ফুটবলার ও ফ্যানদের বিশ্বের ফুটবলের মাঠে যে কোন রকমের বর্ণ বৈষম্য সংক্রান্ত কাজ কারবারকে এবার থেকে বড় অঙ্কের জরিমানা, দর্শক বিহীণ মাঠে খেলা পরিচালনা অথবা বাতিল করে দেওয়ার মতো শাস্তি দেওয়া হতে চলেছে. এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ফিফা সংস্থার ৬৩ তম অধিবেশনে, যা ৩১শে মে মরিশাস দ্বীপে শেষ হয়েছে. কংগ্রেস ফিফা বর্ণ বৈষম্য দূর করা নিয়ে পরিকল্পনাকে বাস্তবে ঐক্যবদ্ধ ভাবেই সমর্থন করেছে: প্রতিনিধিদের মধ্যে শতকরা ৯৯ ভাগ ভোট দিয়েছেন সমর্থন করে.

কিছু ফুটবল সংগঠনের প্রতিনিধিরা শুধু জরিমানাতেই শাস্তির ব্যবস্থা পুরো করার চেষ্টা বাতিল করেছিলেন, যখন তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, কংগ্রেস এই প্রশ্নে খুবই শক্ত হয়েছে. প্রসঙ্গতঃ এবারে কোন রকমের আবেদনের জায়গা না রেখেই ফিফা সংস্থার সভাপতি ইওজেফ ব্লাট্টার জোর দিয়েছিলেন খুবই কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার স্বপক্ষে নিজে থেকেই. সুইজারল্যান্ডের নাগরিকের এবারে প্রয়োজন পড়েছিল নিজের এক অসাবধানী মন্তব্য থেকে তৈরী হওয়া স্ক্যান্ডালের পরে নিজের মর্যাদা ফেরানোর জন্য, যা তিনি ২০১১ সালে করে ফেলেছিলেন. তখন তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, ফুটবলে কোনও বর্ণ বৈষম্য নেই, আর যদি থাকে, তাহলে এটা স্রেফ নিত্য নিয়মিত কর্কশ কথাবার্তা, আর ব্যাপার গুলি খেলোয়াড়রা নিজেরাই স্রেফ করমর্দনের মাধ্যমে মিটমাট করে নিতে পারে. এই ধরনের স্পষ্ট সমস্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টার জন্য, অনেকেই তখন ব্লাট্টার পদত্যাগ করুন বলে দাবী তুলেছিলেন. প্রসঙ্গতঃ, এই দাবী যাঁরা তুলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও ছিলেন. স্ক্যান্ডাল খুবই কষ্ট করে মেটানো সম্ভব হয়েছিল.

তাই মরিশাস দ্বীপে ব্লাট্টার বহু সিদ্ধান্তের মধ্যে, যার মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই ছিল, আলাদা করে দিয়েছেন এই বর্ণ বৈষম্য সংক্রান্ত আইনকেই. আমরা বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কিন্তু বোধহয়, তাদের মধ্যে মুখ্য হল – বর্ণ সংক্রান্ত সহনশীলতার অভাব ও বৈষম্য প্রদর্শনের সঙ্গে লড়াই নিয়ে সিদ্ধান্ত, ৩১শে মে অধিবেশনের শেষে নিজের সাংবাদিক সম্মেলনে ইওজেফ ব্লাট্টার তাই বলেছেন:

“আমাদের কংগ্রেস যে সমস্ত সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছে, তাতে অনেক ধারা রয়েছে, কিন্তু আমি বর্ণ বৈষম্য নিয়ে সিদ্ধান্তকে আলাদা করে উল্লেখ করতে চাইব. বর্ণ বিরোধীতার ও বৈষম্যের মোকাবিলার সিদ্ধান্ত একেবারেই অন্য ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা বহন করে”.

এখানে যে সমস্ত বর্ণ বৈষম্য ও সহনশীলতার অভাব আজকের দিনে ফুটবলের মাঠে দেখা যায়, তার সামান্য কিছু উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে. ২০০৫ সালে স্ক্যান্ডাল করেছিল রোমের লাজিও ফুটল ক্লাব, তাদের এক খেলোয়াড় লিভোর্নো দলের সঙ্গে খেলা চলার সময়ে নিজেদের ফ্যানদের ফ্যাসিস্ট স্যালুট করে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল. ২০১১ সালে মিন্স্ক ডায়নামো দলের ফ্যানরা ভিতেবস্ক শহরের দলের সঙ্গে খেলার সময়ে একটি নাত্সী ব্যানার টানিয়েছিল, যাতে তারা হিটলারের ডেপুটি রুডল্ফ হেসের স্মৃতি তর্পণ করেছিল.

২০১২ সালের নভেম্বর মাসে ইংল্যান্ডের ক্লাব ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড দলের এক সীজন কার্ড হোল্ডার সারা জীবনের জন্য খেলার মাঠে না আসার শাস্তি পেয়েছে. টোটেনহ্যাম ক্লাবের সঙ্গে এক খেলার সময়ে ওয়েস্ট হ্যাম ক্লাবের এই দর্শক, নিজে ও আরও কিছু সঙ্গী সাথী নিয়ে মাঠে স্লোগান দিয়ে গান করেছিল হিটলার তোদের জন্য আসছে আর তারই সঙ্গে গ্যাস চেম্বারের ভিতরে গ্যাসের আওয়াজ করেছিল হিসহিস শব্দ করে, কারণ তারা জানতো টোটেনহ্যাম ক্লাব লন্ডনের ইহুদী সমাজের সঙ্গে খুবই মজবুত বন্ধনে আবদ্ধ. আর সেই সব মন্তব্য ও অপমান, যা দিয়ে খেলোয়াড় ও ফ্যানরা যে কোন রকমের সঠিক নয় এমন গাত্র বর্ণের খেলোয়াড়দের অপমান করা হয়ে থাকে, তা নিয়ে লিখতে গেলে জায়গা কুলোবে না.

মাঠে বর্ণ বৈষম্য দেখানো নিয়ে অনেক আগেই কিছু করা প্রয়োজন ছিল, এই কথা বলেছেন ব্রিটেনের কিংবদন্তি ফুটবল খেলোয়াড় ডেভিড ব্যাকহ্যাম. তিনি বলেছেন:

“ফুটবলে জীবনের মতই, একেবারেই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায় বর্ণ বৈষম্য ছিল আর আছে. আমি বহু ইংরেজ দলে খেলেছি আর জানি যে, ব্রিটেনের ফুটবল সংগঠন অনেক কিছুই করে থাকে, যাতে এই বর্ণ বৈষম্য মাঠে না হয় ও তাকে মাঠের বাইরেই প্রতিহত করা যায়. বিগত ১০ -১৫ বছরে আমরা অবশ্যই অনেক কিছু করতে পেরেছি, কিন্তু আরও বেশী করা দরকার – বর্ণ বৈষম্য, এটা এমন এক জিনিষ, যা আপনি স্রেফ ঝাঁট দিয়ে কার্পেটের তলায় লুকিয়ে রাখতে পারবেন না”.

এখন খেলোয়াড়, প্রশিক্ষক অথবা ফ্যানদের যে কোন বর্ণ বৈষম্যের আচরণের জন্য ক্লাব গুলিকে জরিমানা, খালি মাঠে খেলায় বাধ্য করা হবে, আর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে- কম করে হলেও পাঁচটি খেলা থেকে তাদের বাতিল করা হবে, পয়েন্ট কেড়ে নেওয়া হবে, এমনকি ডিভিশন থেকে নামিয়েও দেওয়া হতে পারে.