কূটনীতির মুখ্য কর্তব্য - দেশেদের মধ্যে বিরোধের নিরসন. এই শুভ লক্ষ্য সাধন করার জন্য সব উপায়ই গ্রহণযোগ্য, এমনকি গোপনও. রুশী কূটনীতিজ্ঞদের মধ্যে বহু এমন ডাকসাইটে ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যারা অবধারিত যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছেন. তাদেরই অন্যতম গ্রাফ সিমিওন ভোরোন্তসোভ ১৭৮৫ থেকে ১৮০৬ সাল পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনে রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা করেছিলেন. তার সুদীর্ঘ ও সফল পেশাদার কূটনীতিজ্ঞের জীবনের একটি পরিচ্ছেদের গল্পই এখন আমরা করবো.

     ১৭৯১ সালের ঠান্ডা শীতকালে রাশিয়া ও গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিরোধের উত্তাপ চরম মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছিল. প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দেওয়ার প্রয়াসে গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট প্রথমে তুরস্ককে ও তারপরে সুইডেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে উস্কে দিলেন. কিন্তু রাশিয়া সুইডিশদের চুরমার করে দিল, তুরস্কও পরাজয়ের প্রান্তে গিয়ে পৌঁছাল. কিন্তু পিট ধূর্ত ষড়যন্ত্রের জাল বুনেই চললেন, এবার তিনি রুশবিরোধী শিবিরে প্রুশিয়াকে টেনে নিলেন. শক্তিশালী ইংরেজ নৌ সেনাবাহিনীর সমর্থনক্রমে প্রুশিয়ার রাশিয়ার উপর আক্রমণ করার কথা ছিল. গ্রেট ব্রিটেনে তত্কালীন রুশী রাষ্ট্রদূত সিমিওন ভোরোন্তসভ পেলেন নির্দেশনামাঃ যে কোনো উপায়ে নতুন যুদ্ধ ঠেকানোর.

    পিটের সাথে ভোরোন্তসোভের আলাপ-আলোচনা পুরোপুরি ব্যর্থ হল, পিট কোনো সমঝোতাতেই সায় দিলেন না. তখনই রুশী রাষ্ট্রদূত সিদ্ধান্ত নিলেন সরাসরি ইংরেজ জনসমাজের কাছে দরবার করার. পিটের যুদ্ধ উন্মাদনার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে সরব হওয়ার বিষয়ে তিনি বোঝাপড়া করলেন ব্রিটেনের বিরোধী পার্টির নেতাদের সঙ্গে. বিরোধী পার্টি পার্লামেন্টে পিটের সমালোচনায় মেতে উঠলো আর ভোরোন্তসোভ ও রুশী দূতাবাসের অন্যান্য কর্মচারীরা ব্রিটেনের সংবাদপত্রগুলিতে ছদ্মনামে যুদ্ধবিরোধী প্রবন্ধাবলী প্রকাশ করতে লাগলেন. সেখানে লেখা হচ্ছিল ব্রিটেনের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা, যুদ্ধ বাধলে যার দায় সামলানো অনিবার্য হয়ে উঠবে. এমনকি সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছিল. শীঘ্রই দেশে যুদ্ধবিরোধী প্রচারপত্র ও ইস্তাহারের ঢল নামলো. ঐ সব লেখকদের অন্তরাল থেকে আর্থিক মদত দিচ্ছিল ব্রিটেনে রুশী দূতাবাস.

    সুফল পেতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না. ইংরেজ নাবিকরা ঝাঁকে ঝাঁকে নৌবাহিনী পরিত্যাগ করতে লাগলো, শ্রমিকরা ধর্মঘটে সামিল হল, শিল্পপতিরাও যুদ্ধের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব করে সরকারের বিরুদ্ধে সরব হল. শুধু লন্ডনই নয়, প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়লো ম্যাঞ্চেস্টার, গ্লাসগো, শেফিল্ডের মতো বড় বড় শহরেও. জনসভায় নাগরিকরা সরকারবিরোধী সংকল্পপত্র গ্রহণ করতে লাগলো, দেওয়ালে দেওয়ালে আবির্ভাব হতে লাগলো স্লোগানের - "আমরা রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ চাই না!". ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামতে লাগলো.

    তখন ব্রিটেনের পার্লামেন্টে উত্তেজনার পারদ চরম মাত্রায়. বিরোধীপক্ষের বাগ্মীরা পিটের উদ্দেশ্যে কড়া ভাষণ দিতে পিছপা হলেন না, এই অভিযোগ করে, যে পিটের যুদ্ধাভিলাষ কেবলমাত্র ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্খা চরিতার্থ করার জন্য, দেশের স্বার্থের কথা ভেবে নয়. সরকারি সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকলো পার্লামেন্টে. এমনকি পুরোপুরি পিটের সমর্থকদের নিয়ে গড়া ক্যাবিনেট মন্ত্রীসভায় পর্যন্ত মতদ্বন্দ লেগে গেল. তখন স্বয়ং পিটের রাজনৈতিক ভবিষ্যত্ খাদের কিনারায়. অবশেষে উইলিয়াম পিট পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলেন. তিনি রাশিয়াকে চরম শর্ত দেওয়া থেকে বিরত হলেন এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতিতে ইতি টানলেন. উপরন্তু ব্রিটেনের সরকার এমনকি ১৭৯১ সালে লন্ডন থেকে পিটার্সবার্গে পাঠালো রাষ্ট্রদূতকে. দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পরে দুই বৃহত্শক্তি সমঝোতায় পৌঁছাতে সমর্থ হল. ব্রিটেনের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে তুরস্ক রাশিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হল আর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে প্রুশিয়াও আর রাশিয়াকে আক্রমণ করার সাহস পেল না. এইভাবেই, সিমিওন ভোরোন্তসভের শান্তির জন্য যুদ্ধ চিহ্নিত করলো রাশিয়ার জন্য তিন-তিনটি কূটনৈতিক জয় - ইংল্যান্ড, তুরস্ক ও প্রুশিয়ার বিপক্ষে.

    আজকের যুগে বৃহত্ শক্তিগুলি ছোটখাটো রাষ্ট্রগুলিকে শান্তির পথে আসতে বাধ্য করে চোখরাঙানো বোমাবাজি ও সামরিক অনুপ্রবেশ করে. এটা দুর্ভাগ্যজনক, যে কেউ আর তেমন শান্তির জন্য সিমিওন ভোরোন্তসোভের গোপন যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে না, যিনি এক বিন্দুও রক্তক্ষয় না ঘটিয়ে যুদ্ধ রোধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন.