ভারতীয় বিরোধী দলের ভেটেরান, ভারতীয় জনতা পার্টির এক পিতৃপ্রতিম নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণী দলের সমস্ত পদ থেকেই ইস্তফা দিয়েছেন. দলের নেতৃত্বের কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি নিজের এই চলে যাওয়ার কারণ হিসাবে বলেছেন বিজেপি দলের বর্তমান গন্তব্য পথের সঙ্গে কাঁর ব্যক্তিগত মতের অমিল. পর্যবেক্ষকরা এই পদক্ষেপকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ২০১৪ সালের নির্বাচনের দলীয় নেতৃত্বে প্রধান বলে বেছে নেওয়ার সঙ্গেই যোগ করেছেন. এই ভাবেই, বিজেপি দলের নেতৃত্বে সমস্ত লোকের জায়গা বদল হচ্ছে – পুরনো কর্তারা নতুন ঢেউয়ের রাজনীতিবিদদের জন্য নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন. “ঈগলের” মর্যাদা পাওয়া, লালকৃষ্ণ আডবাণীর চলে যাওয়ার সঙ্গে, বিজেপি এবারে সুযোগ পেয়েছে, নিজেদের এক মধ্যপন্থী শক্তির চেহারায় দাঁড় করানোর, যারা বিরোধ এড়িয়ে চলে ও সারা দেশ জুড়েই সমঝোতা ও সহমতের পথে বিশ্বাসী বলে দেখাতে চায়, এই রকম মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“যিনি ভারতের প্রাক্তন উপ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সেই ৮৫ বছরের প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণীর চিঠি, বিজেপির নেতৃত্বের কাছে পৌঁছেছে সোমবার – গোয়া শহরে বিজেপি দলের সারা ভারত সম্মেলন শেষ হওয়ার পরে. আডবাণী নিজে এই সম্মেলনে আসেন নি. এখানে প্রতিনিধিরা ২০১৪ সালের নির্বাচনের নেতা হিসাবে বেছে নিয়েছেন ৬২ বছরের নরেন্দ্র মোদীকে, যিনি গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী. আর ব্যাপারটা মোটেও দুর্বল স্বাস্থ্য অথবা অন্য কোন রকমের বাইরের পরিস্থিতির কারণে নয়. ভারতের সংবাদ মাধ্যমে এই রকমের একটা ধারণাও প্রকাশিত হয়েছিল যে, বিজেপি দলের এই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মোটেও অল্প রাগ করেন নি, সেই খবরে যে, পার্টির নেতারা নরেন্দ্র মোদীকেই নির্বাচনের মুখ্য বলে ঠিক করেছেন. যদিও মোদীকে এক সময়ে প্রায় আডবাণীর শিষ্য বলেই মনে করা হয়েছে, আজ দলের ভেটেরান সদস্য, সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, তাঁকে মোটেও ভারতের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখেন না ও মনে করেন না যে, তিনি বিজেপি দলের ঐতিহ্য বজায় রাখতে পারবেন”.

“বিজেপি দলের বেশীর ভাগ নেতাই নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত. এই পরিস্থিতিতে আমার পক্ষে খুবই কষ্টকর হবে মেনে নেওয়া যে, দল কিভাবে কাজ করছে ও কোন দিকে যাচ্ছে”, - লিখেছেন দলীয় নেতাদের লালকৃষ্ণ আডবাণী.

বিজেপি দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে আডবাণীর পার্টির কাজ কারবার থেকে সরে যাওয়াকে সমবেদনার সঙ্গে নেওয়া হয়েছে. দলের এক সরকারি প্রতিনিধি শ্রীকান্ত শর্মা সমাজকে আশ্বস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে গিয়ে বলেছেন যে, এই ইস্তফা আপাততঃ মেনে নেওয়া হয় নি, আর প্রত্যেক দলীয় নেতাই সব কিছু করবেন, তাঁকে থেকে যাওয়ার জন্য রাজী করাতে, এই প্রসঙ্গে তোমিন বলেছেন:

“বাইরে থেকে দেখলে, লালকৃষ্ণ আডবাণী বিরোধী এনডিএ জোটের নেতাই থেকে যাচ্ছেন, যাতে ১৩টি দল রয়েছে. আর তাঁর এই বিজেপি থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে ঘোষণা সাক্ষ্য দেয় যে, দলের নেতৃত্বে প্রজন্ম বদল হচ্ছে, আর তার আদর্শে যুগ পরিবর্তন হচ্ছে”.

লালকৃষ্ণ আডবাণীর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে উপরে ওঠা সময় গিয়েছে ২০০২ সালের জুলাই মাসে, যখন তাঁর নিকটতম সহকর্মী ও তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী, আডবাণীকে উপ প্রধানমন্ত্রী বলে ঘোষণা করেছিলেন. পর্যবেক্ষকরা এই নিয়োগের মধ্যে কট্টরপন্থী জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর শক্তি বেড়ে যাওয়াই দেখতে পেয়েছিলেন, যারা সেই সময়ে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি দলের জোটের ভিতরেই ছিল.

তাঁর সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়ে, যখন তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর পদ থেকে উপ প্রধানমন্ত্রীর পদে উন্নীত হয়েছিলেন, তখন মনে করা হয়েছিল যে, তিনিই অটল বিহারী বাজপেয়ীর পরবর্তী দলের মনোনীত নেতা. এই প্রসঙ্গে যদি বাজপেয়ীকে মনে করা হয়ে থাকে মধ্য পন্থী জাতীয়তাবাদী ও হিন্দু সাম্প্রদায়িক বলে, তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী থেকে উপ প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষেকের আগে থেকেই তাঁর সম্বন্ধে “ঈগলের” মর্যাদা যোগ হয়েছিল, - তা যেমন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে, তেমনই দেশের ভিতরের প্রশ্নেও.

তা এখন যাই হোক না কেন, আজ দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে যে, আডবাণী নামের সঙ্গে বিজেপি দলের অতীত জড়িত, কিন্তু তার বর্তমান বা ভবিষ্যত নয়. ২০১৪ সালের নির্বাচনে নতুন দলীয় নেতা নিজের জাতীয় নেতা হওয়ার ক্ষমতা প্রমাণ করতে বাধ্য থাকবেন, আর সেটা সারা ভারতের সকলের জন্যই, শুধু হিন্দুদের জন্য নয়. আডবাণী ও তাঁর প্রজন্মের লোকদের সময় চলে গিয়েছে, ঐতিহাসিক ও স্মৃতিকথা লেখার লোকদের জন্য অজস্র সম্পদ পূর্ণ খোরাকির ব্যবস্থা রেখে.