গত সপ্তাহের শেষে চিনের দক্ষিণ প্রদেশ ইউনানের রাজধানী কুনমিনে “নীল বই (ব্লু বুক)” প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে খুবই সবিস্তারে ভারত মহাসাগর নিয়ে চিনের স্ট্র্যাটেজি প্রথমবার জানানো হয়েছে. এই বই উপস্থিত করার সময় আবার সেই কুনমিনে ইতিহাসে প্রথমবার দক্ষিণ এশিয়া প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়েছে.

এই প্রদর্শনীতে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সমস্ত দেশই অংশ নিয়েছে – শুধু ভারত ছাড়া. আর যদিও প্রকাশ্য বক্তৃতার সময়ে চিনের সমস্ত সরকারি কর্তার ভাষায় ও “নীল বইয়ের” বয়ানে বলা হয়েছে ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় চিনের তরফ থেকে শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যের কথা, ভারতে কিন্তু বেশীর ভাগ পর্যবেক্ষকই চিনের ভারতের প্রতিবেশী সমস্ত দেশের সঙ্গেই অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রসারের পরিপ্রেক্ষিতে এই “নীল বই” প্রকাশকে দেখেছেন স্পষ্টই এক অমিত্র সুলভ সঙ্কেত হিসাবে.

“নীল বই” চিনের তরফ থেকে ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী সমস্ত দেশের সঙ্গেই সহযোগিতা প্রসারের ও তাকে আরও গভীর করার লক্ষ্যের ভিত্তি প্রকট করেছে ও বিশেষ করে উল্লেখ করেছে যে, চিন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই এগিয়েছে, কোনো সামরিক উদ্দেশ্য নিয়ে নয়. এই প্রসঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে যে, ভারত মহাসাগর এক “বিরোধ ও বিপর্যয়ের” এলাকায় পরিণত হতে পারে যদি সেই সমস্ত দেশ, যেমন, ভারত, চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানে তাদের স্বার্থের একে অপরকে ছুঁয়ে যাওয়া রয়েছে সেই সব প্রশ্নে আরও গঠন মূলক ভাবে সহযোগিতার পথে না চলে. আর একই সময়ে এই বইয়ের লেখকরা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে, যদি ভারতের “পূর্বের দিকে তাকাও” নামের নীতি থাকে, তবে চিনের কিন্তু ভারত মহাসাগর নিয়ে কোনও রাজনীতি নেই. কিন্তু “নীল বইয়ের” লেখকরা স্পষ্টই চাতুর্য করছেন, বিশেষত যখন তারা “মুক্তামালা” নীতিকেই একটি কাল্পনিক নীতি বলে উল্লেখ করেছেন, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

এ”টা ঠিক যে, ভারত মহাসাগর এলাকায় নিজেদের স্ট্র্যাটেজি চিনের লোকেরা নিজেরাই পছন্দ করেন না “মুক্তামালা” নীতি নামে বলতে – এটা এসেছে ইংরাজী ভাষার লেখা থেকে. কিন্তু কোন না থাকার মানে এই নয় যে, স্ট্র্যাটেজি নেই. চিন সত্যই নিজেদের নির্ভর করার মতো জায়গার শৃঙ্খল তৈরী করছে – বন্দর, জাহাজ ভর্তি করার স্টেশন, রেডিও ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয় করার স্টেশন ইত্যাদি – আর তা ভারত মহাসাগরের সমস্ত উত্তরের অংশে পূর্ব আফ্রিকার তীর থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার তীর অবধি ছড়ানো”.

চিন তাদের কার্বোহাইড্রেট যৌগ আমদানীর শতকরা ৮০ ভাগই পায় আফ্রিকা ও নিকটপ্রাচ্যের দেশ গুলি থেকে. আর তা পরিবহনের রাস্তা ভারত মহাসাগর দিয়েই হয়ে থাকে চিনের একেবারে নিজেদের তীর ধোয়া সমুদ্র তীর অবধি পৌঁছবার জন্য সেই নাতি প্রশস্ত মালাক্কা প্রণালী হয়ে.

স্বাভাবিক ভাবেই চিনের প্রধান স্ট্র্যাটেজিক আগ্রহ তাই নিজেদের তীরের কাছেই বেশী করে রয়েছে: এটা সেই পুরনো হয়ে যাওয়া তাইওয়ান নিয়ে সমস্যা, আর সেই সব সমস্যা, যা বিগত সময়ে বেশী করেই আবার বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রতিবেশী দক্ষিণ চিন সাগর ও পূর্ব চিন সাগরের রাষ্ট্র গুলির সঙ্গে আগে থেকেই ছিল. কিন্তু আবার কোরিয়া উপদ্বীপ এলাকাতেও বিস্ফোরক পরিস্থিতিকে হিসাব থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে না.

এবারে নিজেরা এক মুহূর্তের জন্য চিন্তা করে দেখতে পারি যে, ঘটনা পরম্পরা সবচেয়ে খারাপ চিত্রনাট্য অনুযায়ী হবে ও এই ধরনের যে কোন একটি বিরোধ পরিস্থিতি চিন ও তাদের প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে খোলাখুলি সংঘর্ষে পরিণত হবে, আর তাদের পক্ষে তত্ক্ষণাত অবশ্যম্ভাবী ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এসে দাঁড়াবে, তাহলে বরিস ভলখোনস্কি মন্তব্য করে বলেছেন:

“মালাক্কা প্রণালী তুলনামূলক ভাবে কম শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারবে প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই চিনকে জ্বালানী শক্তির চাহিদা পূরণ করতে না দিতে ও তা দিয়ে চিনকে রক্ত শূণ্য করে দিতে. এটা চিনকে বাধ্য করেছে জ্বালানী শক্তি অন্য পথে নিয়ে আসার পথ খুঁজতে – ভূমি পৃষ্ঠ দিয়ে – পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মায়ানমার হয়ে, আর তারই সঙ্গে বর্তমানের সমুদ্র পথের পাশাপাশি নির্ভর যোগ্য কেন্দ্র তৈরী করতে”.

বর্তমানের বিশ্বে অর্থনীতি এত বেশী ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত যে, চিনের এই “মুক্তামালা” নীতি অনুযায়ী বানানো প্রত্যেক জায়গাই কম করে হলেও দুই রকমের কাজেই ব্যবহার যোগ্য হতে পারে. আর তাই বোধগম্য, কেন ভারত এই পরিকল্পনার প্রতি এত আশঙ্কা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে.

“নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস” সংবাদপত্র চিনের “নীল বই” প্রকাশ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এক প্রবন্ধ প্রকাশ করে, নাম দিয়েছে, “চিনের বিষয়ে ভারতের নীতি ঠিক করার সময় এসেছে”. এই প্রবন্ধে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে চিনের “শঠতা পূর্ণ পরিকল্পনার” ও “হুমকি ভরা ধান্ধার” কথা আর তাদের “নিজস্ব অসত্ উদ্দেশ্য লুকিয়ে রাখার চেষ্টার” কথা.

ভরতের সংবাদ মাধ্যমের কথা জাপানও বলেছে. “জাপান টাইমস” সংবাদপত্র একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে তার আবার নাম আরও বেশী জোরালো – “সব কিছুই স্বর্গের নীচে: বৃহত্ চিন এলাকা কাঁপাচ্ছে”.

সুতরাং মনে তো হয় না যে, কুনমিনে উচ্চারিত শান্ত হওয়ার জন্য ঘোষণা চিনের এই এলাকার জন্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জাপান অথবা ভারতকে শান্ত করবে.