পাকিস্তানের স্রষ্টার মৃত্যুর ৬৫ বছর পরে এই দেশ আজ কি ইমেজ তৈরী করেছে, তা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে জ্বলে উঠেছে. এক অভূতপূর্ব দুষ্কর্মের ঘটনা, “বেলুচিস্তান মুক্তি বাহিনী” নামের চরমপন্থী গোষ্ঠী ঘটিয়েছে. বিচ্ছিন্নতাবাদীরা “পরিচ্ছন্ন ঐস্লামিক রাষ্ট্রের” স্থপতি মহম্মদ আলি জিন্নার বাস ভবন জ্বালিয়ে দিয়েছে. পাকিস্তানের সদ্য নির্বাচিত প্রশাসনের জন্য আরও একটি অশনি সঙ্কেত বেজে উঠেছে, যে, পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষা, যা ব্রিটেন শাসিত ভারত ভেঙে তৈরী হয়েছিল, তা আরও সঙ্গীণ হয়েই পড়ছে, এই রকম মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“গত শনিবারে সারা বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে উড়ে আসা এই চাঞ্চল্যকর খবর খুবই অবাস্তব ও আশ্চর্যজনক বলেই মনে হয়েছে, এমনকি সেই পাকিস্তানের কথা মনে করলেও, যেখানে বিগত বছর গুলিতে প্রায়ই অবোধ্য সব ঘটনা ঘটছে. তথাকথিত “বেলুচিস্তান মুক্তি বাহিনীর” একদল জঙ্গী, যারা পাকিস্তানের এই পশ্চিমের প্রদেশকে পাকিস্তান থেকেই আলাদা করার জন্য শুরু থেকেই লড়াই করছে, তারা জিয়ারাত এলাকাতে মহম্মদ জিন্নার বাসভবনে আক্রমণ করেছিল, যা আজ ১২১ বছর ধরেই রয়েছে ও বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক যুগের সাক্ষ্য দিয়েছে. এখানে সেই ঘটনাই আমাদের হতবাক করেছে যে, কি রকমের নৃশংস ভাবে এই চরমপন্থীরা দেশের ঐতিহ্য বলে ঘোষিত এই বাড়ীটিতে নষ্ট করেছে ভিতরের আসবাব পত্র, অন্দর মহলের জিনিষপত্র ও সেই সব ফোটো, যেগুলি থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন জিন্না, ঠিক যেন ইতিহাসের পাঠ্য বই থেকে উঠে এসে. “সমস্ত পুরনো জিনিষই এই বাড়ীর ভিতরে নষ্ট করে দিয়েছে”, - উল্লেখ করেছেন স্থানীয় পুলিশের প্রতিনিধি”.

এখানে আশ্চর্যের বিষয় হল যে, এই ভবন – যা দেশের স্মৃতি সৌধ, যেখানে জিন্না ১৯৪৮ সালে মৃত্যুর আগে তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছর কাটিয়ে ছিলেন, তার রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন মাত্র একজন পুলিশ কর্মী. আক্রমণকারীরা তাঁকে হত্যা করেছে, তারপরে বাড়ীর ভিতরে কিছু হাত বোমা ফাটিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে মোটর সাইকেলে চড়ে পালিয়ে গিয়েছে. টেলিফোনে “এএফপি” সংবাদ সংস্থাকে “বেলুচিস্তান মুক্তি বাহিনীর” এক নামোল্লেখে অনিচ্ছুক প্রতিনিধি জানিয়েছে যে, “আমরা কোনও পাকিস্তানী স্মৃতি সৌধ স্বীকার করি না”. তাই সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এই কথাগুলি হয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য একেবারেই নতুন ও খুব খারাপ বাস্তব. আজ, দেশে মাথাচাড়া দিচ্ছে সেই সব শক্তি, যাদের জন্য পাকিস্তানের অস্তিত্বের কোনও মূল্যবোধই আর নেই. সেই সমস্ত মূল্যবোধ, যা এত বেশী করেই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না, এই কথা বলে যে, ব্রিটিশ ভারতের মুসলিমরা নিজেদের জন্য সম্মান জনক অস্তিত্ব পেতে পারে শুধু ভারতের হিন্দু সমাজের থেকে আলাদা হয়েই ও নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র তৈরী করে – ঐস্লামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান – এটা “পরিচ্ছন্ন দের রাষ্ট্র””.

