পারমানবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবারে নিজেদের চিরাচরিত দিক পরিবর্তন করতে শুরু করেছে এশিয়ার দিকে সরে গিয়ে. এশিয়াতে সবচেয়ে বেশী গণহত্যার অস্ত্র স্টকহোমের আন্তর্জাতিক বিশ্ব সমস্যা গবেষণা ইনস্টিটিউটের রিপোর্ট অনুযায়ী আয়ত্ত্ব করেছে চিন. নিজেদের পক্ষ থেকে ভারত, পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক বিরোধে নিরত অবস্থায় আরও একটি বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে বাধ্য হয়েছে – চিনের হুমকি নিরাকরণ করাতে. দিল্লী এবারে নিজেদের ভরসা অর্পণ করেছে ব্যালিস্টিক রকেটের মতো পরিবাহকের উপরে, যাতে চিনের এলাকার গভীরে ঢুকে পড়া যায়. দুঃখের কথা হল সেই ১৯৮৫ সালে নয়াদিল্লী শহরে বিশ্বকে মৃত্যু বাহী অস্ত্রের হাত থেকে রক্ষার ইচ্ছার ফলশ্রুতি হিসাবে মিখাইল গরবাচেভ ও রাজীব গান্ধীর স্বাক্ষরিত অহিংস ও পারমানবিক অস্ত্র বিমুক্ত বিশ্ব নিয়ে ঘোষণা তাই আজও শুধু এক শুভেচ্ছা হয়েই রয়ে গিয়েছে, এই মন্তব্য করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“স্টকহোম শহরের এই আন্তর্জাতিক বিশ্ব সমস্যা গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত বাত্সরিক রিপোর্টে, যেখানে বিশ্বের পারমানবিক ক্লাবের দেশ গুলির পারমানবিক ক্ষমতা বিকাশ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাতে সব মিলিয়ে এক স্বস্তি পাওয়ার মতো কোন সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয় নি. দেখা যাচ্ছে যে, আধুনিক পারমানবিক অস্ত্র বিষয়ে আগ্রহ কম শুধু বিশ্বের দুই সর্বজনীন নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগী দেশের – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার. মনে করিয়ে দিই যে, মস্কো ও ওয়াশিংটন তৃতীয় স্ট্র্যাটেজিক আক্রমণাত্মক অস্ত্র সজ্জা সংক্রান্ত সমঝোতা করেছে ইতিহাসে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এই মারণাস্ত্র কমিয়ে ফেলা নিয়ে”.

এর মধ্যেও পারমানবিক অস্ত্র এশিয়াতে তাদের অনিয়ন্ত্রিত বিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী বড় ভূমিকা অর্জন করতে চলেছে. এশিয়ার নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র – চিন, ভারত ও পাকিস্তান, পারমানবিক ব্যাটন থেকে আগ্রহ ফেরাতে চাইছে না, বরং সেটাকেই করে তুলেছে আরও ভারী.

সামগ্রিক ভাবে পারমানবিক ক্লাবের পুরনো সদস্যদের অর্থাত্ রাষ্ট্রসঙ্ঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, ও চিন) সঙ্গে ভারত পাকিস্তান ও ইজরায়েলের সমস্ত পারমানবিক অস্ত্র যোগ করে স্টকহোমের ইনস্টিটিউট অঙ্গুলি নির্দেশ করেছে যে, গত এক বছরে সব মিলিয়ে পারমানবিক বোমা ও তা পৌঁছে দেওয়ার মত রকেটের সংখ্যা কিছুটা কমেছে: ২০১১ সালে ১৯ হাজার থেকে এই বছরের শুরুতে ১৭হাজার ২৬৫ অবধি. কিন্তু পারমানবিক নিরস্ত্রীকরণ বিষয়টিকে বর্তমানে বিশ্বের একটা অবধারিত প্রবণতা বলতে যাওয়া অনেক তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে. কারণ এই রকমের আশাব্যঞ্জক পরিসংখ্যান পাওয়াতে ইন্ধন দিয়েছে শুধু রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই, একই সময়ে অন্যান্য রাষ্ট্রগুলি এদের উদাহরণ অনুসরণ করার জন্য কোন রকমের গতি প্রদর্শন করে নি.

ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেন শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধই রেখেছে, যা যথাক্রমে ৩০০ ও ২২৫ টি. কিন্তু তাও তারা এই গুলিকে আরও আধুনিক করা নিয়ে কাজ করার বিষয়ে কোন রকমের অনীহা প্রকাশ করে নি. ইজরায়েল, তাদের ৮০০টি পরমাণু বোমা নিয়ে একই পথ ধরেছে. “পারমানবিক অস্ত্রের আধুনিকীকরণ নিয়ে দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা সাক্ষ্য দেয় যে, এই ধরনের অস্ত্র যে সব রাষ্ট্রের কাছে রয়েছে তারা আগের মতই এই অস্ত্রকে মনে করেছে ক্ষমতা ও শক্তির বিষয়ে এই অস্ত্র এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা পাওয়ার সংজ্ঞা বলে”, - রিপোর্ট পেশ করার আগে স্টকহোম সংস্থার বিশেষজ্ঞ শেন্নন কাইল এই ঘোষণা করেছে.

পারমানবিক অস্ত্র নিয়ে সবচেয়ে দ্রুত প্রতিযোগিতা বিকাশ হচ্ছে চিন- ভারত-পাকিস্তান এই ত্রিভুজে. ২০১২ সালে চিন নিজেদের পারমানবিক বোমার সংখ্যা ২৪০ থেকে বাড়িয়ে ২৫০ করেছে. ভারত করেছে ১০০ থেকে ১১০, আর পাকিস্তান ১১০ থেকে ১২০টি. গত বছরে সংখ্যার হিসাবে পাকিস্তান ভারতকে পার হয়ে গিয়েছে – নিজেদের প্রতিবেশী ও দক্ষিণ এশিয়াতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দেশকে.

কিন্তু ভারতের জন্য প্রধান বিপদ পাকিস্তান নয়, যাদের এই বোমা এনে ফেলার মতো যথেষ্ট রকমের পরিবাহক নেই, যাতে সমস্ত ভারতের এলাকাকে ঢেকে ফেলা যেতে পারে, বরং চিন, এই রকমই মনে করেছে স্টকহোমের বিশেষজ্ঞরা. তাদের মূল্যায়ণ অনুযায়ী বিগত সময়ে আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক রকেট নির্মাণের ক্ষেত্রে ভারতের সক্রিয়তা “নিজেদের লক্ষ্য হিসাবে খুব সম্ভবতঃ পাকিস্তানকে নয়, বরং চিনকে লক্ষ্য করেই করা হয়েছে”.

“ভারতের আজ দুটি বিপদ – পাকিস্তান ও চিন” – এই রকম কথা বলেছেন দিল্লীতে সদর দপ্তর খুলে বলা অবসার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামের গোষ্ঠীর সভাপতি নন্দন উন্নিকৃষ্ণন – “এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় স্ট্র্যাটেজি নির্মাতাদের তৈরী এক ঘটনা পরম্পরা অনুযায়ী একই সঙ্গে দুটি দিকে পারমানবিক শক্তি প্রয়োগ করে যুদ্ধের সম্ভাবনার কথাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে”.

ভারতের জন্য যে প্রধান বিপদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে চিন, তা প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল প্রাক্তন ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেসের লেখা ১৯৮৮ সালের এক চিঠিতে, যা পাঠানো হয়েছিল ক্লিন্টনের প্রশাসনের কাছে, ভারতে দ্বিতীয় পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা করার পরে.

তার দেড় দশক পরে এই প্রবণতা শেষ অবধি সম্পূর্ণ ভাবেই তৈরী হয়ে গিয়েছে.