পাকিস্তান মুসলিম লীগের(পিএমএল-এন)প্রধান নওয়াজ শরিফের বিজয় নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হয়ত নতুন স্বাধীন নিরপক্ষ পথে এগিয়ে চলার প্রেরনা যোগাবে। তবে, গুরুত্ব পাচ্ছে যে, নতুন সরকার নিজেকে কিভাবে উপস্থাপন করবে তা পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ পাক-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু সেই সাথে আশংকাও বিরাজ করছে। অতীতে দুই দেশের মধ্যে বহু বিরোধপূর্ণ ঘটনা থাকায় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে পৌঁছানো খুব একটা সহজ হবে না।

যদি নওয়াজ শরিফের প্রথম বিবৃতিতের দিকে তাকানো যায় তাহলে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি ভারতের সাথে নতুন উদ্দ্যমে আরো সুসম্পর্ক তৈরীতে প্রস্তুত রয়েছেন। এ বিবৃতি ভারতেরও দৃষ্টি আকর্ষন করেছে।

কিন্তু, নওয়াজ শরিফের দলের বিজয় অর্জনের পর প্রথম ঘটনা প্রমাণ করলো যে, সব কিছু নতুন প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করছে না। এখানে উল্লেখ করা যায়, যেমনঃ মার্কিন ড্রোন হামলা বন্ধ করা ও পাকিস্তানের তালেবান সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সাথে আলোচনা শুরু করা। গত ২৯ মে মার্কিন ড্রোন হামলায় তেহরিক-ই-তালেবান দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা নিহত হয়. এরপরে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতিতে সরকারের সাথে কোন প্রকার আলোচনায় বসতে অস্বীকার করেছে। আর সরকার ও নতুন প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্র প্রদর্শন করলো যে, পাকিস্তানের যে কোন কঠোর হুশিয়ারি আগামীতেও প্রত্যাখান করা হবে যেমনটি ছিল আসিফ আলি জারদারির রাষ্ট্রপতিত্বকালে।

ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন নিয়ে আরো সক্রিয় আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে এবং ভবিষ্যত রাষ্ট্রপতির প্রার্থীদের নির্বাচন করা হবে। তবে পরিষ্কার যে, নওয়াজ শরিফ ওই পদের দায়িত্বে যাবেন না। তবে নিজের লোককেই তিনি ওই পদে বসাবেন বলে মনে করছেন রাশিয়ার স্ট্রাটেজিক ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভালখোনস্কী। তিনি রেডিও রাশিয়াকে বলেছেন, "এখন পর্যন্ত কে ওই পদের দায়িত্ব নিতে চান তাদের সংখ্যা অনেক। পাকিস্তানের কিছু অংশ নওয়াজ শরিফকে অনুরোধ করছেন যেন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচন করা হয় দেশটির পারমানবিক প্রকল্পের পিতা আবদুল কাদির খানকে। যদি প্রধানমন্ত্রীর এ পচ্ছন্দ অপরিবর্তিত থাকে তাহলে এটি পৃথিবীর জন্য দুমখো প্রতিশ্রুতি হবে না বিশেষকরে ভারতের জন্য। এছাড়াও, আবদুল কাদের হচ্ছেন পাকিস্তানের পরমাণু প্রকল্পের পিতা এবং পাকিস্তানে পারমানবিক প্রকল্পের সূচনা ঘটে ১৯৯৮ সালে আর তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এই নওয়াজ শরিফ। আর এর অর্থ হচ্ছে আবদুল কাদের ও নওয়াজ শরীফের মধ্যে সম্পর্কের একটা সমন্বয় ঘটবে এবং আগামীতে পারমানবিক শক্তিকে আরো মজবুত করার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।"

সম্পর্কের পুনঃগঠনের ক্ষেত্রে যে বাঁধাও কম নয় সেই কথা ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশেজ্ঞদের মধ্যে বিরাজ করছে। ভারতে অনেকেই দৃড়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, পাকিস্তানে সাধারণত জনগনের ভোটে নির্বাচিত সরকার কোন সিদ্ধান্ত নেয় না বরং তা নিয়ে থাকে প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। আর বিশেষজ্ঞদের মতে আইএসআই’র প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন উগ্রবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন বিশেষত তালেবানদের ব্যবহার করে ভারতের বিপক্ষ হয়ে কাজ করা।

বরিস ভালখোনস্কী বলছেন, "দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরাশক্তি দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখা খুবই প্রয়োজন। শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং যুদ্ধপরবর্তি আফগানিস্তান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো সৈন্য প্রত্যাহারের পর যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় তাহলে তা ভারত, পাকিস্তান, ইরানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে কি পরিনতি নিয়ে আসবে তা ধারণার বাইরে।"

আজকের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কেউ যেন কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়ায়, যেমনটি ছিলো ৯০ এর দশকে, সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পর। আর তখন অস্থিতিশীল পরিবেশ থাকার মূল কারণ ছিলো পার্শ্ববর্তী প্রভাবশালী দেশগুলো আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতো।

বর্তমানে এ অঞ্চলের দেশগুলোর শুধু নিজেদের ছোট সমস্যা সমাধান করার চিন্তা নিয়ে থাকলেই হবে না। আর তা শুধু পরিস্থিতির সমাপ্তি টানতে পারবে। প্রযোজন যৌথ প্রচেষ্টা যাতে করে আফগানিস্তান যেন কোন উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আস্তানায় পরিনত না হয়। আর তা শুধুমাত্র পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী বা পাক-ভারত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে না বরং ওই অঞ্চলের ও বিশ্ব পরাশক্তি দেশগুলো সমান ভূমিকা পালন করতে পারে।

রুশ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন যে, ভারত ও পাকিস্তানের বহুমুখী সম্পর্ক এ পরিস্থিতিতে অমিমাংশিত সমস্যাগুলোর সমাধানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে।