সিরিয়ার সংকট নিরসণ নিয়ে যে শান্তি সম্মেলন আয়োজনের প্রক্রিয়া চলছে তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সিরিয়ার ন্যাশনাল কাউন্সিল বাশার আসাদের সাথে আলোচনায় বসাকে গত শুক্রবার নিস্ফল বলে অবহিত করেছে। জেনেভা-২ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র দুইদিন পরে এ ঘোষণা এসেছে। আর ওদিকে পুরো সপ্তাহজুড়ে সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় এল-কুসেইরে বিদ্রোহীদের সাথে সিরীয় আর্মির সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

লিবিয়ার সাথে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আরো কয়েক কিলোমিটার দূরে স্ট্রাটেজিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই এল-কুসেইর। একবছরেরও বেশি সময়ে ধরে তা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সিরিয়ার এ শহরের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর দমন-নীপিড়নের অভিযোগে চলতি সপ্তাহের শুরু দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্বের দায়িত্বে থাকা যুক্তরাজ্য একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করতে চেয়ছিল। তবে রাশিয়া তাতে ভেটো দেয় এবং কারণ হিসেবে বলা হয়, এল-কুসেইরে বর্তমানে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলছে। ওদিকে ওয়াশিংটন দামাস্কাসকে দোষী সাব্যস্থ করে জানায়, এতে অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে। এসই সাথে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইরানি যোদ্ধা ও লেবাননের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল্লাহার সাহায্য ছাড়া সিরীয় সরকার এ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে না। আর যখন এ প্রসঙ্গে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলো তখন মন্ত্রী একে পশ্চিমা জোটের চুক্তি-তর্কের ভুল মতধারা বলে বর্ননা করেছেন। তিনি বলেছেন, "যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা মনে করেন যে, সিরীয় সৈন্যরা যুদ্ধের মাঠে নিজেদের যোগ্যতাহীন মনে করে এবং এর জন্য অন্যদের কাছ থেকে সাহায্যের প্রয়োজন হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, অস্ত্রধারী বিরোধী দলকে ভাল প্রশিক্ষন ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেছে। এছাড়া তথ্য রয়েছে যে, এসব অস্ত্রধারী দলগুলোকে বিদেশি প্রশিক্ষক দিয়ে যুদ্ধের জন্য তৈরা করা হয়।"

শুক্রবার ইসলামী সম্মেলন সংস্থার মহাসচিবের সাথে এক বৈঠকে সেরগেই ল্যাভরোভ পুনরায় আন্তর্জাতিক কমিউনিটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে বলেন যে, তারা আসলে কি চায়?। সিরিয়ার সংকট শান্তিপূর্ণ সমাধান নাকি শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতার পালা বদল। যদি রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধান করতে চাওয়া হয় তাহলে সংঘাত খুব শীগ্রই বন্ধ হবে।

জেনেভা-২ সম্মেলনে সিরিয়ার শাসন ক্ষমতা নাকি বিরোধীদলের হাতে তুলে দেয়া হবে এবং রাশিয়া এতে সমর্থন জানিয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র যে বিবৃতি দিয়েছে তার বিরোধীতা করেছে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে ল্যাভরোভ বলেন, "যদি সত্যিই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে এই বিবৃতি করা হয়ে তাকে তাহলে তা অপেক্ষাকৃত বেশি বিকৃতকরে বলা হয়েছে। সরকার পূনর্গঠন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের ঐক্যমত পৌঁছানো তার এক অর্থ আর সরকার পূনর্গঠন করতে বিরোধী দলের কাছে সরকারের ক্ষমতা তুলে দেওয়ার অন্য অর্থ রয়েছে। আপনিও একমত হবেন আমার সাথে।"

চলতি সপ্তাহজুড়ে এক অর্থে সিরিয়া সংকট নিয়ে বিভিন্ন্ বিবৃতি ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করতে দেখা গেছে। যেমনঃ ফ্রি সিরিয়ান আর্মির পক্ষ থেকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বরাবর একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। আর এতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে রাশিয়ার বাড়াবাড়ি বন্ধ করতে মস্কোর কাছে দাবী জানানো হয়েছে। এর পরেই গোলান মালভূমিতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলা করে অস্ত্রধারী বিদ্রোহীরা। আর এ কারণেই অস্ট্রিয়া এখানে থাকা তাদের সব সৈন্যদের ফিরিয়ে নেওয়া ঘোষণা দেয়। পরে কানাডা, ক্রোয়েশিয়া ও জাপান অনুরুপ সিদ্ধান্ত নেয়।

এদিকে রাশিয়া গোলান মালভূমিতে রুশ সেনা মোতায়েন করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে শুক্রবার দেয়া বিবৃতিতে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন। সিরিয়ার বিরোধী দলের সমর্থন করা জোটদেশগুলো এ সব ঘটনা হয়তো দেখতে পায় না। শুধু তাই নয়, গত সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সিরিয়ার বিরোধী দলের ওপর থেকে অস্ত্র সরবরাহের নিষেধাজ্ঞা তুল নিয়েছে। সিরিয়ার অস্ত্র সরবরাহ তা কোন আন্তর্জাতিক আইনকে অমান্য করা হচ্ছে তা নিয়ে রাশিয়া কখনোই কোন মন্তব্য করেনি। মস্কো সিরিয়াকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৩০০ দেয়া নিয়ে যে সমালোচনা করা হয়েছে সে প্রসঙ্গের ইতি টেনেছেন পুতিন। সম্প্রতি রাশিয়া-ইইউ সামিটে এ প্রসঙ্গে পুতিন বলেন, "বিশ্বের অন্যতম শেষ্ঠ্র ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলো এস-৩০০ আমরা এ অ ঞ্চলে ভারসাম্য নষ্ট করতে চাই না। সিরিয়ার সাথে কয়েক বছর আগে এ নিয়ে চুক্তিপত্র সই হয়েছিল কিন্তু পুরোপুরি তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।"

সিরিয়ার চিত্রপট নিয়ে আরো একটি বিতর্ক রয়েছে রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে। তবে আপাতত উত্তরের চেয়ে প্রশ্ন বেশি। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস জানায় যে, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সিরীয় সেনাদের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা নিয়ে ফ্রান্সের কাছ থেকে সম্প্রতি প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও বিদ্রোহীদের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে নতুন কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।