বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস এবারে সরাসরি চিনে যাবে. মায়ানমারের পশ্চিমের সমুদ্র উপকূল থেকে চিনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে এই দেশের সীমান্ত পর্যন্ত গ্যাস পাইপ লাইন পাতা হয়ে গিয়েছে. দুই তিন মাস পরে খনিজ তেল বহনের পাইপ লাইনও পাতা হয়ে যাবে, এই গ্যাসের পাইপ লাইনের পাশ দিয়েই. চিন, ভারত মহাসাগরে, মায়ানমার হয়ে জ্বালানী সংক্রান্ত এক পথ এমন সময়ে ফুঁড়ে বের করতে পেরেছে, যখন সমান্তরাল ভাবে স্থানীয় জনগনের পক্ষ থেকে পাইপ লাইন পাতার জায়গায় বিক্ষোভ প্রদর্শন কর্মসূচী জারি রয়েছে আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় সঙ্ঘ থেকে এই দেশে চিনের প্রভাব কমানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে.

৮০০ কিলোমিটার লম্বা এই গ্যাস পাইপ লাইন আজ চার বছর ধরে তৈরী করা হয়েছে. চিন এটা তিরিশ বছর ধরে ব্যবহার করবে ও শর্ত সাপেক্ষে আরও দীর্ঘ হতেই পারে এই চুক্তি. বঙ্গোপসাগরের উপকূলে গ্যাস উত্তোলন করা হবে. খনিজ তেল ট্যাঙ্কার ভর্তি হয়ে আসবে নিকট প্রাচ্য থেকে.তা নামানোর জন্য চিন এখানে এক গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরী করা শেষ করতে চলেছে.

কয়েকদিন আগে মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি উ থেইন সেইন চিনের জাতীয় খনিজ তেল ও গ্যাস কর্পোরেশনের জেনারেল ডিরেক্টর লিয়াও ইউন্যুয়ানের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারের সময়ে এক খনিজ তেল ও পরিশোধনের কারখানা তৈরী করার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন.তাঁর এই ঘোষণা করা হয়েছিল হোয়াইট হাউসে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার সঙ্গে আলোচনা ও নেইপিডো শহরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সিঞ্জো আবের সঙ্গে বৈঠকের ঠিক পরেই. ওয়াশিংটন ও টোকিও মায়ানমারের প্রশাসনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে আর চিনের মতই সেখানে চাইছে একটা বৈপ্লবিক ভাবে নিজেদের স্বার্থ সাধন করতে, এই রকম মনে করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর সুদুর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের জাপান গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভালেরি কিস্তানভ বলেছেন:

“মায়ানমার এখন ভ-রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে, যা করছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার প্রধান ক্রীড়নকরা, চিন, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র. প্রত্যেক দেশেরই এখানে নিজেদের স্বার্থ রয়েছে. ওয়াশিংটন আর জাপান মায়ানমারে নিষেধাজ্ঞা তুলেছে যাতে সেখান থেকে চিনের এই এলাকায় ক্রমবর্ধমান প্রভাবকেই কমানো যায়. চিনও মায়ানমারের প্রশাসন নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিমের সঙ্গে কোন রকমের সংস্পর্শে না থাকার সুযোগে সক্রিয়ভাবে সেখানে ঢুকে পড়েছে, তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে, পরিকাঠামো তৈরী করেছে. এখন মায়ানমার পূর্ব এশিয়াতে চিনের এক ভরসা. খনিজ তেল ও গ্যাস পাইপ লাইন তাদের সরাসরি কার্বন যৌগ পেতে দেবে, সেই মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যাওয়ার দরকার পড়বে না, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করছে”.

এই দুটি প্রকল্পই চিনের জন্য স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ. পাইপ লাইন বসানো ও তা ব্যবহার করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পক্ষে কোন রকমের বিরোধের সময়ে চিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তেল ও গ্যাসের প্রবাহে কোন রকমের অন্তরায় তৈরী করতে দেবে না, যা নিকটপ্রাচ্য থেকে পাওয়া যেতে পারে. এটাও সত্যি যে, খনিজ তেল ও গ্যাস পাইপ লাইন বসানোর সময়ে স্থানীয় জনতা বিক্ষোভ দেখিয়েছে. সেখানের চাষী ও যৌথ খামারের মালিকরা তাদের জমির জন্য ন্যায্য দাম চেয়েছে, যা তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয়েছে ও তাদের যেখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, এই নির্মাণের কারণে. আর তারা এই সব জমিতে বহু পুরুষ ধরেই কাজ করে এসেছে. বর্মার লোকদের একই সঙ্গে ক্ষুব্ধ করেছে যে, তাদের দেশ হয়ে তেল ও গ্যাস যাবে চিনে, আর তারা আগের মতই কাঠের আগুনে রান্না করতে বাধ্য হবে.

এই প্রতিবাদ চিনের কোম্পানী গুলিকে পশ্চিমের কর্পোরেশন উপযুক্ত কৌশল ব্যবহারে বাধ্য করেছে, আর তাই তারা এখানে দাতব্য করতে শুরু করেছে. অংশতঃ, চিনের জাতীয় খনিজ তেল ও গ্যাস কোম্পানী মায়ানমারে স্কুল ও হাসপাতাল খোলার জন্য ২ কোটি ডলার দিয়েছে.

মায়ানমারে চিনের রাজনৈতিক পশ্চাদপট মজবুত করার জন্যও কাজ করা হয়েছে. দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ে চিনের অভিযান সেনা বাহিনীর অংশগ্রহণ নিয়ে মায়ানমারের চিনা জনগনের প্রস্তাব অনুযায়ী এক মেমোরিয়াল বানানো হয়েছে. তারা সেখানে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল. বহু বছর ধরে এই ইতিহাসের পাতাটি নিষিদ্ধ হয়ে ছিল, কারণ জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল গোমিন্দানের সেনাবাহিনী, কমিউনিস্ট বাহিনী নয়. বর্মাতে চিনা বাহিনীর বিখ্যাত বিজয় ও আর তাদের এশিয়াতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে চিন দেশের অবদান একটা ভূ-রাজনৈতিক সংজ্ঞা বহন করে, এই রকম মনে করে সামাজিক-রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ বলেছেন:

“যদি চুপ করে থাকা হয়, কে বা কারা বর্মার এলাকায় অপারেশনে কাজ করেছিল, আর কিভাবে এই সব শেষ হয়েছিল, তবে তার থেকে লাভ হবে কমই. আর যদি সত্য উদঘাটন করা হয়, তবে এটা হবে সহযোগিতার এক সফল উদাহরণ. এর পরে সাহসী হয়ে বলা যেতেই পারে: আমরা যুদ্ধের সময়ে সহযোগিতা করেছি যুদ্ধের সময়েও, তাই আজ আরও যুক্তিযুক্ত হবে তা বৃদ্ধি করার, কারণ আমরা মিত্র সুলভ দেশ”.

বর্মাতে সামরিক ইতিহাসকে ফিরে দেখা – চিনের তরফ থেকে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক পদক্ষেপ. এটা যেমন ওয়াশিংটন, তেমনই টোকিও কে সতর্ক করে দেওয়া – চিনের সামরিক বাহিনী বর্মাতে জাপানের সামরিক পন্থীদের এই কারণে ধ্বংস করে নি যে, আজ মায়ানমারকে এত সহজে চিন থেকে আলাদা করতে দেবে.