করাচী শহরের কয়েদ-এ-আজম স্মৃতি সৌধ – জিন্নার স্মৃতিতে তৈরী, তা অবশ্য সুখের কথা যে, খুবই ভাল করে সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে, বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসবাদীদের হাতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ীটির চেয়ে. এই স্মৃতি সৌধে যারা আসেন, তারা শুধু পাকিস্তানের জনকের প্রতি শ্রদ্ধাই জ্ঞাপন করতে পারেন না, বরং সেই যুগের একটা পরিবেশেও অনুভব করতে পারেন. যেমন, সেখানে রয়েছে জিন্নার ঝাঁ চকচকে সাদা লিমুজিন, যেন তৈরী আছে আবারও রাস্তায় নেমে পড়ার জন্যে. কিন্তু জিন্নার মৃত্যুর পরে পাকিস্তানের রাষ্ট্র যন্ত্রই চলছে “ইতিহাসের এক ভাঙা চোরা রাস্তা” ধরেই. রাষ্ট্রের সনদে হুমকি ও প্রথম গুরুতর সঙ্কেত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের আলাদা হয়ে যাওয়া ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠন. বিগত বছর গুলিতে দেশ চলেছে খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে. “আমি মুসলমানদের শিয়া বা সুন্নী বলে ভাগ করি না”, - বলেছিলেন জিন্না. কিন্তু তাঁর এই বাণীটাও ভুলে যাওয়া হয়েছে কি একটা ভাবে. প্রায়ই শিয়া ও সুন্নী মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্ক মোটেও আর তেমন নির্মেঘ মনে হচ্ছে না, যা জিন্না মনে করতে চেয়েছিলেন. তার মধ্যে আবার তালিব ও আল- কায়দা যুদ্ধ করছে বিশ্ব জেহাদের ঘোষণা করে, যা একবার শুনলে জিন্নাও তাঁর কবরে পাশ ফিরবেন. মোট কথা সারা বিশ্বেই মুসলমানরা বা ইসলাম চরমপন্থা ছাড়া অন্য কোনও পন্থাকেই নিজেদের পথ বলে মনে করতে পারছে না.

আর এবারে বেলুচিস্তানে এই দুষ্কর্ম যা সেই শেষ না হওয়া বিতর্কেই আবার করে জ্বলে ওটার বিষয়ে উস্কানি দিয়েছে, তা হল এই পাকিস্তান রাষ্ট্র আসলে কি. এটা খুবই প্রতীকী যে, পাকিস্তানের সদ্য বিগত ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে চরমপন্থী মানসিকতার হিন্দু সংরক্ষণশীল লোকরাই. “বেলুচিস্তানের (জাতীয়তাবাদী) সন্ত্রাসবাদীদের হাতে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী জিন্নার বাসভবন ধ্বংস হওয়া দেখিয়ে দিয়েছে যে, আজই আমরা দেখতে পাচ্ছি পাকিস্তানের শেষ হওয়ার শুরু”, – ঘোষণা করেছেন কেরালা রাজ্যে ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের ঘনিষ্ঠ “ভারতীয় বিচার কেন্দ্রের” ডিরেক্টর পি. পরমেশ্বরম. ভারতের কট্টর পন্থীদের মতে, সেই রাষ্ট্র, যা জিন্না তৈরী করেছিলেন, তা টিকে থাকা বাকী রয়েছে আর বড় জোর পঁচিশ বছর.

কিন্তু পাকিস্তানের নতুন প্রশাসনের জন্য এখনও সময় রয়েছে যাতে এই সব হিংসা মূলক পূর্বাভাস না মেলে.