প্রথম মহাকাশযাত্রী নারী ভালেন্তিনা তেরেশকোভার মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার ৫০ বছর পূর্ণ হবে আগামী ১৬ই জুন. মহাকাশে প্রথম পদক্ষেপ, রেকর্ড, আবিষ্কার - সবকিছুর কৃতিত্বই রুশী-সোভিয়েত মহাকাশচারীদের.

    সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়া থেকে বিগত ৫০ বছরে তিনজন নারী মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন - ভালেন্তিনা তেরেশকোভা ১৯৬৩ সালে, তার উনিশ বছর পরে স্ভেতলানা সাভিত্স্কায়া, আর তারও ১২ বছর পরে ইলেনা কনদাকোভা. সেটা ছিল যুগান্তকারী, নতুন আবিষ্কার এবং অভূতপূর্ব মানবকীর্তি - 'রেডিও রাশিয়া'কে দেওয়া ইন্টারভিউয়ে সে কথাই বলছেন ত্সিওলকোভস্কির নামাঙ্কিত রাশিয়ান কসমস অ্যাকাডেমির সম্মানীয় কর্মী ইগর মারিনিন.-

    ভালেন্তিনা তেরেশকোভার প্রথম মহাকাশ উড়ান ছিল পরীক্ষা - নারী অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কি রকম প্রতিক্রিয়া হবে ভারশূন্যতায় এবং মেয়েরা কি পারবে পুরুষদের মতো মহাকাশযান চালানোর জন্য অপরিহার্য কঠোর শারিরীক পরিশ্রমের চাপ নিতে? পরীক্ষা প্রমাণ করে দিল, যে মহাকাশ যাত্রা কঠোর পুরুশালী কাজ এবং মেয়েদের এমতাবস্থায় পুরোপুরি সফল হওয়া দুষ্কর. পরবর্তী ধাপ - গ্লুশকো মহাকাশে ঠিক পুরুষদের মতোই মহিলাদেরও ব্যবহার করতে চাচ্ছিলেন. ১৯৮০ সালে তিনি বেশ বড় একদল ইঞ্জিনীয়ার, ডাক্তার, পাইলট নারীদের বেছে নিলেন. কিন্তু প্রস্তুতিপর্ব প্রমাণ করে দিল, যে ইউরি গাগারিনের প্রথম মহাকাশ যাত্রার পরে প্রায় ২০ বছর অতিক্রান্ত হলেও মহাকাশ উড়ান কিন্তু তখনও বাস্তবিকই অত্যন্ত কঠোর পুরুষালী কাজ. তাই যে কোনো মেয়েকে দিয়ে কঠোর মহাকাশযাত্রা সম্ভব নয়. একমাত্র স্ভেতলানা সাভিত্স্কায়া দেখা গেল, যে পুরোপুরি যোগ্যা. তিনি আমেরিকার স্যালি রাইটকে ছাপিয়ে গিয়ে মহাকাশ ঘুরে এলেন. স্যালি কেবলমাত্র শ্যাটলে মহাকাশ পাড়ি দিয়েছিলেন. তার দ্বিতীয় মহাকাশ সফরে সাভিত্স্কায়া আরও একটা নতুন নজীর গড়লেন - তিনিই প্রথম নারী, যিনি উন্মুক্ত মহাকাশে নির্গমন করেছিলেন. এটাও ছিল অভূতপূর্ব, মেয়েরা মেতে উঠেছিল আরও নতুন নজীর গড়ার নেশায়. ইলেনা কনদাকোভা ছিলেন প্রথম নারী, যিনি দীর্ঘমেয়াদী মহাকাশ অভিযান সুসম্পন্ন করেছিলেন.

