করে বলে নি, তবে ধারণা করা যেতে পারে যে, যদি বিজেপি তাদের জোটের কনিষ্ঠ সহযোদ্ধার ধুয়ো ধরে, তবে এই শিখ দলও প্রতিবাদ জানাতে পারে, এমনকি জোট ছেড়ে বেরিয়ে যেতেও পারে, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“মনে হতে পারে যে, এই পরিস্থিতিতে জিতে যাবে শুধু একটাই শক্তি – ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, যারা বিগত বছর গুলিতে সমস্ত রকমের জটিলতা স্বত্ত্বেও ও জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেও, একমাত্র দল হয়েই রয়েছে, যারা সারা দেশে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে.

কিন্তু আসলে আরও বেশী বিপজ্জনক ভাবে ঘটনা পাল্টাতে পারে. ব্যাপার হল যে, এনডিএ ভেঙে যাওয়ার ফলে শুধু ক্ষমতাসীন দলই শক্তিমান হচ্ছে না, বরং তা ভারতের রাজনীতিতে কেন্দ্র বিমুখী প্রবণতাকেই নতুন করে উস্কানি দিয়েছে”.

ভারতে দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ছাড়াও, অর্থাত্ ইউপিএ ও এনডিএ ছাড়া আরও রয়েছে তৃতীয় ফ্রন্ট, যার মধ্যে দেশের উত্তর ও দক্ষিণের দল গুলি রয়েছে. আরও একটি জোট গঠনের কথা (প্রধানতঃ সেই সব দল গুলিকে নিয়েই করার কথা, যে গুলি দেশের পূর্ব দিকের রাজ্য গুলিতে প্রভাবশালী) কিছু দিন আগে ঘোষণা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়. এই পরিস্থিতিতে এনডিএ, দেশের পশ্চিমের স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব কারী জোটে পরিণত হতে চলেছে.

আর এটা সমস্ত রাজনৈতিক চিত্রকেই পাল্টে দেয় ও বাস্তবে সমস্ত দেশের বা প্রজাতন্ত্রের মধ্যে ঐক্য নিয়েই প্রশ্নের অবতারণা করে, এই রকমই মনে করেছেন রুশ বিশেষজ্ঞ.