নির্বাচিত হওয়ার পরে নিজের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে সাংবাদিক সম্মেলনে ইরানে হাসান রোহানি ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্রের পারমানবিক পরিকল্পনা সম্পর্কে বেশী খোলাখুলি হওয়া সম্বন্ধে নিজে প্রস্তুত বলে ঘোষণা করেছেন. তিনি, অংশতঃ, ঘোষণা করেছেন: “আমাদের পারমানবিক পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভাবেই স্বচ্ছ. কিন্তু তাও আমরা তৈরী আছি আরও বেশী খোলাখুলি হওয়ার জন্য, যাতে আন্তর্জাতিক সমাজকে প্রমাণ করা সম্ভব হয় যে, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সব কাজকর্ম মানিয়ে করা হচ্ছে”. এরপরে হোজাত-ওল-এসলাম রোহানি বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন: “আমরা আল্লার ইচ্ছায় মধ্যস্থতাকারী ছয় পক্ষের সঙ্গে বেশী সক্রিয়ভাবে আলোচনা করতে প্রস্তুত. আমরা মনে করি যে এই আলোচনা- পারমানবিক সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ”.

ইরানের নতুন রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা কতটা বাস্তব? এই বিষয়ে ভ্লাদিমির সাঝিন মন্তব্য করেছেন.

ইরানের নতুন রাষ্ট্রপতির আশাব্যঞ্জক মন্তব্য আটটি নেতৃস্থানীয় দেশের নেতাদের, যাঁরা গ্রেট ব্রিটেনে ‘জি৮’ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া উত্পন্ন করেছে. “আমরা আশা প্রকাশ করি যে, নির্বাচনের পরে সম্ভাবনা তৈরী হবে ইরানের পারমানবিক সমাধানের”, - ঘোষণা করেছেন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন. এই ধরনের দৃষ্টিকোণ সমর্থন করেছেন তাঁরই আমেরিকার সহকর্মী বারাক ওবামা. তিনি বলেছেন, “আমরা মনে করি ইরানের নির্বাচন নতুন করে আলোচনা শুরুর পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে ও পারমানবিক সমস্যার সমাধান হতে পারে”. তাঁর সঙ্গে “আটের গোষ্ঠীর” অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরাও যোগ দিয়েছেন.

সুতরাং পক্ষরা আলোচনা নতুন করে শুরু করা নিয়ে পারস্পরিক ভাবে তৈরী থাকা সমর্থন করেছেন, যখন ইরানে মনে করা হয়েছে যে, একটা পরিবর্তনের হাওয়া এসেছে. এখানে মুখ্য হল যে একটা সমাধান পেতে হবে ইরানের সঙ্গে তাদের বিরোধীদের কথাবার্তায়, যা, একদিক থেকে গ্যারান্টি দেবে যে, ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা সামরিক উদ্দেশ্য নিয়ে করা হবে না আর, অন্য দিক থেকে, সকলের জন্যই তা গ্রহণযোগ্য হবে, তার মধ্যে ইরানের জনগনের জন্যও. প্রসঙ্গতঃ ইরানের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছে বাস্তবে, তেমন কিছু বেশী নয়. সমগ্র পারমানবিক পরিকল্পনা বন্ধ করে দেওয়ার কথা হয় নি ও তা হচ্ছেও না. কিন্তু তেহরানকে আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে আর নিজেদের পারমানবিক পরিকল্পনাকে এই সংস্থার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই নিয়ে আসতে হবে.

আর এইটাতেই আজ সব সমস্যা. কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার জেনারেল ডিরেক্টর ইউকিও আমানো উল্লেখ করেছেন: “যদি আমাদের হাত খুব শক্ত করে বাঁধা থাকে, যদি বাধা নিষেধ হয় খুবই বেশী, তবে আমরা ফলপ্রসূ নিয়ন্ত্রণ করতেই পারবো না. আর যদি আমরা এটা করতেই না পারি, তবে এটা করার আদতে কি দরকার? এটা আমাদের জন্য যেমন, তেমনই ইরানের জন্যও কোন অর্থ রাখে না. আমাদের নিজেদের কাজ করার সম্ভাবনা থাকতে হবে, আর আমাদের কাজ – গ্যারান্টি দেওয়া, সেই প্রসঙ্গে যে, ইরানের পারমানবিক সক্রিয়তা একেবারেই শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য নিয়ে করা হচ্ছে”.

