বৃহস্পতিবারে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি থাইল্যান্ডে সফরের সময়ে এই দেশকে অস্ত্র নির্মাণে ভারতীয় সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন ও একই সঙ্গে মন্তব্য করেছেন “আন্তর্জাতিক জলসীমায় সমুদ্রে চলাফেরার স্বাধীনতা” প্রসঙ্গে. ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর করা এই দুটি ঘোষণাকেই শুধু ভারত- থাইল্যান্ড দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে দেখা ঠিক হবে না, আর আরও প্রসারিত ভাবে তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ক্ষমতা বিস্তারের প্রতিযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতেই দেখার প্রয়োজন রয়েছে, আর ভারত ও চিনের মতো দুই এশিয়ার বৃহত্ রাষ্ট্রের প্রতিযোগিতায় থাইল্যান্ডকে বিশেষ জায়গা দেওয়া হয়েছে.

উল্লেখযোগ্য হল যে, এ কে অ্যান্টনি নিজের থাইল্যান্ড সফর করছেন আরও দুটি রাষ্ট্র সফরের পরে – অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের পরে, যারা ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগ স্থলে জলসীমায় নিরাপত্তার প্রশ্নে সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করে এসেছে. দুই দেশই বারাক ওবামা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার দিকে “ঘুরে দাঁড়ানোর” বিষয়ে ঘোষণা করার পর থেকে আমেরিকার সামরিক বাহিনীর থাকার মঞ্চ হয়েছে: সিঙ্গাপুরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের এক স্থায়ী ঘাঁটি গেড়ে থাকার জায়গায় পরিণত করা হচ্ছে, আর অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন এলাকায় ঘাঁটি তৈরী হয়েছে আড়াই হাজার সামুদ্রিক পদাতিক বাহিনীর. সিঙ্গাপুরে থাকা জাহাজ গুলি, খুবই সহজে মালাক্কা প্রণালীকে বন্ধ করে দিতে পারে, আর সামুদ্রিক বাহিনীর যোদ্ধারা সহজেই অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূল থেকে সুন্ডা জলসন্ধি এলাকায় চলে আসতে পারে – যা আবার চিনের জন্য মালাক্কা প্রণালীর বিকল্প পথ হতে পারে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী দেশে খনিজ তেল ও গ্যাস আনার জন্য. আর এবারে এই থাইল্যান্ড – সেটাও এমন দেশ, যারা একই সঙ্গে দুটি মহাসমুদ্রের জলে ধোয়া – ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে. জ্বালানী পরিবহনের জন্য বিকল্প পথ খোঁজার জন্য চিনের স্ট্র্যাটেজিতে থাইল্যান্ডকে অন্যান্য দেশের তুলনায় কম গুরুত্ব, তাদের ভারত মহাসাগরের “মুক্তামালা” নীতিতে দেওয়া হয় নি. থাইল্যান্ডের মধ্যে দিয়েই গিয়েছে ক্রা যোজক, যেখানে একটি চ্যানেল খোলার কথা হচ্ছে, যা করা গেলে আমেরিকার সামুদ্রিক সেনা বাহিনী ও জলদস্যূ অধ্যুষিত মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে চিনের জাহাজ যাতায়াত করতে পারত. এই প্রণালী তৈরীর প্রকল্প – খুবই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও তা পানামা প্রণালীর সঙ্গে তুলনা করার মতো, তাই রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারত মহাসাগরের পূর্বের এলাকা ও প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমের এলাকায় প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ের প্রসঙ্গেই ভারতের মন্ত্রীর পক্ষ থেকে থাইল্যান্ডকে অস্ত্র নির্মাণে সহায়তা ও স্বাধীন সমুদ্র বিচরণের ঘোষণাকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে. বিশেষ করে যখন চিন শক্তি বৃদ্ধি করছে দক্ষিণ-চিন সাগরে ও ভারত কোন রকমের দ্বিমুখী অর্থ না করেই এই এলাকায় সেই সব দেশ গুলিকে সহায়তা করছে, যে দেশেরই চিনের সঙ্গে রয়েছে এলাকা সংক্রান্ত বিরোধ”.

এখানে গুরুত্বপূর্ণ হবে উল্লেখ করলে যে, সেই সময়ে যখন ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এই তিনটি দেশ সফর করছেন, যে গুলি দুই মহাসমুদ্রের সংযোগ স্থলে রয়েছে, তখনই শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী আনন্দ শর্মা এসেছেন মায়ানমারে পূর্ব এশিয়া নিয়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্মেলনে যোগ দিতে. এই সফরের সময়ে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ভারত, মায়ানমার ও থাইল্যান্ডকে যোগ করা বিশাল সড়ক পরিবহন প্রকল্প ২০১৫- ২০১৬ সালে বাস্তবায়ন করা হবে. এই দিয়েই ভারত চাইছে, আরও মজবুত করে থাইল্যান্ডের সঙ্গে নিজেদের জুড়ে দিতে, আর তার সঙ্গে মায়ানমারের সঙ্গেও, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই এলাকায় বড় এক রাজনৈতিক খেলায় মায়ানমার একেবারেই বিশেষ এক ভূমিকা পালন করছে. এই দেশ, ৩০ বছর ধরে সামরিক স্বৈর তন্ত্রের পরিস্থিতিতে থাকার পরে, যখন সমস্ত সময়টাই তারা ছিল চিনের প্রভাবে আর চিনই তাদের জন্য ছিল প্রধান পৃষ্ঠপোষক দেশ, বর্তমানে গণতান্ত্রিক পথে চলতে শুরু করেছে. চিন এর মধ্যেই সেখানে আন্দামান সাগরের চৌফ্যু বন্দর থেকে নিজেদের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত গ্যাস ও খনিজ তেলের পাইপ লাইন বসিয়েছে, পরিকাঠামো তৈরী করেছে ও গভীর সমুদ্র বন্দর সহ তেল পরিশোধনের কারখানা বসাচ্ছে. গ্যাস পাইপ লাইন মে মাসে খোলা হয়েছে আর দুই তিন মাস পরেই খনিজ তেলের পাইপ লাইন চালু হতে শুরু করবে”.

মাত্র শেষ দুই বছরে মায়ানমার পশ্চিমের রাজনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীদের জন্য খুলেছে. আর সেটাও দেখার মতো ঘটনা যে, এই বছরেরই এপ্রিল মাসে “হঠাত্” করেই দেখতে পাওয়া গেল যে, চিনের গ্যাস পাইপ লাইনের জোড়াতে এমন জায়গা রয়েছে, যেখান থেকে সম্ভবতঃ গ্যাস বের হয়ে যেতে পারে. আর ঠিক “তখনই” স্থানীয় জনতার পক্ষ থেকে চিনের গ্যাস ও তেল পাইপ লাইনের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে প্রতিবাদ “বিক্ষোভের ঢেউ” – তারই সঙ্গে যোগ হয়েছে ধর্মীয় কারণে সংঘর্ষ, যা এই ইতিহাসের সঙ্গে নাকি কোন রকমের সম্পর্ক রাখে না. প্রভাবের জন্য লড়াই – আর তা শুধু আঞ্চলিক রাষ্ট্র গুলির মধ্যেই নয়, বরং এই অঞ্চলের বাইরের শক্তিদের মধ্যেও, যেখানে প্রাথমিক ভাবে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তা খালি তীক্ষ্ণই হচ্ছে. আর মনে হতে পারে যে, স্পষ্ট অর্থনৈতিক পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্প এখানে প্রধান ক্রীড়নকদের হাতে খুবই শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে লড়াইয়ের মঞ্চে.