আজ ইরানের জনগন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করছেন. বর্তমানের রাষ্ট্রপতি মাখমুদ আহমাদিনিজাদ আর এই পদে কখনও আসীন হবেন না এই কথা জোর দিয়েই বলা যেতে পারে.

আহমাদিনিজাদের আট বছর ধরে রাষ্ট্রপতির পদে থাকার ফলাফল নিয়ে একটি সমীক্ষা লিখেছেন আমাদের পর্যবেক্ষক ভ্লাদিমির সাঝিন.

নিজের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হওয়ার পরে প্রথম কয়েক মাস ধরে আহমাদিনিজাদ দেশের পররাষ্ট্র নীতিতে পশ্চিম ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা সরল করার চেষ্টা বন্ধ করে দিয়েছিলেন, ইজরায়েলের উপরে নিজের বহু সংখ্যক ভাষণে এমন ভাবে আক্রমণ করেছিলেন, যাতে মনে হয়েছিল যে, তাঁর মতে ইজরায়েলের অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার নেই.

তিনি তেহরানের অবস্থান খুবই তীক্ষ্ণ ভাবে ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে সমস্যা বিষয়ে কঠোর করে দিয়েছিলেন. রাষ্ট্রপতি আহমাদিনিজাদ - ইরানকে পারমানবিক শক্তি সম্পন্ন দেশ হিসাবে পরিণত করার পক্ষে এক বিশ্বাসী পক্ষপাতী, তিনি জানতেন, যা এর পরিণতিতে হতে পারত. আহমাদিনিজাদের রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে ইরানের অবস্থান পারমানবিক সমস্যা নিয়ে আলোচনায় রত মধ্যস্থতাকারী পক্ষ গুলির সঙ্গে, অর্থাত্ রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশ, ইউরোপীয় সঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সঙ্গে আরও বেশী করেই কোন রকমের ছাড় দেওয়া ছাড়া তৈরী হয়েছে. আট বছর ধরে রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে তিনি এই সমস্যাকে কানাগলিতে নিয়ে গিয়েছেন.

কোন সন্দেহই নেই যে, নিজের কাজকর্মে আহমাদিনিজাদ দেশের ভিতরের শক্তিশালী কাঠামো গুলির সমর্থন টের পেয়েছিলেন. এটা, প্রাথমিক ভাবে, ধর্মীয় নেতৃত্বের চরমপন্থী গোষ্ঠীরা, আর তার সঙ্গেই ঐস্লামিক তহবিল গুলি, ঐস্লামিক বিপ্লবের পাহারাদার বাহিনী ও তাঁর অধীনে থাকা বিরোধের শক্তি “বাসিঝ” গোষ্ঠীর সমর্থন.

২০০৫ সালে মাখমুদ আহমাদিনিজাদ ক্ষমতায় এসেছিলেন এই স্লোগান ব্যবহার করে যে, তিনি দেশে ন্যায় বহাল করবেন ও খনিজ তেল বিক্রী থেকে অর্থ ইরানের সমস্ত জনগনের মধ্যে ভাগ করে দেবেন. গত আট বছর ধরে তাঁর মন্ত্রীসভা রোজগার করেছে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি ডলার খনিজ তেল বিক্রীর অর্থ. কিন্তু এটা দেশের লোকের জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন করতে সক্ষম হয় নি, এমনকি অর্থনীতিরও কোনও রকমের উন্নতি লক্ষ্য করতে পারা যায় নি.

তাঁর দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে আহমাদিনিজাদ ঘোষণা করেছিলেন যে, দেশে নির্দিষ্ট করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া শুরু করবেন. তিনি একই সঙ্গে এর নাম দিয়েছিলেন “শল্য চিকিত্সা” বলে, যা ইরানের অর্থনীতির উপরে করা হবে. এখানে ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের সবচেয়ে কম উপার্জনে সক্ষম জনগনের স্তর. তাঁর এই ধারণার অর্থনৈতিক ভাবে ভিত্তি থাকলেও, তা ছিল জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য ও তা শেষ অবধি চিন্তা করে করা হয় নি. ফলে দেশে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বিশাল সংখ্যায় স্থানীয় মুদ্রা. আট বছরে দেশে কাঁচা টাকায় লেনদেনের পরিমান বেড়েছে ছয় গুণ. তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের শেষ বছরে সরকারি ভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘোষিত হয়েছিল শতকরা ৩০ ভাগের বেশী. অর্থনীতিবিদরা মূল্যায়ণ করেছিলেন এই স্তর প্রায় শতকরা ৬০ এমনকি ৭০ ভাগ পর্যন্ত.

