বিগত সময়ে পর্যবেক্ষকরা বেশী করেই দক্ষিণ অতলান্তিক মহাসমুদ্র এলাকাকে বিশ্বের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্রের কেন্দ্র বলে উল্লেখ করেছেন. সেখানে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র গুলি ও সদ্য শক্তি অর্জনকারী দেশ গুলির স্বার্থের এক কঠিন গ্রন্থি বাঁধা হতে চলেছে, যারা চাইছে নিজেদের প্রভাবের এলাকাকে প্রসারিত ও মজবুত করে তুলতে.

বাস্তবে সমস্ত বিংশ শতাব্দী জুড়েই বিশ্বের মহাসমুদ্রের এই অংশে নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র গুলির স্বার্থ প্রসারিত হয়েছিল শুধু বকলমেই.

আজ দক্ষিণ অতলান্তিকে আঞ্চলিক ও সারা বিশ্ব জোড়া ক্রীড়নকদের সামরিক স্ট্র্যাটেজিক সক্রিয়তার কেন্দ্র সরে আসছে, এই কথা উল্লেখ করে স্ট্র্যাটেজিক মূল্যায়ণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের ডিরেক্টর সের্গেই গ্রিন্যায়েভ বলেছেন:

“সব মিলিয়ে এখন ভূ-রাজনৈতিক শক্তির স্থান পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারা যাচ্ছে. এটা প্রাথমিক ভাবে সেই বিষয়ের সঙ্গেই জড়িত, যে বিগত বছর গুলিতে বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে গিয়েছে. পশ্চিম ইউরোপের কেন্দ্র গুলি অংশতঃ, তাদের অর্থ হারিয়েছে. আর এশিয়ার গুলি – অর্জন করেছে. এই প্রসঙ্গে বিশ্বের বাজার গুলিকে নতুন করে ভাগ করা হচ্ছে, মহাদেশ পার হয়ে আসা পথ ও অর্থ প্রবাহের রাস্তাও ভাগ হয়ে যাচ্ছে. সেই সমস্ত কারণ, যা ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রের শক্তি নির্দিষ্ট করে দেয়, তা বিগত বছর গুলিতে একটা জাড্য পেয়েছে. এই দিয়েই দক্ষিণ অতলান্তিক মহাসমুদ্র এলাকার উপরে আগ্রহের কারণ বোঝা যায় আর তা দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য জায়গার উপরও আগ্রহের মাত্রা নির্ণয় করতে পারা যায়”.

বিশেষজ্ঞরা বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন বেশ কিছু মুখ্য আঞ্চলিক ক্রীড়নকদের সক্রিয়তা নিয়ে. ব্রাজিল যেমন, সক্রিয়ভাবে নিজেদের পারমানবিক ডুবোজাহাজ নির্মাণ করছে. ব্রাজিলের লোকরা খুবই গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের নৌবহরকে ঢেলে সাজাতে চাইছে, যা এক হালকা বিমান বাহী জাহাজ, যা ফরাসীদের কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল, আর খান তিরিশ চল্লিশ যুদ্ধ জাহাজ নিয়েই এখন কাজ করছে. এই সবই বলে দিচ্ছে যে, ব্রাজিলের লোকরা দক্ষিণ অতলান্তিক নিয়ে আগ্রহের উত্তেজনাকে বুঝে আগে থেকেই এগিয়ে থাকতে চাইছে.

এই এলাকায় চিনও এসে টোকা দিচ্ছে. দক্ষিণ অতলান্তিকের দেশ গুলির সঙ্গে তাদের বাণিজ্যের পরিমান খালি বেড়েই চলেছে. আর এটাও ঠিক যে, শুধু এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর এলাকাতে এই মহাজাগতিক সাম্রাজ্যের অনেকদিনই খুব বদ্ধ মনে হচ্ছে, এই কথা উল্লেখ করে সামরিক বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার শিরোকোরাদ বলেছেন:

“এখনই একাধিকবার চিনের নৌবহরের জাহাজ গুলি আফ্রিকার জলসীমায় উদয় হয়েছে – তা যেমন ভারত মহাসাগরে, তেমনই অতলান্তিক মহাসাগরেও. পরবর্তী কালে এটা শুধু বাড়তেই থাকবে. তার ওপরে আবার চিন সক্রিয়ভাবে বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ তৈরী করছে. আর খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে তারা এসে হাজির হবে দক্ষিণ অতলান্তিকে. দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের মধ্যে পরস্পর বিরোধ রয়েছে. কিন্তু তার সাথেই আবার জোট বাঁধার প্রবণতা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যদিও তা আঞ্চলিক সামরিক জোট নয়, কিন্তু দক্ষিণ অতলান্তিকের দেশ গুলির একটা সমাজ হিসাবেই. এই ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি ভূমিকা নেবে তা এখন বলা কঠিন. কিন্তু অন্তত পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই এই এলাকাকে প্রাথমিক এলাকা বলে মনে করেছে. আমেরিকার লোকরা সেখান থেকে স্বাভাবিক ভাবেই কখনোই চলে যাবে না”.

যথেষ্ট প্রতীকী ভঙ্গি হয়েছে কয়েকদিন আগে আমেরিকার লোকদের আবার করে ২০০৮ সালে চতুর্থ নৌবহরের সৃষ্টি করা, যা গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, আর বাস্তবে তাদের এক্তিয়ারের মধ্যেই দক্ষিণ অতলান্তিক ঘিরে সামুদ্রিক এলাকা পড়ে. এই ইঙ্গিত, প্রসঙ্গতঃ বলা যেতে পারে যে, খুবই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে একসারি লাতিন আমেরিকার দেশে, যারা নিয়মিত ভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদী হাত সরিয়ে নিতে আহ্বান করছে.

ভারত সম্বন্ধে যা বলা যেতে পারে, তা হল তাদের দক্ষিণ অতলান্তিকে উপস্থিতিকে চিনের সঙ্গে তুলনা করা চলে না, কিন্তু এই ক্ষেত্রে এখনই বলা যেতে পারে দিল্লীর আগ্রহের কথা, যা হয়েছে আঞ্চলিক বাজারে নিজেদের কেকের অংশের ভাগ নেওয়ার জন্য. আবার করে আলেকজান্ডার শিরোকোরাদ এই বিষয়ে বলেছেন:

“ভারতের জন্য কেপ অফ গুড হোপ সেই সতেরোশ শতকেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা বহন করেছিল. তার উপরে বাণিজ্য পোত গুলির জন্য চলার পথ এই কেপ এলাকার চার পাশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করতে শুরু করেছে বিশেষ করে জলদস্যূ সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে, যা লোহিত সাগর এলাকাতে চলছে, সোমালির সমুদ্র উপকূলে, মাদাগাস্কারকে ঘিরে আর অই ধরনের সব ব্যাপারে. এখানে মনোযোগ দিন যে, চিন ও ভারত এখন খুবই সক্রিয়ভাবে বিমানবাহী জাহাজ সমেত নৌবাহিনী তৈরী করতে চাইছে. এখানে অনুমান করা কঠিন হবে না যে, তাদের কাজ কারবারের পরিধির মধ্যে দক্ষিণ অতলান্তিক থাকবে. পাঁচটি নৌবহর – আমেরিকা, ভারত, চিন আর দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের নৌবহর ইচ্ছাকৃত ভাবে বা অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও একটা সামুদ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরী করবে”.

কয়েকদিন আগে জার্মানীর বিশ্লেষকরা ধারণ করেছেন যে, দক্ষিণ অতলান্তিক জ্বালানী আহরণের জন্য নতুন জায়গায় পরিণত হতে পারে, যা নিকটপ্রাচ্যের মতই বিশাল হতে পারে. এটা সেই কারণে যথেষ্ট, যাতে নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্র গুলি নিজেদের প্রাথমিক কাজের তালিকায় দক্ষিণ অতলান্তিককে বেছে নিয়েছে.