বুধবার সকালে আমেরিকার ড্রোন বিমান আঘাতে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে রাজধানী মিরানশাহ উপকণ্ঠে নিহত হয়েছে ওয়ালিউর রেহমান – এ সেই ব্যক্তি, যকে মনে করা হত পাকিস্তানের তেহরিক-এ-তালিবান দলের দ্বিতীয় মুখ্য নেতা বলে. মনে হতে পারে যে, আমেরিকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরও একটি প্রতিধ্বনি তোলা জয় হয়েছে. কিন্তু অনেক ভিত্তি রয়ে গেল ভাবার যে, এই বিজয় শুধু হিংসার নতুন ঢেউ ডেকে আনবে – প্রাথমিক ভাবে পাকিস্তানের নতুন নির্বাচিত প্রশাসনের বিরুদ্ধেই.

এই ওয়ালিউর রেহমান কে ও তার মৃত্যু পাকিস্তানে ও প্রতিবেশী আফগানিস্তানে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে কি প্রভাব ফেলতে চলেছে?

পাকিস্তানের তালিবান আন্দোলনের শক্তি বিন্যাস ও আভ্যন্তরীণ বিরোধীতা নিয়ে কথা বলা কঠিন – এটা একটা গোপন সংগঠন, যারা বেআইনি ভাবে কাজ করছে ও নিজেদের কাছে কোন বাইরের লোককে আসতেই দেয় না. কিন্তু সংবাদ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খুব সামান্য সব তথ্য থেকে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গুলি করা যেতে পারে. তেহরিক-এ-তালিবান দলের দ্বিতীয় মুখ্য ব্যক্তি ওয়ালিউর রেহমান অন্যান্য নেতাদের তুলনায় শান্ত ছিলেন. তার শান্ত হওয়া বোঝা গিয়েছে সেই থেকে যে, সে মনে করত পাকিস্তানের তালিবদের প্রধান কাজ হল প্রতিবেশী আফগানিস্তানে বিদেশী অনুপ্রবেশ বন্ধ করা, আর একই সময়ে অন্যান্য পাকিস্তানী তালিবান নেতারা মনে করেছে, বিশেষ করে অংশতঃ এই আন্দোলনের প্রধান হাকিমুল্লা মাসুদ মনে করেছে যে, দেশের সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করাই হল মূল কাজ.

তাই একেবারেই হঠাত্ নয় যে, ওয়ালিউর রেহমান আমেরিকার পাইলট বিহীণ বিমানের লক্ষ্য হয়েছে, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে পরিপ্রেক্ষিত বিচার করার দরকার রয়েছে, যাতে এই ঘটনা ঘটতে পেরেছে. ১১ই মে পাকিস্তানে সর্বজনীন নির্বাচনে খুবই আত্মবিশ্বাসী ভাবে জয়লাভ করেছে পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বে থাকা মুসলিম লীগ, যিনি দেশের ভবিষ্যত নেতা ও একাধিকবার বলেছেন পাকিস্তানের এলাকায় ড্রোন বিমানের হামলা করা বন্ধ করতে এবং তেহরিক-এ-তালিবান, পাকিস্তান দলের সঙ্গে যে সমস্ত বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করে ভবিষ্যতে এই দলকেও দেশের স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতে অন্তর্ভুক্ত করতে”.

গত সপ্তাহে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ঘোষণা করেছেন যে, ড্রোন ব্যবহার করে যুদ্ধ – এটা ন্যায় যুদ্ধ, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আত্মরক্ষার জন্যই করা হচ্ছে.

এবারে পাকিস্তানের উপরে হামলা প্রায় ছয় সপ্তাহ থেমে থাকার পরে প্রথম হামলা, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“নিজেদের কয়েকটি কাজ আমেরিকার লোকরা অবশ্যই সমাধা করতে পেরেছে. ওয়ালিউর রেহমানের মৃত্যুর অর্থ হল যে, এবারে তেহরিক-এ-তালিবান, পাকিস্তান দলে সেই সব নেতাদের অবস্থানই মজবুত হবে, যারা পাকিস্তানের সরকারের বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করতে চায়, আর তাই আফগানিস্তান এলাকায় দলের কাজকর্ম কমে আসবে.

কিন্তু পাকিস্তানের জন্য এই ধরনের ঘটনা পরম্পরা অনেক কম সুবিধা জনক. ওয়ালিউর রেহমানের হত্যা অব্যবহিত পরেই তেহরিক-এ-তালিবান দল ঘোষণা করেছে যে, দেশের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে কোন রকমের আলোচনায় তারা বসবে না”.

এই আন্দোলনের প্রধান মুখপাত্র এহসানুল্লা এহসান এক টেলিফোন সাক্ষাত্কারে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাকে ঘোষণা করেছে যে, সরকার দেখা গেল ড্রোন বিমানের আঘাত বন্ধ করতে অসমর্থ, তাই আমরাও ঠিক করেছি সরকারের সঙ্গে সব রকমের কথাবার্তা বন্ধ করার. আমাদের পাকিস্তানের লড়াই চলবে. এই প্রসঙ্গে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“মার্কিন প্রশাসন শুধু আফগানিস্তানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা এক সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকেই মেরে ফেলতে সক্ষম হয় নি, বরং পাকিস্তানের নতুন সরকারের কাছে এক ইঙ্গিত প্রেরণ করতেও সক্ষম হয়েছে. এই ইঙ্গিতের মূল অর্থ হল যতই জোর গলায় নতুন প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করার বিষয়ে ঘোষণা করুন না কেন, আমেরিকার সামরিক বাহিনী ও বিশেষ পরিষেবা বিভাগের লোকেরা তাদের পথে গোঁয়ারের মতো চলতেই থাকবে.

এর সঙ্গেই যেমন ২০১১ সালে মে মাসে হয়েছিল ওসামা বেন লাদেনের হত্যার পরে, তেমনই এবারেও ওয়ালিউর রেহমানের হত্যার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা উদ্যোগের ঢেউ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ও তার ফলে বারাক ওবামার সম্ভব হয়েছে জনগনের দৃষ্টিকে তাঁর দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি মেয়াদের প্রথম কয়েক মাস জুড়ে চলা স্ক্যান্ডালের থেকে কিছুটা সরিয়ে দেওয়ার আর এমনকি হতে পারে যে, সম্ভাব্য অনাস্থা প্রস্তাবের হাত থেকেও বেঁচে যাওয়ার”.

আর এই ধরনের পরিস্থিতি যে, শুধু পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকেই তীক্ষ্ণ করে, - তো সেটা ওয়াশিংটনে খুব কম লোককেই স্পর্শ করে বলে মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.