দেশে বেকারত্ব একই সঙ্গে বেড়ে গিয়েছে. ইরানের সরকারি পরিসংখ্যান কেন্দ্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরানের প্রায় একের চার ভাগ কর্মক্ষম মানুষ কাজ পাচ্ছেন না. গত আট বছরে দেশে উত্পাদনের পরিমান ও রপ্তানীও কমে গিয়েছে, প্রাথমিক ভাবে, তার কারণ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সঙ্ঘের চাপের ফলে খুবই দ্রুত কমে গিয়েছে খনিজ তেলের রপ্তানীর পরিমান. ইরানে নিষেধাজ্ঞা জারী হওয়ার আগে পর্যন্ত তারা খনিজ তেল রপ্তানী করেছে দিনে ২২ লক্ষ ব্যারেল আর গত কয়েক মাসে তা ৭ লক্ষ ব্যারেলের বেশী হয় নি. কিছু অর্থনীতিবিদ যেমন মনে করেছেন যে, আহমাদিনিজাদ নিজের বদলীর জন্য অর্থনীতিকে যদি বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতে রেখে নাও গিয়ে থাকেন, তবে তা রয়েছে খুবই গভীর সঙ্কটের মধ্যে.

আহমাদিনিজাদের দ্বিতীয় বারের ক্ষমতা থাকার সময় আরও লক্ষ্য করা সম্ভব হয়েছে, তাঁর সঙ্গে দেশের সর্ব্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খোমেনেই এর সম্পর্ক জটিল হওয়া দিয়ে. রাষ্ট্রপতির পদে থাকার সময়ে আরও বেশী করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আহমাদিনিজাদ ধীরে ধীরে দায়িত্বশীল ম্যানেজারের ভূমিকা থেকে বেশী করেই স্বনির্ভরতা দেখাতে শুরু করেছিলেন মন্ত্রীসভার রাজনীতিতে, যাতে তিনি এমনকি চেষ্টা করেছিলেন দেশের নেতার নির্দেশ না মানার.

তাঁর আদর্শে খোমেইনি বাদের জায়গা নিয়েছিল জাতীয়তাবাদ, তা এমনকি ঐস্লামিক প্রবণতার চিহ্ন থাকা স্বত্ত্বেও. আর তাঁর আত্মীয়, বন্ধু ও সঙ্গী – ইসফানদিয়ার রহিম মাশাই, যাঁকে আহমাদিনিজাদ প্রথমে উপ রাষ্ট্রপতির পদে বসাতে চেয়েছিলেন, আর এখন চেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি পদ প্রার্থী হিসাবে এগিয়ে দিতে, তিনি একেবারেই দৃষ্টিকোণের বিষয়ে আলাদা রকমের, যা শিয়া অধ্যুষিত ইরানে মনে করা হতে পারে শয়তানের কারবারের সঙ্গে সীমান্ত সংলগ্ন বলেই. তিনি যেমন, ঘোষণা করেছিলেন যে, ধর্মীয় নেতাদের শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু তাঁরা রাজনীতিবিদ হতে পারেন না, আর তারই সঙ্গে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, ইরানের জনগন বিশ্বের সমস্ত জনগনের মিত্র, এমনকি ইজরায়েলেরও.

খুবই স্পষ্ট যে, আহমাদিনিজাদ চেষ্টা করেছিলেন ধর্মীয় নেতাদের ক্ষমতা সমাজের সর্ব স্তরেই সীমাবদ্ধ করে দেওয়ার, যাতে তা নিজেদের গোষ্ঠীর লোকদের হাতেই চলে আসে. বিগত দুই তিন বছরে আহমাদিনিজাদের রাজনীতি ও সব থেকে বেশী করে তাঁর ব্যবহার ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সমস্ত ক্ষমতার কাঠামোতেই কড়া প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়েছিল. আহমাদিনিজাদ দেশের পার্লামেন্টের সঙ্গে ঝগড়া করেছেন, বিচার ব্যবস্থার নেতৃত্বের সঙ্গেও তাঁর বিরোধ ছিল, আর এমনকি তাঁর নিজের ধর্মীয় শিক্ষাগুরু আয়াতোল্লা মিসবাহ ইয়াজদি তাঁর কাজে খুশী হতে পারেন নি, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল, আহমাদিনিজাদের সঙ্গে ঐস্লামিক বিপ্লব প্রহরী বাহিনীর জেনারেলদের বিরোধ, কারণ তিনি নিজেই একজন প্রাক্তন প্রহরী বাহিনীর নেতা.

কেন তাহলে ইরানের সর্ব্বোচ্চ নেতা তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে দেন নি? এর একটাই উত্তর, আর এটা ইরানের বিশ্লেষকরাই সমর্থন করেছেন, আয়াতোল্লা খোমেনেই দেশের পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে পশ্চিম, আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, “৫+১” গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধের জটিলতম সময়ে ভেতরের উচ্চ ক্ষমতার অলিন্দে কোনও বিস্ফোরণ চান নি.

কিন্তু এখন, সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, আহমাদিনিজাদের ক্যারিয়ার ডুবতে বসেছে. আসন্ন ভবিষ্যতে মনে তো হয় না যে, তাঁর সঙ্গী সাথীরা সেই ভূমিকা নিতে পারবেন, যা তাঁরা নিজেদের জন্য ঠিক করেছিলেন. আহমাদিনিজাদের আট বছরের রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে সমস্যা যা ইরানের সামনে উপস্থিত হয়েছে, তা খুবই তীক্ষ্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর এবারে তা ফলপ্রসূ ভাবে একটুও দেরী না করেই সমাধান করার দাবী করেছে.