তুরস্কে চলমান গণআন্দোলন চলতি সপ্তাহজুড়ে আরো নতুন শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। শুরু হওয়া সামাজিক আন্দোলন এখন পুরোটাই রুপ নিয়েছে রাজনৈতিক আন্দোলনে। যদিও হাজার হাজার বিক্ষোভকারীদের নিয়ে নতুন আন্দোলন শুরুর সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশের সাথে সংঘর্ষের খবর পাওয়া আসছে। প্রাকৃতিক সমস্যা নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলন তা মনে হচ্ছে আরো অনেক দূর গড়াবে।

শুরুটা হয়েছিল একদমই আর কয়েকটা বড় মহানগরীর জন্য সাধারণ একটা পরিস্থিতি নিয়ে। ইস্তাম্বুলের একটি পার্কে ধ্বংস করে ভবন নির্মাণের বিরোধীতা করে জনগন। তাঁরা রাস্তায় বেড়িয়ে পড়ে। আর তা খুব দ্রুত স্থানীয় একটি সমস্যা দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে সরকারের পতন আন্দোলনের রুপ দেয়। আগুনে তেল দেয়ার কাজটি করেছে তুর্কি পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের কঠোর অবস্থান আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তোলে। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে রক্তপাত ও কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।

উল্লেখ্য, ইস্তামবুলের তাকসিম স্কয়ার সংলগ্ন গেজি পার্ক, যেখানে ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক।

আর এ স্থাপনাটি ভেঙে সরকার নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানায় স্থানীয়রা।

চলমান আন্দোলনের পিছনে ধর্মীয় প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করছেন মস্কো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইন্সটটিউটের প্রফেসর সেরগেই দ্রুজিলোভস্কী। রেডিও রাশিয়াকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, “শতকরা ৩০ ভাগ জনগন কেমালিজম বা উগ্রবাদী ধর্মনিরপেক্ষতা মতান্তরে ইসলামবিদ্বেষ চালু রাখাকে সমর্থন করছে এবং অপর ৩০ ভাগ জনগন সবকিছু পরিবর্তন চাচ্ছে। আর তৃত্বীয় দলে যারা আছেন তারা গ্রামে বাস করছেন যাদের সংখ্যায়িত করার প্রয়োজন নেই। আমি মনে করি, রাস্তায় ইসলামিক উগ্রবাদীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেখা যাবে না, কারন এটা হচ্ছে গৃহযুদ্ধ। তাই সরকার প্রয়োজন বোধে সবকিছু করতে প্রস্তুত থাকবে এবং হয়তবা তাদেরকে আলোচনায় বসার আহবান জানাবে। তাছাড়া আরব বসন্ত ও পাশ্ববর্তী সিরিয়ার ঘটনাবলীর কারণে সরকারকে নতুন নতুন আইন জারি করতে হচ্ছে। আমি মনে করি আন্দোলন-বিক্ষোভ হওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে।“

অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় মতপার্থক্য থাকলেও আরো কিছু সূত্র রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছে যে, এ্যলকোহল সেবনের ওপর সরকারের কড়াকড়ি আইন জারি করায় লোকজন অসন্তুষ্ট থাকার ফলাফল হচ্ছে জুন মাসের বিক্ষোভ। আবার কেউ মনে করছে তুরস্কে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা বাতিল ও প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু করার কারণ হতে পারে। শুধু তাই নয়, তুরস্কের অর্থনীতি বৃদ্ধি নিয়ে মতামত রয়েছে। দেশটিতে আন্দোলনরত মধ্যম শ্রেনী যারা ইউরোপীয় সমাজের আদলে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে চাচ্ছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে বিতর্ক রয়েছে। সবার প্রথমেই বলা যেতে পারে যে, সিরিয়ার আসাদ সরকারের বিরোধী পক্ষকে সরাসরি সাহায্য করা।

তবে চলমান আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় প্রভাব ফেলবে। পরিস্থিতি কোন দিকে গিয়ে গড়াবে তা এখনই স্পষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

রেডিও রাশিয়ার পর্যবেক্ষক ওলগা খালদিজ তুরস্কের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ শুরু হওয়ার দিন থেকেই পরিস্থিতির খোঁজ খবর রাখছেন। তিনি কয়েকজন খ্যাতিমান তুর্কি সাংবাদিকদের সাথে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। ওলগা খালদিজ বলেন, “স্থানীয় তুর্কি গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়, তুরস্কে এটি প্রথম এ ধরণের কোন বিক্ষোভ যা কোন দল বা গোষ্ঠীর উদ্দ্যোগে করা হয় নি। ক্ষমতাসীন দল জাষ্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি(একেপি) সরকার গঠন হওয়ার ১০ বছরের মধ্যে এটিই বৃহত কোন বিক্ষোভ যা এখন প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের পদত্যাগ আন্দোলনে রুপ নিয়েছে। পূর্বে তুর্কি জনগনের এ ধরণের চরিত্র দেখা যায় নি। তুরস্ক একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে দেশটির সাংবাদিকরা উল্লেখ করেছেন।“

প্রসঙ্গত, তুরস্কে জনগণ প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি ভোট না দিয়ে দলের পক্ষে ভোট দেন। দলের পক্ষ থেকে অবশ্য প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। আর ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রীর দল একেপির পক্ষে ৫০ শতাংশ ভোট পড়েনি। আর সর্বশেষ ঘটনাবলী থেকে অনুমান করা যাচ্ছে যে বিরোধী দলের সাথে সংলাপ অত্যন্ত কঠিন ভাষায় হবে।