   ১৯৬০ ও ৮০-র দশকে মেয়েদের মহাকাশ উড়ানকে সর্বজনীন করে তোলার হুজুগ উঠেছিল. মহাকাশচারীদের প্রশিক্ষণ পল্লী 'স্টার সিটি'তে দলে দলে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল. প্রথমদিকে প্রার্থীদের যোগ্যতা নির্ণয়ের মাপকাঠি ঠিল খুব উঁচু - উচ্চতা হতে হবে ১ মিটার ৭০ সেন্টিমিটারের কম, ওজন ৭০ কিলোগ্রামের মধ্যে এবং অবশ্যই প্রার্থীকে প্যারাশুট ট্রুপারের সংশাধারী হতে হবে. বাছাইয়ের পরে শুরু হতো দীর্ঘ কালব্যাপী কঠোর শারিরীক প্রশিক্ষণ. এই সম্পর্কে বিষদে গল্প করছেন ইলেনা দব্রাকোশিনা, যিনি এরকম প্রশিক্ষণ সূচীতে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন. শুনুন তার বৃত্তান্ত -

   আমি ক্রীড়াজগতের মেয়ে ছিলাম না. আমার কখনো স্পোর্টস নিয়ে উদ্দীপনা ছিল না বা আমি তার চর্চাও করিনি. তাই ব্রিগেডে যোগ দেওয়ার পরে আমি অথৈ জলে পড়েছিলাম. যে শারিরীক ক্ষমতা প্রয়োগ করা বাধ্যতামুলক ছিল, আমি তা মেটাতে হিমশিম খেতাম. উপরন্তু আমি ছিলাম পেশায় ডাক্তার. তাই ব্যালেস্টিক ফিজিক্স, মোশান ডাইনামিক্স থিয়োরির মতো টেকনিক্যাল বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়া আমার পক্ষে ছিল খুবই কষ্টসাধ্য.

   পরবর্তীতে চাপ খানিকটা কমানো হয়েছিল, বিশেষতঃ শারিরীক প্রস্তুতির দিক থেকে. আসল ছিল, যে প্রার্থী যেন কক্ষপথে পরিক্রমণের জন্য যথেষ্ট স্বাস্থ্যবতী ও কর্মক্ষম হয়. প্রার্থী যেন ডাক্তার অথবা ইঞিজিনীয়ার হয়. কিন্তু অনুপ্রেরণা ছিল আগের মতোই - রোম্যান্টিক হতে হবে ও আবিষ্কারের আকূতি থাকতে হবে. এই প্রসঙ্গে বলছেন নাদেঝদা কুঝেলনায়া, যিনি ঐ সূচীতে ১০ বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তবুও মহাকাশ তার কাছে অধরাই থেকে গেল. -

   আমার মনে হতো অন্যান্য গ্রহ আমার আয়ত্তের মধ্যেই, কেন নয়? কিন্তু আমি বিনয়ী ছিলাম, তাই কাউকে সেকথা বলতাম না. যে সব বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী আমি পড়ি, তাদের নায়িকারা অনায়াসে অসাধ্য সাধন করে. আমারও মনে হতো আমিই বা কেন পারবো না. তবে আগে যদি আমি নীচ থেকে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে স্বপ্নাপ্লুত হোতাম, তবে অতঃপর আমি মহাকাশটাকে সব মাত্রায় মেপে বোঝার চেষ্টা করি.

   পরবর্তী রুশী মহিলা মহাকাশচারী হতে পারেন ইলেনা সেরোভা. তার জন্য পরিকল্পিত মহাকাশ যাত্রা ২০১৪ সালের শরত্কালে. ইলেনার স্বামীও মহাকাশচারী. তাদের স্বপ্ন কোনো একদিন একসাথে মহাকাশ পাড়ি দেওয়ার. সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িতও হতে পারে, কারণ এখন সুদূর অন্য গ্রহের লক্ষ্যে সুদীর্ঘকালীন অভিযানের জন্য বিজ্ঞানীরা ভাবছেন গোটা পরিবার পাঠানোর ব্যাপারে.