আপনারা শুনছেন বা পড়ছেন আমাদের নিয়মিত মাসিক অনুষ্ঠান – রাশিয়া-ভারতীয় উপমহাদেশঃ ‘স্মরণীয় ঘটনাবলী, ব্যক্তিত্ববৃন্দ, তারিখগুলি’. অতীত জানা না থাকলে বর্তমানকে অনুধাবন করা ও ভবিষ্যত্ সম্পর্কে ভাবনাচিন্তা করা কঠিন. আর তাই প্রস্তাব দিচ্ছি অতীতের ক্যালেন্ডারে জুন মাসের পাতাটি খোলার. আমরা স্মরণ করবো সেই সব তারিখ ও ব্যক্তিত্বদের, যেগুলি ও যারা রাশিয়া-ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের গতিপথে লক্ষণীয় পদচ্ছাপ রেখে গেছে ও গেছেন.

    সুমহান রুশী কবি, লেখক ও নাট্যকার আলেক্সান্দর পুশকিন লিখেছিলেন – “বিগতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই বর্বরতা থেকে শিক্ষাদীক্ষার ফারাক গড়ে দেয়”. ‘রুশী কাব্যের সূর্য’ নামে আখ্যাত পুশকিনের রচনাবলী পৃথিবীর প্রায় ১৫০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যার মধ্যে বহু ভারতীয় ভাষাও রয়েছে. হিন্দী ভাষায় পুশকিনের অনুবাদ করেছিলেন স্বনামধন্য ভারতীয় কবি হরিবংশ ভাই বচ্চন ও মদনলাল মধু এবং উর্দু ভাষায় জোয়ে আনসারি. আলেক্সান্দর পুশকিনের রচনাবলী এখনও যুগোপযুক্ত, যদিও তাঁর জন্ম হয়েছিল ২১৪ বছর আগে – ১৭৯৯ সালের ৬ই জুন. কবিবরের তীব্র আকাঙ্খা ছিল বিদেশ ভ্রমণের, কিন্তু জারের শাসনযন্ত্র তাঁকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল. তবে এখন পৃথিবীর বহু দেশে তাঁর নতুন নতুন স্মৃতিমূর্তি স্থাপন করা হচ্ছে. নয়াদিল্লিতে সাহিত্য এ্যাকাডেমির কাছেই বছর কুড়ি আগে পুশকিনের ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে.

     “আমি মনে করি, যে আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি আরও সম্পদশালী হয়ে, কারণ আমার মানসপটে ভাস্বর হয়ে থাকবে উষ্ণ সৌহার্দ্য ও আপ্যায়নের মধুর স্মৃতি, যা দিয়ে আমাকে এখানে বরণ করা হয়েছে. একই সাথে আমি এখান থেকে ফিরে যাচ্ছি আরও দরিদ্র হয়ে, কারণ এখানে আমি রেখে গেলাম আমার হৃদয়” – এই কথাকটি বলেছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু আমাদের দেশে তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের অন্তিম মুহুর্তে. ১৯৫৫ সালের ৭ই থেকে ২৩শে জুন নেহরুজি সোভিয়েত দেশ সফর করেছিলেন. এখনো পুরনো জমানার মস্কোবাসীরা, যাদের মধ্যে আমাদের কয়েকজন সহকর্মীও আছেন, তারা স্মৃতিচারণা করেন, কিভাবে তারা উচ্চস্তরের ভারতীয় অতিথিকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে তাঁর আগমণের রাস্তার দুই পাশে ভীড় করেছিলেন. সেবারে জওহরলাল নেহরু মস্কো, সেন্ট-পিটার্সবার্গ (তদানীন্তন লেনিনগ্রাদ),ভলগোগ্রাদ ও সোভিয়েত মধ্য এশিয়ার কয়েকটি শহর পরিদর্শন করেছিলেন.

    অতীতের আরও কিছু উজ্জ্বল স্মৃতি জড়িত সুবিদিত নাট্যকার, চিত্রনাট্য রচয়িতা, পরিচালক হাজি আহমদ আব্বাসের নামের সাথে. তাঁর চিত্রনাট্য অবলম্বনে তোলা ‘আওয়ারা’ ও ‘শ্রী ৪২০’ ছিল আমাদের দেশে প্রদর্শিত প্রথম ভারতীয় ছায়াছবি. ফিল্ম দুটি এখানে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেছিল. গোটা দেশ ভারতের, রাজ কাপুরের ও নার্গিসের আকন্ঠ প্রেমে পড়েছিল. বছর পঞ্চাশেক আগে আব্বাস রুশী চিত্র পরিচালক ভাসিলি প্রোনিনের সাথে যৌথ পরিচালনায় তেমনই আরও একটি সিনেমা করেছিলেন – বণিক আফানাসি নিকিতিনের ভারত পরিব্রজ্যার গল্প নিয়ে – ‘পরদেশি’. তাছাড়াও হাজি আহমদ আব্বাসের চিত্রনাট্য অবলম্বনে আরও একটা জনপ্রিয় যৌথ ইন্দো-রুশী ফিল্ম বানানো হয়েছিল – ‘মেরা নাম জোকার হ্যায়’. আর হাজি আহমদ আব্বাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১৪ সালের ৭ই জুন.

    ১৯৪১ সালের ২২শে জুন হিটলারী জার্মানী আমাদের দেশের উপর আক্রমণ করে. তার ঠিক একমাস পরেই, ২১শে জুন ভারতবাসী সংগ্রামরত সোভিয়েত জনগণের প্রতি সংহতিজ্ঞাপন দিবস পালন করেছিল. যুদ্ধের গোটা সময়কালে ভারতীয়রা তাদের সব সভা সমাবেশে আমাদের জনগণকে সমর্থন জানিয়েছে. তারা আমাদের দেশের জনগণের সাহায্যার্থে তহবিল খুলে অর্থ সংগ্রহ করে, সেই অর্থ ভায়া লন্ডন মস্কোয় পাঠিয়েছে. সেই সময় ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের পাশাপাশি রাশিয়ার প্রতি সংহতির আন্দোলনও জোরদার হয়ে উঠেছিল.

    বাংলার সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনাবলীর সঙ্গে রুশীদের পরিচয় ঘটেছিল লেখকের জীবত্কালেই. রাশিয়ায় ভারততত্ত্ব চর্চার অন্যতম পথিকৃত সেন্ট-পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইভান মিনায়েভ দু’বার ভারত সফর করেছিলেন. সেই সময়ে তিনি সেখান থেকে নিয়ে আসেন বঙ্কিমচন্দ্রের নিজহস্তে স্বাক্ষর করা রচনাবলী. বর্তমানে সেন্ট-পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্য গ্রন্থাগার তহবিলে সংরক্ষিত এই বইগুলি সাক্ষ্য দেয়, যে ইভান মিনায়েভ ব্যক্তিগতভাবে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের সাথে পরিচিত ছিলেন. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৩৮ সালের ২৬শে জুন.