ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়ে একটি প্রধান বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাওবাদী জঙ্গীরা, যারা দেশের কেন্দ্রীয় ও পূর্বের রাজ্যগুলিতে অধিক সক্রিয়. দেশে নিষিদ্ধ অতি বাম পন্থী সংগঠন সিপিআই (এমএল) দেশের জাতীয় কংগ্রেসের খ্যাতনামা এক সারি রাজনৈতিক নেতাদের উপরে অভূতপূর্ব হামলা করে হত্যা করার দায়িত্ব স্বীকার করেছে, আর যে ঘটনায় নিহত হয়েছেন ভারতীয় জাতীয় ইন্দিরা কংগ্রেস দলের ২৪ জন. জঙ্গীদের কাজ প্রমাণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অক্ষমতা, যে তারা কোন ভাবেই মাওবাদী জঙ্গীদের সঙ্গে লড়াই করার উপযুক্ত উপায় খুঁজে বের করতে পারছে না, যারা বাস্তবে ভারতের দেশের ভিতরে জঙ্গল এলাকায় নিজেদের “রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র” তৈরী করে ফেলেছে, এই রকমই মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“সারা ভারত তোলপাড় করা হামলা, যা দেশের ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের উপরে দেশের এক কেন্দ্রীয় রাজ্য ছত্তিশগড় রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্ নির্বাচনী প্রচারের সময়ে করা হয়েছে, তা এই রাজ্যের রাজধানী রায়পুর থেকে ৩৪৫ কিলোমিটার দূরে বস্তার এলাকায় হয়েছে. ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা থাকাই বলে দেয় কেন এখানে ছত্তিশগড় রাজ্যের জাতীয় কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি নন্দ কুমার পটেল, এই দলেরই প্রবীণ নেতা ৮৪ বছরের বিদ্যাচরণ শুক্লা, যিনি এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভাতেই মন্ত্রী ছিলেন, রাজ্যের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহেন্দ্র কর্মা ও অন্যান্য খ্যাতনামা দলীয় কর্মীরা গিয়েছিলেন”.

খুবই ভাল করে অস্ত্র সজ্জিত জঙ্গীদের জন্য ২৫টি গাড়ীর এক শোভাযাত্রা হয়েছিল খুবই ভাল রকমের লক্ষ্য. তারা নিজেদের লুকিয়ে রাখা জায়গা থেকে এই গাড়ী গুলির উপরে অজস্র গুলি বর্ষণ শুরু করেছিল, তার ফলে ২৪ জন নিহত হয়েছেন ও আরও ৩২ জন আহত হয়েছেন. নিহতদের মধ্যে মাওবাদীদের পক্ষ থেকে সবচেয়ে ঘৃণ্য নেতা মহেন্দ্র কর্মা রয়েছেন. ২০০৫ সালে তিনি এক বিশেষ বাহিনী তৈরী করেছিলেন রাজ্যের জঙ্গীদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য, যার নাম দিয়েছিলেন “সালওয়া জুডুম” নামে.

মাওবাদীদের কাছ থেকে পাঠানো এক চার পাতার দীর্ঘ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আক্রমণ বহু সহস্র লোকের হত্যার প্রতিবাদে করা হয়েছে, যা ওই “সালওয়া জুডুম” বাহিনীর যোদ্ধা ও সরকারের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এই রাজ্যে আগে করেছে. এই বিবৃতিতে প্রচুর অতি বামপন্থী বাক্য বিন্যাস রয়েছে, যেমন নিহত মহেন্দ্র কর্মার পরিবারকে বলা হয়েছে এমন “জমিদার, যারা স্থানীয় প্রজাতির লোকদের খুবই কঠোর ভাবে শোষণ করে আসছে”. এবারে মাওবাদী জঙ্গীদের আক্রমণ বিগত বছর তিনেকের মধ্যে সবচেয়ে বড় হয়েছে. এ আগে এই ধরনের হামলার সঙ্গে তুলনীয় ঘটনা ঘটেছিল ২০১০ সালে, যখন জঙ্গীরা ৭৬ জন পুলিশকে হত্যা করেছিল. এই প্রসঙ্গে সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“ভারতীয় সিপিআই (এমএল) দলের আরও একটি অপারেশন, যেখানে বিহার, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যার জঙ্গীরা জোট বেঁধে করেছে – তা আবার করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, দেশের কেন্দ্রীয় সরকার মাওবাদী জঙ্গীদের সঙ্গে লড়াই করার মতো উপযুক্ত কোনও উপায় বের করতে পারছে না”.

১৯৬৭ সালে মাওবাদী চিনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও অন্যান্য ঘটনার সময়ে ভারতে এই জঙ্গী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, যা “মহান চেয়ারম্যানের” আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভারতের প্রশাসনকে বলেছিল “অর্ধ উপনিবেশবাদী ও অর্ধ সামন্ত তান্ত্রিক” ও তা ফেলে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিল, আর দেশে তৈরী করতে চেয়েছিল চিনের আদলে “কমিউনিস্ট সমাজ”. যদিও সেই চিনেই মাও বাদ বহু দিন আগেই নিজের প্রাথমিক রূপে বর্জিত হয়েছে, তবুও ভারতে তা খুবই আশ্চর্য জনক ভাবেই বেঁচে রয়েছে. এই মাও নীতি প্রসারের জন্য সবচেয়ে সুবিধা হয়েছে এই দেশে বহু সংখ্যক অত্যন্ত গরিব লোকের সমাজ থাকা, যারা অশিক্ষিত, আর বিশ্বাস করেন যে, অস্ত্র হাতে “শোষক শ্রেনীর পতন ঘটানো” সম্ভব ও এক “সুখী কমিউনিস্ট ভবিষ্যত” তৈরী করা সম্ভব.

দেশের সরকারের পক্ষ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধানের সমস্ত প্রচেষ্টাই বিফল হয়েছে. সবচেয়ে প্রসারিত অপারেশন, যা ভারতের জঙ্গল এলাকাকে মাওবাদী মুক্ত করার জন্য করা হয়েছিল, তা ছিল ২০০৯ সালে করা “অপারেশন গ্রীন হান্ট”, কিন্তু এই বহু প্রচারিত অপারেশন বিফল হয়েছিল. দেখা গিয়েছিল যে, ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও রসদের ব্যবস্থা করতে পারে নি, যে, তারা এই ধরনের কয়েক হাজার খুব ভাল করে প্রশিক্ষিত ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ জঙ্গীদের সমূলে উচ্ছেদ করতে পারে, যারা জঙ্গলে নিজেদের জলের মাছের মতই মনে করে.

কিন্তু এতে অবাক হওয়ার মতো কিছুই নেই যে, ছত্তিশগড় রাজ্যের সদ্য বিগত ঘটনা গুলি নিয়ে মন্তব্য করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেছেন যে, এটা “ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল্যবোধের উপরেই হামলা” করেছে ও “দেশের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার এক প্রধান হুমকিতে” পরিণত হয়েছে.