তুরস্কে বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশ গ্রহণে প্রতিবাদ আন্দোলন দেশের প্রশাসনকে একেবারেই অতর্কিত ভাবে টলিয়ে দিয়েছে. তারা দেখা গেল যে, শুধু কয়েক হাজার মানুষের করা এই আন্দোলনের কারণ ও চরিত্র সম্বন্ধেই যে খালি তৈরী ছিলেন না তা নয়, এমনকি তাদের স্লোগানের অভিযোজন নিয়েও ছিলেন হতচকিত: তাক্সিম স্কোয়ারে গাছ কাটতে না দেওয়া ও আতাতুর্ক কেন্দ্র বাঁচানোর থেকে শুরু করে মন্ত্রীসভার ইস্তফা পর্যন্ত. তার মধ্যে আবার এই সব প্রতিবাদ বহু বছরের মধ্যে তুরস্কে এই প্রথম হয়েছে. রাজনীতিবিদ ও তুর্কী বিশারদ স্তানিস্লাভ তারাসভ বলেছেন:

"এটা ঠিকই যে, তুরস্কের ঝঞ্ঝা আরও খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করা হবে আর, প্রাথমিক ভাবে, তুরস্কের বিশেষজ্ঞরাই তা করবেন. এখন শুধু মাত্র কয়েকটি কারণের কথাই বলব, যা, আমার মতে, একেবারেই উপরে দেখতে পাওয়া গিয়েছে আর বাইরে থেকেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. সমস্যা অবশ্যই “গাছের জন্য যুদ্ধ” নয়, আর এমনকি দেশের পার্লামেন্টের তরফ থেকে সেই রকমের আইন নেওয়া নিয়েও নয় যা অ্যালকোহল বিক্রী ও ব্যবহার নিয়ে করা হয়েছে. সব কিছুই অনেক জটিল".

ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে যে, গণ প্রতিবাদ আন্দোলন অনেক দেশেই প্রায় হয়েছে কোন অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ে নয়, বরং অর্থনীতির উঠে দাঁড়ানোর সময়েই. তুরস্কে এই প্রথম নিজেদের অধুনাতম ইতিহাসে শুধুমাত্র গুরুতর অর্থনৈতিক সঙ্কটের সঙ্গেই পেরে ওঠা সম্ভব হয় নি, বরং নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতির হারে ইউরোপের বহু দেশকেই টেক্কা দেওয়া সম্ভব হয়েছে. এই অর্থনৈতিক কারণই উপায় করে দিয়েছে যে দেশের ক্ষমতাসীন দল আবার পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছে ও দেশের আধুনিকীকরণের পথ ধরেছে.

অন্য দিকে তুরস্কের সমাজের অনেক খানি অংশই প্রশাসনের নীতির সঙ্গে একমত নয়, যা আতাতুর্কের উত্তরাধিকারকে খতিয়ে দেখছে আর কামালের রাজনীতি অস্বীকার করেছে. আর, সম্ভবতঃ, এরদোগানের ঘোষণার সঙ্গেও একমত হওয়া যেতে পারে যে, তুরস্কের বর্তমানের অভ্যুত্থানে একটা আদর্শগত চরিত্র রয়েছে. কোন গোপনীয় কথা নয় যে, সরকারের পক্ষ থেকে করা তথাকথিত “মৃদু ঐস্লামিক হওয়া” তুরস্কের সমাজের একটা বড় অংশের কাছ থেকে কোন সমর্থন পাচ্ছে না. তাই দেশের সরকারের ইচ্ছা যে, আতাতুর্কের নামাঙ্কিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের জায়গায় মসজিদ তৈরী করা এমন ভাবে দেখা হয়েছে যেন, দেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের নির্মাতা মুস্তাফা কামালের ঐতিহ্যের উপরেই একটা আঘাত হানার প্রয়াস.

দেশের জনগনের অনেক প্রশ্নের উদয় হয়েছে দেশের পররাষ্ট্র নীতি নিয়েও. এখানে প্রাথমিক ভাবে কথা হচ্ছে, সিরিয়ার প্রতি রাজনীতি নিয়ে, যাদের প্রশাসনকে দেশের শতকরা ৬০ ভাগ জনসাধারন সমর্থন করেছে. এই দুটি কারণের উপস্থিতি একটা নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছে অসন্তুষ্টির ভর সংক্রান্ত সঙ্কট সৃষ্টি করেছে সেই তুরস্কে. আর শুধু তৃতীয় স্থানে রয়েছে সামাজিক সমস্যা গুলি, যা আপাততঃ তীক্ষ্ণ হওয়ার মতো সম্ভাবনা রেখেই দিয়েছে.

অবশেষে তুরস্কের পুলিশের তরফ থেকে যারা প্রতিবাদ করেছে, তাদের উপরে এত নির্মম আচরণকে কি সঠিক মনে করা যেতে পারে? তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আখমেত দাভুতোগলু নিজের টুইটার সাইটের ব্লগে যেমন লিখছেন যে, তাক্সিম স্কোয়ারের ঘটনা “আমাদের দেশকে বিশ্বের চোখে খুবই অমযার্দাকর রূপে দেখিয়েছে”. নিজের পক্ষ থেকে ইউরোপের কূটনৈতিক প্রধান ক্যাথরিন অ্যাস্টন ইস্তাম্বুলে ও আরও কয়েকটি তুরস্কের শহরে ঘটা হিংসার ঘটনায় “গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আর তারই সঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেছেন শক্তির অনানুপাতিক প্রয়োগের জন্য, যা তুরস্কের কিছু পুলিশ কর্মী করেছে”. সুতরাং, তুরস্ক নিজেদের গণতান্ত্রিক ইমেজ হারাতে বসেছে, যা তৈরী করার জন্য প্রশাসনের কম শক্তি ও অর্থ ব্যয় হয় নি.

এখন এই সঙ্কট থেকে বের হওয়ার জন্য ইউরোপীয় সঙ্ঘ আঙ্কারাকে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করতে বলেছে. কিন্তু কার সাথে আর কি বিষয়ে আলোচনা করা হবে, যদি তাক্সিম স্কোয়ার পুনর্গঠনের সমস্যা ইস্তাম্বুলে এখন দ্বিতীয় সারিতে চলে গিয়ে থাকে, আর যারা বর্তমানে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে, তারা দাবী করছে এরদোগানের পদত্যাগ.

একই সময়ে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি আবদুল্লা গ্যুল ঘোষণা করেছেন যে, যারা মিছিল করছে, তাদের প্রতি “দায়িত্বশীল ভাবেই আচরণ করতে হবে, কারণ এই মিছিল বর্তমানে এত বিশাল আকার নিয়েছে, যা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে”. আর তিনি পুলিশকে আহ্বান করেছেন “প্রয়োজনীয় শক্তির বেশী প্রয়োগ না করতে”. বাস্তবে, এটা এরদোগানকে “প্রশাসনের চরম পন্থী” বলেই দাঁড় করিয়েছে, যদিও তিনিও পুলিশের কাজকর্মকে “চূড়ান্ত” বলেই মেনে নিয়েছেন. এবারে এরদোগানের পক্ষে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া সম্ভব হবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়, এমনকি যদি এর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বা ইস্তাম্বুলের মেয়রকে বরখাস্ত করানো হয়, তাহলেও? মুখ্য হল যে, “মিল্লেত” সংবাদ পত্র যেমন লিখেছে, এরদোগান মনে হচ্ছে, “২০১৪ সালে দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা খোয়াতে চলেছেন”, আর দেশের ক্ষমতাসীন সরকার আঞ্চলিক নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা, তার মধ্যে সেই রকমের এক মহানগরীতে, যেমন ইস্তাম্বুলে.

সে যাই হোক না কেন, এখন থেকে ইস্তাম্বুলের তাক্সিম স্কোয়ারের সুযোগ রইল রাজনৈতিক ইতিহাসের একই সারিতে ঢুকে পড়ার, যেখানে রয়েছে চিনের বেজিং শহরের তিয়ান-আন-মীন বা মিশরের কায়রোর তহরির স্কোয়ার.