শুধু ইরান – আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার ক্ষেত্রেই আলোচনার প্রক্রিয়াতে উন্নতি করলে হবে না, বরং ইরান – ছয় মধ্যস্থতাকারী পক্ষের আলোচনাতেও করতে হবে, যে প্রয়োজনের কথা হাসান রোহানি নিজেই বলেছেন.আর এখানে তারই সঙ্গে যেমন আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সঙ্গে, তেমনই অনেক সমস্যা জমা হয়েছে. এই নিয়ে সাত বছর ধরে আলোচনা চলছে “একের পর এক”, আর কোনও ফলই তাতে হয় নি. যেটা নিয়ে প্রসঙ্গতঃ ইরানের প্রধান আলোচনা প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে অসফল হওয়া সৈদ জালিলি ভাল করেই জানেন. এখন আলোচনার টেবিলে সেই দলই থাকবে কিনা? এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার সামাজিক- রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ বলেছেন:

“বর্তমানে ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার জন্য প্রতিনিধি দল বদলের কথা উঠেছে. বর্তমানের প্রধান ও সর্ব্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা সভার সম্পাদক সৈদ জালিলি খুবই ভাল করে ইরানের স্বার্থ রক্ষা করেন. কিন্তু আজ প্রয়োজন সমঝোতা করতে বেশী উত্সাহী এমন ব্যক্তির. আর এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি ইরান আলোচনার দল পাল্টাতে রাজী হয় ও তাদের নির্দিষ্ট সমঝোতা করতে দিতে রাজী হয়, তবে সে ক্ষেত্রে, আমি মনে করি, ইরানের পারমানবিক সঙ্কট সমাধান নিয়ে লক্ষ্যণীয় উন্নতি করা যেতে পারে”.

সম্ভবতঃ, আলোচনার ক্ষেত্রে প্রহরার পরিবর্তন সত্যিই উদয় হয়েছে. কিন্তু কে এই দলের সদস্য ও নেতৃত্ব স্থির করবেন, কে তাদের সমঝোতা করার অনুমতি দেবেন? ইরানে শুধু একজনই ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁর এই ধরনের অধিকার রয়েছে – এটা সর্ব্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খোমেনেই. পারমানবিক আলোচনা – এটা তাঁর এক্তিয়ারে. রাষ্ট্রপতি শুধু পরামর্শ দিতে পারেন ও বোঝাতে পারেন. নতুন রাষ্ট্রপতির এই বিষয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা রয়েছে. এটা স্বীকার করেছেন রুশ প্রজাতন্ত্রের প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ইগর ইভানভ, যিনি এখন আন্তর্জাতিক কাজকর্ম নিয়ে রুশ সভার প্রধান, তিনি বলেছেন: “আমি রোহানির সঙ্গে, যখন তিনি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা সভার সম্পাদক ছিলেন, তখন নিজে আলোচনার অভিজ্ঞতা রাখি. সেই সময়ে ইরানের নেতৃত্ব, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পারমানবিক গবেষণা নিয়ে স্থগিতাদেশ গ্রহণ করে”. এই প্রসঙ্গে ইগর ইভানভ উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের পারমানবিক সমস্যা নিয়ে পদক্ষেপকে মোটেও দেশের দৌর্বল্য মনে করা হয় নি, বরং মনে করা হয়েছিল সমঝোতায় প্রস্তুত বলেই.

ইরানের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি রোহানি পেয়েছেন এক জটিল উত্তরাধিকার. ইরানকে একঘরে হয়ে থাকা থেকে ফেরত আনার জন্য তাঁকে যেমন দেশের ভেতরে, তেমনই দেশের বাইরে, বহু জটিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে. এই পরিস্থিতিতে খোলাখুলি ভাবে ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা এক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হবে ইরানের পারমানবিক সমস্যা সমাধানের জন্য. আর তার সমাধান থেকেই সেই সূত্র তৈরী হবে, যা টান দিয়ে ধরে দেশকে বর্তমানের সঙ্কটাবস্থা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে.