কয়েকদিন হল ভারতের প্রশাসন ২০১২-২০১৩ অর্থনৈতিক বছরের অর্থনৈতিক উন্নয়নের খতিয়ান প্রকাশ করেছে. অর্থনৈতিক বিকাশের পরিসংখ্যান বিগত দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম হয়েছে – শতকরা পাঁচ ভাগ. প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ এই ঘটনাকে বলেছেন সাময়িক ও আশ্বাস দিয়েছেন যে, খুব শীঘ্রই অর্থনৈতিক উন্নতির দ্রুত বৃদ্ধির হার ফিরে আসবে. কিন্তু এই সোমবারেই “ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা মেরিল লিঞ্চ” চলতি বছরের জন্য পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে, আর তাও ভারতের জন্য খুবই কম হয়েছে – শতকরা ৫, ৮ ভাগ. সুতরাং এমনকি যদি এই ঘটনা সাময়িক হয়, তাহলেও সেটা হয়েছে মন্ত্রীসভার জন্য সবচেয়ে খারাপ এক সময়ে, যখন সারা দেশ নির্বাচনের জন্য তৈরী হচ্ছে, আর ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা রয়েছে খুবই নীচু স্তরে.

উন্নত দেশ গুলির জন্য শতকরা পাঁচ ভাগ গড় বার্ষিক উত্পাদনে বৃদ্ধি খুবই ভাল সূচক. কিন্তু ভারতের জন্য – দেশের জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ও মূল্যবৃদ্ধির হিসাবে মাত্রা ধরা হয়ে থাকে শতকরা ছয় শতাংশ. আর যদি তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চিনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিযোগিতায় সুবিধা পাওয়ার জন্য বিকাশের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়, তবে উন্নয়ন হওয়া দরকার শতকরা ৮-৯ ভাগ. এই স্তরেই গত দশকে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার দাঁড়িয়েছিল. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারতের গড় বার্ষিক উত্পাদনের হার কম হওয়া আরও বেশী করেই আচমকা হয়েছে কারণ বিশ্বের অন্যান্য নেতৃস্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে তুলনায় ভারত যথেষ্ট সহজেই ২০০৮- ২০০৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পরিণাম সহ্য করতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু বোধহয়, অর্থনীতিতে অনেক আভ্যন্তরীণ সমস্যা ও বিরোধ জমা হয়েছিল, যা এখন প্রভাব ফেলেছে”.

ভারত – এক প্যারাডক্সের দেশ, যা সবচেয়ে উজ্জ্বল ভাবে এই দেশের অর্থনীতিতেই প্রতিফলিত হয়েছে. একদিকে, দেশ সবচেয়ে বৃহত্ মধ্যবিত্ত শ্রেনীর দেশ, যা দেশের আভ্যন্তরীণ চাহিদাকে উদ্বুদ্ধ করতে বাধ্য, আর তার মানে হল উত্পাদনের বৃদ্ধি. আবার অন্য দিকে, বহু কোটি মানুষ এই দেশে দারিদ্র সীমার নীচে বেঁচে রয়েছেন, আর প্রায় একের তৃতীয়াংশ জনগন দিনে এক ডলারের চেয়ে কম খরচ করে বেঁচে রয়েছেন. আর এটাই স্বাভাবিক ভাবে, বাড়তি বাধা হয়ে সমস্ত সামাজিক- অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপরে চেপে বসে রয়েছে.

স্পষ্ট অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে আবার ভারতের ঐতিহ্য অনুযায়ী সমস্যা গুলিও – সেই ধরনের যেমন, দুর্নীতির বিপুল প্রসার ও অনন্ত ভাবে বহমান দুর্নীতি নিয়ে স্ক্যান্ডাল, তার মধ্যে আবার দেশের মন্ত্রীসভার সদস্যদের নিয়েই যা হচ্ছে. কিন্তু একেবারেই সদ্য বিগত সময়ে একেবারে সামনের সারিতে এসে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক কারণ, যা অর্থনীতির গতি রোধ করছে.

ভারতের আরও একটি প্যারাডক্স হল যে, মন্ত্রীসভার শীর্ষে রয়েছেন মনমোহন সিংহ – সেই মানুষ, যাঁকে মনে করা হয় ভারতের নব্বইয়ের দশকে অর্থনৈতিক চমত্কারিত্বের জনক বলে, যখন তিনি পি. ভি. নরসিংহ রাও মন্ত্রীসভার অর্থমন্ত্রী ছিলেন. কিন্তু আজ অনেক পর্যবেক্ষকই ভারতে তাঁকেই অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য দায়ী করেছেন, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে ব্যাপার হল, বোধহয়, শুধু তাঁর বয়সের জন্যই নয়, যা বর্তমানে আশি হয়েছে, বরং ২০১৪ সালের সর্বজনীন নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন আর এমনকি যদি কংগ্রেস দল হঠাত্ করেই পার্লামেন্টে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেয়ে আবার ক্ষমতায় উঠে আসতেও পারে!, তাহলেও আগামীতে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভবিষ্যতে দেখা হচ্ছে না, আর তাই তাঁর পদত্যাগের অনেক আগে থেকেই তিনি রাজনীতিতে যাকে বলা হয়ে থাকে “ল্যাংড়া হাঁস”, তিনি সেই রকমেরই শুধু নিজের প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ কাটাচ্ছেন. আর এটার মানে হল যে, তাঁর কাছ থেকে কোন রকমের দ্রুত সংশোধনের পদক্ষেপ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমানের মন্ত্রীসভা আশা করতে পারছে না, আর তাই এই তুলনা মূলক ভাবে কম অর্থনৈতিক উন্নয়নে মন্দার বছর গুলি কম করে হলেও ২০১৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে চলেছে”.

এই পরিস্থিতিতে বাড়তি সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে বিরোধী পক্ষ, যারা এই সুযোগ ছাড়তে চায় নি. বিরোধী পক্ষের নেতৃস্থানীয় দল ভারতীয় জনতা পার্টি ঘোষণা করেছে যে সব কিছুর জন্যই দায়ী বাজে ম্যানেজমেন্ট, বাজে নিয়ন্ত্রণ ও বাজে প্রশাসন (যদিও ভলখোনস্কি এই তিনটিকে সমার্থক মনে করেন), তা যথেষ্ট সঠিক ভাবেই বর্তমানের পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করে.