৬০ বছর আগে ১৯৫৩ সালের ৫ই মার্চ মস্কোর উপকন্ঠে রাষ্ট্রীয় খামার বাড়িতে সোভিয়েত ইউনিয়নের দন্ডমুন্ড বিধাতা জোসেফ স্তালিন মারা যান. সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ৭৪ বছর বয়সী স্তালিনের মৃত্যুর কারণ ছিল মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ. কিন্তু খুব শীঘ্রই তার মৃত্যুর সাথে সোভিয়েত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের জড়িত থাকার গুজব ছড়িয়ে পড়তে থাকে. আর পরবর্তীকালে নবনিযুক্ত শাসক কর্তৃপক্ষ খোলাখুলি ঘোষণা করে, যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ইনটেলিজেন্স দফতরের তত্কালীন মুখ্য পদাধিকারী লাভ্রেন্তি বেরিয়ার চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন স্তালিন. আসলে কি ঘটেছিল?

    ২৮শে ফেব্রুয়ারী স্তালিন তার খামার বাড়িতে বেরিয়া ও নিকিতা খ্রুশোভ সহ কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর কয়েকজন সদস্যকে জড়ো করেছিলেন. কি নিয়ে সেখানে কথাবার্তা হয়েছিল জানা না গেলেও, এটুকু জানা আছে যে বাক্যালাপ চলেছিল ভোর ৪টে পর্যন্ত. তারপরে যে যার গন্তব্যে রওনা দেন আর স্তালিন যান শয্যাকক্ষে. ১লা মার্চ মধ্যাহ্নের পর স্তালিনের প্রহরীরা উদ্বিগ্ন হতে শুরু করে. স্তালিন তার মহল থেকে বেরোননি বা  কাউকে ডেকেও পাঠাননি. নির্দেশ মতো, না ডাকলে প্রহরীদের স্তালিনের কাছে যাওয়ার অধিকার ছিল না. অবশেষে রাত ১১টার সময় একজন দেহরক্ষী সাহস করে স্তালিনের কাছে গিয়ে তাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দ্যাখে. তখনো তার দেহে প্রাণ ছিল কিন্তু বাকশক্তি লোপ পেয়েছিল. সন্ত্রস্ত প্রহরীরা তাকে ডিভানে শুইয়ে বেরিয়াকে ফোন করতে শুরু করলো. বেরিয়ার অনুমতি ছাড়া স্তালিনের জন্য ডাক্তারদের কল করা ছিল নিষিদ্ধ. বেরিয়াকে দীর্ঘক্ষণ ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না(প্রসঙ্গতঃ, যেটা বেশ আশ্চর্য্যজনক). অবশেষে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা দফতরের প্রধানকে অতি কষ্টে খুঁজে পাওয়া গেল. তিনি এলেন ও গটগট করে ঢুকলেন সেই ঘরে, যেখানে অচৈতন্য অবস্থায় শায়িত ছিলেন স্তালিন.

