এশিয়াতে সন্ত্রাসের মোকাবিলায় স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতার মর্যাদা এবারে হারাতে বসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব জন কেরির ইসলামাবাদ সফর জুলাই মাস পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া এর একটা নতুন সমর্থন বলেই মনে হয়েছে. ইসলামাবাদের নতুন প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, আর ওবামার প্রশাসন তাদের সেই একই মুদ্রা দিয়ে দাম দিয়েছে, এই রকম মনে করেছেন আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন, তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“আমেরিকা- পাকিস্তানের সম্পর্কের পরস্পর বিরোধী চরিত্র কি রকমের, তা বুঝিয়ে দিয়েছে একই সঙ্গে শেষ দুটি খবর, যা এই এলাকায় ওবামা প্রশাসনের দুজন প্রতিনিধির না হওয়া সফর নিয়ে দেওয়া হয়েছে. প্রথমে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরির সফর, যিনি পাকিস্তান মুসলিম লীগের (ন) নির্বাচনে জয়ের পরে আগামী প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে টেলিফোনে অভিনন্দন জানানো ব্যক্তিদের মধ্যে একজন প্রথম বিদেশী নেতা ও খুবই আসন্ন সময়ে ইসলামাবাদে সফর করতে চাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন. আর এটাই একমাত্র মিস ফায়ার নয়. এই এলাকাতে যাওয়া হয় নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির বিশেষ প্রতিনিধি, যিনি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রশ্নাবলী দেখাশোনা করেন, সেই জেমস ডব্বিন্সের, যিনি আফগানিস্তানের তালিবদের সঙ্গে দোহা শহরে বৃহস্পতিবারে সরাসরি আলোচনাতে আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন বলে কথা ছিল, আর তারপরে ইসলামাবাদ যাওয়ারও কথা ছিল. সরকারি ভাষ্যে, ডব্বিন্সের মিশন আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি কারজাইয়ের পিছিয়ে যাওয়ার কারণেই করা যাচ্ছে না, যিনি ওয়াশিংটন ও তালিবদের মধ্যে আলোচনা শুরু করার প্রাথমিক শর্ত গুলি নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেন নি”.

এই ধরনের আচমকা একসাথে হওয়া গ্রন্থি কি হঠাত্ করে, নাকি আমরা একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাপারই দেখতে পাচ্ছি? ওয়াশিংটনে জন কেরির সফর পিছিয়ে যাওয়া আচমকা হওয়াকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে তাঁর খুবই ঘন সন্নিবদ্ধ সফর তালিকার জন্যে. কিন্তু এই কারণ মোটেও বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না. খুবই সম্ভব যে, জন কেরির সফর পিছিয়ে দেওয়ার আসল কারণ তাঁর কাজের চাপের সঙ্গে জড়িত নয়, বরং ইসলামাবাদ নিয়ে খুবই জটিল কূটনৈতিক দিক পরিবর্তন, যা ওবামার প্রশাসন এবারে করছে. দেখাই যাচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের পক্ষে আজ লাভজনক হয়েছে একটা বিরতি দেওয়া. প্রথমতঃ, প্রধানমন্ত্রী শরীফের আগ্রাসী ভূমিকা কম করা দরকার, যিনি পাকিস্তানের এলাকায় আমেরিকার বিমান থেকে করা আঘাত নিয়ে সমস্যা খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন. আঞ্চলিক সংবাদ মাধ্যমে এমনকি নওয়াজ শরীফের কি একটা নতুন স্ট্র্যাটেজির কথাও বলা হচ্ছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন বিমানের উড়ান আটকানোর জন্য নেওয়া হতে চলেছে – যা এখনও খুব স্পষ্ট বোধগম্য না হলেও দেখতে পাওয়া গেছে যে, ইসলামাবাদ খুবই জোর দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই বিষয়ে. তাই সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“দ্বিতীয়তঃ, কেরির হঠাত্ করেই ইসলামাবাদ যাওয়ার বিষয়ে তাড়াহুড়ো না করার ধাঁধার চাবিকাঠি হয়তো পাকিস্তানের বাইরে রয়েছে. আর তা হয়তো রয়েছে কাতার রাষ্ট্রের রাজধানী দোহাতে, যেখানে এই সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ে বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে তালিবান আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সরাসরি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল. যদিও এই আলোচনা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তা আর হবে না, এই রকম বলার কোনও কারণ নেই. এটা বার্লিনে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা জার্মানীর চ্যানসেলার অ্যাঞ্জেলা মেরকেলের সঙ্গে তাঁর সাংবাদিক সম্মেলনের সময়েই বুঝিয়ে দিয়েছেন”.

মনে করিয়ে দিই যে, ২০১১ সালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তালিবদের আলোচনা বিফল হয়েছিল. তার কারণ ছিল যে, আমেরিকার প্রতিনিধি দল প্রথম থেকেই তালিবদের কাছ থেকে “আল- কায়দা” দলের সঙ্গে কোন রকমের সহযোগিতা বন্ধ করতে বলেছিল ও সশস্ত্র যুদ্ধ বন্ধ করে আফগানিস্তানে চালু সংবিধানকে মানতে নির্দেশ দিয়েছিল. তালিবদের আবার করে আলোচনার টেবিলে বসানোর বিষয়ে নীতিগত ভাবে সম্ভবপর হয়েছে অনেকটাই পাকিস্তানের প্রশাসনকে মধ্যস্থতা করার শক্তি প্রয়োগে সামিল করার পরে.

আর এই আজ ওবামার প্রশাসন দেখিয়ে দিচ্ছে যে, তালিবদের সঙ্গে ওয়াশিংটন পাকিস্তান ছাড়াই ভাল করে সমঝোতা করতে পারে, যারা তাদের যে কাজ করার ছিল, তা করেছে ও এবারে কেটে পড়তে পারে.

এটা একটা কূটনৈতিক খেলা, যা শরীফের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমস্ত বিষয়ে আলোচনার সময়ে পাকিস্তানের অবস্থানকে কিছুটা দুর্বল করে দিতে পারে. হোয়াইট হাউসের সঙ্কেত যা ইসলামাবাদকে দেওয়া হচ্ছে, তা এই ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারা যায়: আপনারা ততটা বদলের অযোগ্য নন, আমাদের শর্ত দেওয়া বন্ধ করুন, তা না হলে আপনাদের বাদ দিয়েই আমরা চালিয়ে নেবো.

ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্ক, যা এক পা এগিয়ে তো দুই পা পিছিয়ে নীতিতেই বেড়ে উঠেছে, তা এশিয়াতে সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করার জন্য স্ট্র্যাটেজিক সহযোগিতার মর্যাদা হারাচ্ছে, যার উত্স ছিল ২০০১ সালে জর্জ বুশ জুনিয়র ও পারভেজ মুশারফের রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে. এলাকায় এটাই নব উদ্ভূত বাস্তব পরিস্থিতি, যা প্রমাণ করে দেয় যে, ২০০১ সালে ১১ই সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবাদী হানা হওয়ার পরে থেকে একটা পুরো যুগের অবসান হয়েছে.

সের্গেই তোমিন মনে করেন যে, এখন এই নতুন যুগে কাবুলের ক্ষমতায় আবার করে তালিবরা এসে বসতেই পারে. এই ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদ তত দিনের মধ্যে আর “সশস্ত্র ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে” থাকবে না. আর তখন প্রত্যেকেই তালিবদের সঙ্গে নিজেরাই সমঝোতায় যাওয়ার চেষ্টা করবে – নিজেদের একান্ত স্বার্থের কথা চিন্তা করেই.