মঙ্গলবারে মালদ্বীপের দুর্নীতি প্রতিরোধ পরিষদ (ACC) ২০১০ সালে মালদ্বীপের প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের জিএমআর কোম্পানীর ও মালদ্বীপের বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ কোম্পানীর (MACL) মধ্যে রাজধানী মালে শহরের বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ ভার ভারতের কোম্পানীর হাতে তুলে দেওয়া সংক্রান্ত চুক্তি সম্বন্ধে নিজেদের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছে. এই রিপোর্ট থেকে যা স্পষ্ট হয়েছে, তা হল যে, এই চুক্তি হওয়ার সময়ে কোন রকমের দুর্নীতির অংশ ছিল না – জিএমআর কোম্পানী সত্যই সবচেয়ে লাভজনক শর্ত পেশ করেছিল. মনে করিয়ে দিই যে, গত বছরের শেষে দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগেই মালদ্বীপের প্রশাসন এই চুক্তির ভিত্তিতে সন্দেহ করে এটিকে নাকচ করেছিল. প্রসঙ্গতঃ, এই ঘটনার সংজ্ঞা স্রেফ কিছু কাজ কারবার সংক্রান্ত ব্যবসায়িক ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ না থেকে অনেক সুদূর প্রসারী ও তা প্রতিফলিত করেছে ভারতের প্রতি নিজেদের প্রতিবেশীদের সম্পর্কের বিষয়ে মালদ্বীপের জটিল চরিত্রকেই, যা বিশাল এক ভূ-রাজনৈতিক খেলার একেবারে কেন্দ্রে এসে পড়েছে, ভারত মহাসাগরেই প্রভাব বিস্তারে প্রাধান্য নিয়ে.

মালদ্বীপ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে এক অতুলনীয় অবস্থানে রয়েছে. এই দেশ, যা ১২০০ দ্বীপের সমন্বয়ে সৃষ্ট, তা ভারত মহাসাগরের উত্তরের দিকে একেবারে কেন্দ্রীয় এলাকাতে রয়েছে, আর তার সমুদ্রতীরের খুব কাছ দিয়েই সমস্ত খনিজ তেল পরিবহনের শতকরা চারের তিন ভাগ করা হয়ে থাকে – প্রাথমিক ভাবে আফ্রিকা থেকে ও নিকটপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও চিনে.

প্রায় তিরিশ বছর ধরে মালদ্বীপে একাধারে শাসন করেছেন এক ব্যক্তি – মাউমুন আবদুল গাইয়ুম, যিনি এক সময়ে নিজের শাসনকালে খুবই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরী করেছিলেন নিজের পক্ষের লোকদের নিয়ে, যাদের স্থানীয় অনুপাতে শাসক ধনী গোষ্ঠী বলেই মনে করা যেতে পারে. পররাষ্ট্র নীতিতে গাইয়ুম অনেকটাই চিন পন্থী ছিলেন – আর তাঁর শাসনের শেষের দিকে, ২০০০ সালের শুরুতে, সংবাদ মাধ্যমে খুবই সক্রিয়ভাবে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল যে, এই দ্বীপ পূঞ্জের একটিতে চিনের ডুবোজাহাজের জন্য বন্দর তৈরী করা হবে. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“২০০৮ সালে দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিতেছিলেন ভারতের পক্ষে মানসিকতা সম্পন্ন প্রার্থী মোহাম্মেদ নাশিদ. চিনের ঘাঁটি নিয়ে কথাবার্তা তার পরেই শেষ হয়ে গিয়েছিল. আর রাষ্ট্রপতি নাশিদ শাসন করার সময়েই ভারত মালয়েশিয়ার যৌথ কোম্পানীর সঙ্গে ইব্রাহিম নাসির আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর পুনর্গঠন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চুক্তি করা হয়েছিল. এই চুক্তি এই দেশে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রকল্প হয়েছিল. কোম্পানী ইতিমধ্যেই এই চুক্তির সম্পূর্ণ মূল্য ৫১ কোটি দশ লক্ষ ডলারের মধ্যে ২৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বসে আছে”.

কিন্তু ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে রাস্তার মিছিল সমাবেশ, যা দেশের সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সমর্থন করেছিল, তার পরিণামে মোহাম্মেদ নাশিদ মেয়াদের আগেই নিজের শাসনভার ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন. তিনি নিজে এই ঘটে যাওয়া ঘটনাকে মনে করেছেন রাষ্ট্রদ্রোহ বলে. তাঁর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি, প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতি মোহম্মদ ওয়াহিদ এই চুক্তির শর্ত গত বছরের নভেম্বরে নতুন করে দেখে ঘোষণা করেছিলেন যে, এটা করার সময়ে অস্বচ্ছ দুর্নীতির উপায় ব্যবহার করা হয়েছে. এই চুক্তি নাকচ করা হয়েছিল. তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখন দুর্নীতি প্রতিরোধ পরিষদের রিপোর্ট সম্পূর্ণ ভাবেই দুর্নীতি নিয়ে সমস্ত অভিযোগকে নস্যাত করেছে. কিন্তু আপাততঃ জিএমআর কোম্পানী মোটেও আশা করতে পারে না যে, তাদের কাছে এই চুক্তি আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে. অন্তত পক্ষে যতদিন ক্ষমতায় ওয়াহিদ থাকছেন, ততদিন পর্যন্ত নয়. আর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেপ্টেম্বর মাসে হওয়ার কথা আর ওয়াহিদ বলেই দিয়েছেন যে, তিনি নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন”.

খুবই আগ্রহ জনক পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে, যেখানে ব্যবসায়িক কোম্পানীর সঙ্গে রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও বিদেশী ক্রীড়নকদের স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে. এতদিন অবধি অনেকেই ভেবেছিলেন ওয়াহিদ সাবেক রাষ্ট্রপতি গাইয়ুম গোষ্ঠীর লোক বলে, আর সেই রাষ্ট্রদ্রোহ হয়েছিল- ২০০৮ সালে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার প্রতিশোধ হিসাবে.

কিন্তু এবারে বোঝা গেল যে, গাইয়ুম গোষ্ঠীর দল থেকে, অর্থাত্ মালদ্বীপ প্রোগ্রেসিভ পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থী দেওয়া হতে চলেছে – ইনি সাবেক রাষ্ট্রপতির ভাই ইয়ামিন আবদুল্লা. আর আপাততঃ বোঝা যাচ্ছে ন, বর্তমানের সরকার নির্বাচনে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া মোহম্মদ নাশিদকে অংশ নিতে দেবে কি না. তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এটা তিন অংশীদারের এক রাজনৈতিক শক্তির লড়াই প্রতিফলিত করেছে তিনটি বাইরের বৃহত্ রাষ্ট্রের লড়াইকে, যা হচ্ছে মালদ্বীপে প্রভাব বিস্তার নিয়ে. প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি গাইয়ুম ও তাঁর পক্ষের লোকরা চিনের পক্ষে, কিছুদিন আগে সফরের সময়ে গাইয়ুম এটাই আবার প্রমাণ করেছেন, যখন তিনি তাঁর ভারতীয় আলোচনা সঙ্গীদের বোঝাতে চাইছিলেন যে, ভারত মহাসাগরের প্রধান বিপদ চিন থেকে নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই আসছে.

আর এই ধরনের ঘোষণার কারণ দিয়েছেন বর্তমানের রাষ্ট্রপতি, যার উপরে ওয়াশিংটন খুব শক্তিশালী চাপ সৃষ্টি করেছে, যাতে তিনি সামরিক শক্তির অবস্থান নিয়ে সমঝোতায় (SOFA) স্বাক্ষর করেন, যার ফলে আমেরিকার সামরিক বাহিনীর লোকরা মালদ্বীপের পরিকাঠামোর উপরে প্রবেশের অধিকার পাবে, তার মধ্যে সামুদ্রিক ও বিমান বন্দরেও”.

সুতরাং একটি, যদিও বড় বিনিয়োগ প্রকল্পের ভাগ্য তার থেকেও অনেক বড় পরিপ্রেক্ষিতকে বাদ দিয়ে বিচার করা সম্ভব হচ্ছে না, যা ভারত মহাসাগরের এই এলাকায় অধিকার বিস্তারের জন্য বাইরের প্রভাবশালী ক্রীড়নকদের মধ্যে হওয়া দিয়ে নির্ণয় করতে হচ্ছে.