১লা জুন – শিশু পালন দিবস. এটা অন্যতম সর্বাধিক তাত্পর্য্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক উত্সব, যার উদ্দেশ্য – প্রাপ্তবয়স্কদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া শিশুদের অধিকার সম্মন্ধে, অত্যাচারের হাত থেকে তাদের রক্ষা করা. এই দিনটিতে রাশিয়ার বহু শহরে সাহায্যকামী শিশুদের সেবার্থে দাতব্যমুলক অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হয়ে থাকে.

    মস্কোয় স্বপ্নে বিশ্বাস রাখো দাতব্য তহরিলের তত্ত্বাবধানে প্রথম ভ্রাম্যমান কলা বিদ্যালয় প্রতিবন্ধী শিশুদের শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে. কিভাবে এরকম শিশুদের সৃজনশীল সম্ভাবনা প্রস্ফূটিত করতে, আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করা যায়, সেই সম্পর্কে রেডিও রাশিয়ার সংবাদদাত্রী ইলেনা গাইদুককে বলেছেন দাতব্য তহবিলটির অধিকর্ত্রী স্ভেতলানা নেভিয়ানস্কায়া-বুখতায়েভা.-

     তহবিলটি ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়. এটি স্বল্পস্বচ্ছল, প্রতিবন্ধী ও অনাথ শিশুদের উপকারার্থে প্রথম ভ্রাম্যমান কলা বিদ্যালয়. আমাদের স্বেচ্ছাসেবকরা হাসপাতাল, ক্যান্সার সেন্টার, অনাথাশ্রমগুলিতে গিয়ে অভাবী শিশুদের শিল্পশিক্ষা দেয়. আমরা চাই, যাতে প্রত্যেকটি শিশু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, যে স্বপ্ন সত্যি হয়. যখন ছোট বাচ্চা এমন কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত, যার সাথে প্রাপ্তবয়স্কেরও এঁটে ওঠা শক্ত, সে ছবি আঁকার জন্য হাতে তুলি তুলে নেয়, সে সাময়িকভাবে হলেও বিস্মৃত হয় তার নিরন্তর যন্ত্রণা. সে ফিরে আসে সেই জগতে, যেখানে বেদনার কোনো স্থান নেই. তখন অসুস্থ শিশুটি একাকীত্ব বোধ করে না. ব্যাধিতে দুর্বল শিশুরা কাঁপা কাঁপা হাতে তুলি দিয়ে কাগজের বুকে অবোধ্য চিত্রকল্প রচনায় মশগুল হয়ে যায়. তাদের হাতের কাজ শিল্পসজ্জাতেও ব্যবহার করা হয় – আমরা তাদের আঁকা ছবি প্যাকেটে, গ্রীটিংস কার্ডে, টি-সার্টে ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ি, আর্ট-গ্যালারিতে, প্রদর্শনীতে তাদের ছবি দর্শকদের কাছে পেশ করা হয়. এইভাবেই শিশুরা সমাজে তাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, ঠিক স্বাস্থ্যবান সব মানুষের মতো. আমরা সর্বদাই পুরস্কৃত করি শুধু বিজয়ীদের নয়, অংশগ্রহণকারী সবাইকে – কারণ কঠিন ব্যাধির সাথে জীবনমরন সংগ্রামরত প্রত্যেকটি শিশুই যে বিজয়ীর শিরোপা পাওয়ার যোগ্য. যখন বাচ্চারা হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি ফেরে, তারা সম্যক জানে, যে আগামীতে তারা কি করবে – ছবি আঁকবে, সৃষ্টি করবে. যখন মা বাবারা সন্তানদের আরোগ্যলাভের আশা একেবারেই ছেড়ে দেন, তখন শিশুদের অন্তর্নিহিত প্রতিভা উন্মোচণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ. আমরা তাদের উপহার দিই এই বিশ্বাস, যে তাদের সন্তান কিছুক্ষণের জন্যে হলেও যন্ত্রণার কথা ভুলে যায়, তাদের আবার আশা যোগাই স্বপ্নে বিশ্বাস রাখার.

     স্ভেতলানা গল্প করলেন, যে প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে সত্যিকারের প্রতিভাবান চিত্রকরও কম নেই. তাদের মধ্যে তিনি আলাদা করে বেছে নিলেন বাচ্চা ছেলে ভিক্তর দেরেভিয়ানচেঙ্কোকে.-

     বাস্তবিকই ভিতিয়া(ভালো নাম ভিক্তর)অসাধারণ বাচ্চা. তার সুমিষ্ট কন্ঠস্বর, সুর লয় বোধ, ছবি আঁকার হাত, লেখনীর উচ্চাঙ্গ শৈলী - প্রকৃতিদত্ত. ও খুব তাড়াতাড়ি অনাথ হয়ে যায়. মা বাবা হারানো ভিতিয়া আশ্রয় পায় অনাথাশ্রমে. সেখানে ও দ্রুত বন্ধুত্ব করে নেয়, সবার প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে আপন গুণে. কিন্তু খুব শীঘ্রই ভিতিয়া অসুখে পড়ে. ওর রক্তে ক্যান্সার ধরা পড়ে. সবাই শোকে আকুল হয়ে পড়েছিল. যখন তাকে ক্যান্সার সদনে নিয়ে আসা হয়েছিল, তখন ভিতিয়ার বয়স ছিল ১১ বছর. ছেলেটির কেউ ছিল না তার জ্বালাযন্ত্রণা একসাথে ভাগ করে নেওয়ার মতো. স্বরচিত কবিতায় সেই সময় ছেলেটি লেখে, যে সে একা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে... আমি তিন বছর ওকে আঁকা শিখিয়েছিলাম. ঐ সময়ের মধ্যে সে কয়েকটি চমত্কার ছবি এঁকেছিল ও প্রচুর কবিতা লিখেছিল. আমরা ভিতিয়ার কবিতা সংকলন ছাপিয়ে ছিলাম. আমার এখনো মনে পড়ে তার চোখভরা আনন্দ, যখন সে নিজে হাতে সই করে ডাক্তার, নার্সদের, অনাথাশ্রমে তার বন্ধুদের নিজস্ব কবিতার বই উপহার দিয়েছিল. মুখে লেগে থাকা সর্বক্ষণের হাসিটি ছিল ভিক্তরের ভিজিটিং কার্ড. গত বছর সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে. কিন্তু আমাদের কাছে ও জীবন্ত – ওর লেখা কবিতা, ওর আঁকা ছবি যে রয়ে গেছে আমাদের সাথে.

    যদিও বছরে মাত্র একবার শিশু পালন দিবস উদযাপিত হয়, তবুও আমাদের, মানে প্রাপ্তবয়স্কদের খেয়ালে রাখা উচিত আমাদের সাহায্যপ্রার্থী শিশুদের কথা, তাদের সাহায্য করার কথা. তাদের সামান্য ভালো কথা শুনিয়ে, একটু হাসি উপহার দিয়ে, একটু মিষ্টি খাইয়ে আর হয়তো বা দুরারোগ্য ব্যাধির নিরাময়ে প্রয়োজনীয় অপারেশনের জন্য অর্থ সাহায্য করে. আর স্বপ্নে বিশ্বাস রাখো তহবিল দয়ালু জাদুকরের মতো ঐ শিশুদের উপহার দেয় নিজের উপর, নিজের ভবিষ্যতের উপর বিশ্বাস.