     একনায়কের বাসভবনে ঘটা পরবর্তী ঘটনাস্রোত সম্পর্কে জানা গেছে শুধু প্রত্যক্ষদর্শীদের খুচখাচ ও অসম্পূর্ণ সাক্ষ্য থেকে, যেগুলি প্রায়শঃই পরস্পরবিরোধী. পরবর্তীকালে কয়েকজন সাক্ষ্য দিয়েছিল, যে স্তালিনকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে বেরিয়া ডাক্তারকে কল করতে একদম নিষেধ করেছিলেন. “কি আপনারা সোরগোল তুলছেন, দেখছেন না, যে কমরেড স্তালিন ঘুমিয়ে আছেন? সবাই এখান থেকে ভাগুন.” সে যাই হোক না কেন, সেই সারারাত সবার দ্বারা পরিত্যক্ত, আধাপঙ্গু স্তালিন পড়ে ছিলেন কোনো ডাক্তারি সাহায্য ছাড়া. শুধুমাত্র ২রা মার্চ বেরিয়া ডাক্তারদের কল করার নির্দেশ দেন. পলিটব্যুরোর সদস্যরা এসে ভাবলেশহীন, কিন্তু তখনও জীবিত স্তালিনের দেহের চারিপাশে সমবেত হলেন, ডাক্তাররা তাড়াহুড়ো করতে লাগলেন. বেরিয়া মাঝেমধ্যেই এসে উচ্চৈঃস্বরে ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করছিলেন – «আপনারা কমরেড স্তালিনের জীবনের গ্যারান্টি দিচ্ছেন ? আপনারা ওর শারিরীক অবস্থার জন্য আপনাদের দায়িত্বের মাত্রা উপলব্ধি করতে পারছেন ?» প্রত্যক্ষদর্শীরা পরবর্তীকালে স্মরণ করেছিলেন, যে সে দিন বেরিয়া এমন আচরন করছিলেন, যে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল তিনি ‘মালিকের’ মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রত্যয়ী. তিনি ঘনঘন মুমুর্ষু স্তালিনের কাছে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে তার মুখের দিকে একাগ্র মনে চেয়ে থাকছিলেন, যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন স্তালিনের শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার মুহুর্তটিকে ধরার. মৃতপ্রায় সম্রাটের শেষশয্যার পাশে ঠিক উত্তরাধিকার প্রাপ্ত রাজকুমারের মতো বেরিয়া বারবার বলছিলেন – “কমরেড স্তালিন, আপনি আমাদের কিছু অন্ততঃ বলুন!” কিন্ত স্তালিনের আর কিছু বলার মত অবস্থা ছিল না. স্তালিনের কন্যা স্ভেতলানা আলুলায়েভা তার পিতার জীবনের অন্তিম মুহুর্তগুলির স্মৃতিচারণা করেছেন. মৃত্যুর ঠিক পূর্বক্ষণে স্তালিন হঠাত্ চোখ মেললেন, তাকালেন তাকে ঘিরে থাকা মুখগুলির দিকে, তারপর বাঁ হাতটা তুললেনঃ উপরের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করলেন, নাকি হুমকির সঙ্কেত দিলেন. যাই হোক, তার কয়েক মুহুর্ত পরেই স্তালিন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন.

     বেরিয়ার পক্ষে ক্ষমতা জবরদখল করা সম্ভব হয়নি. ১৯৫৩ সালেরই ২৬শে জুন তাকে গ্রেফতার করা হয় ও অনতিবিলম্বে গুলি করে হত্যা করা হয়. কে-জি-বিতে তার ঘনিষ্ঠ সহকারীদেরও খতম করা হয়. দেশের শাসন ক্ষমতায় জোসেফ স্তালিনের উত্তরসূরী হন নিকিতা খ্রুশোভ. তিনিই বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দীকে সমূলে উত্পাটিত করার পরে বেরিয়া ও তার ঘনিষ্ঠদের স্তালিনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে তাকে হত্যা করার জন্য দোষারোপ করেছিলেন. ততদিনে কে-জি-বির শিখন্ডী ও তার সাকরেদরা কেউ আর জীবিত ছিল না, সুতরাং তাদের যে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করা যেতে পারতো.

     খুব সম্ভবতঃ আজ আমরা সুনিশ্চিত করে বলতে পারবো না, যে স্তালিন গত হয়েছিলেন বেরিয়ার চক্রান্তের ফলে নাকি তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল. অথবা হয়তো বা চক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু তার সংগঠক আদৌ বেরিয়া ছিলেন না ? আমরা শুধু এইটুকু বলতে পারি, যে স্তালিনের মৃত্যু সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের মধ্যে ক্ষমতার জন্য লড়াইয়ের চাপা আগুন উস্কে দিয়েছিল, যে লড়াইয়ে বেরিয়াকে কুপোকাত্ করে জয়ী হয়েছিলেন খ্রুশোভ. আর আপনারা বোধহয় জানেন, যে ইতিহাস সর্বদাই রচনা করেন বিজয়ীরা.