বুধবারে বাংলাদেশে সর্বজনীন হরতাল হয়ে গেল, যা ডেকেছিল আঠারো বিরোধী দলের জোট. এই সব হরতাল আবার হিংসার ফুলকির সঙ্গে হয়েছে: ভাঙচুর, বাস ও গাড়ী ভাঙা, হাত বোমা ফাটানো, পুলিশের সঙ্গে খণ্ড যুদ্ধ এই সব কিছু দিয়েই. প্রসঙ্গতঃ, বাংলাদেশের বাইরে সব সংবাদ মাধ্যমই এই হরতালে তুলনা মূলক ভাবে কম মনোযোগ দিয়েছে – কারণ খুবই বেশী রকমের এই ধরনের ঘটনা বিগত সময়ে বাংলাদেশে ঘটে চলেছে. আর তারই মধ্যে বর্তমানে সরকার বিরোধী সক্রিয়তার ঢেউ শুধু বাংলাদেশের জন্যেই নয় বরং এই সমগ্র অঞ্চলের জন্যই বহু সুদূর প্রসারিত পরিণাম নিয়ে আসতে পারে.

দেশের ক্ষমতাসীন প্রশাসন ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে কঠোর বিরোধ বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল গত বছরে, যদিও এর জন্য পূর্বাভাস আগে থেকেই ছিল. প্রথমে সরকার ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে দেওয়া তাঁর প্রাক্ নির্বাচনী আশ্বাস পূরণ করতে গিয়ে জামাত-এ-ইসলামি নামক দলের সক্রিয় কর্মীদের উপরে ধরপাকড় শুরু করেছিলেন, তাদের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পাক বাহিনীকে সাহায্য ও দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষদের উপরে অত্যাচার করার জন্য অভিযুক্ত করে. এদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“কিন্তু এটা তখনই স্পষ্ট ছিল যে, এই প্রচার অভিযানের প্রধান লক্ষ্য যত না আলাদা অপরাধী ও এমনকি তুলনা মূলক ভাবে কম অর্থবহ এক ঐস্লামিক দল, তার চেয়েও বেশী করে দেশের প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি দল. ঠিক করে বললে পরবর্তী কালের ঘটনা শুধু এই তত্ত্বকেই সমর্থন করেছে”.

এখন দেশের সরকার বিএনপি দলের প্রখ্যাত নেতাদের বিরুদ্ধেই প্রচার করছে. সোমবারে এই দলের এক প্রবীণ নেতা পার্লামেন্টের সদস্য ৮৪ বছরের এম. কে. আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে. একই সময়ে সরকার ইন্টারপোল সংস্থার মাধ্যমে দেশের এই বিরোধী দল নেত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকে গ্রেট ব্রিটেন থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে চলেছে. তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, সে ২০০৭- ২০০৮ সালে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, কিন্তু ২০০৯ সাল থেকেই গ্রেট ব্রিটেনে চিকিত্সার নাম করে রয়ে গিয়েছে.

বিরোধী পক্ষও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া চাপের জন্য যা মনে করা হয়েছিল, সেই রকমেরই চাপ সৃষ্টি করেছে, তারা দেশ জোড়া হরতালের ডাক দিয়েছে. এটাই তাদের কৌশল. এই বছরের শুরু থেকেই শুধু কম বেশী নানা হরতালের জন্য তিরিশ বারের বেশী ডাক দেওয়া হয়েছে. গত রবিবারে শক্তি পরীক্ষা ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে, যখন সারা দেশ হরতালের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল. মঙ্গলবারে দেশের দশটি ডিস্ট্রিক্ট জুড়ে শাট ডাউন করে কল-কারখানা দোকানপাট বন্ধ করে রাখা হয়েছে. আর তারপরে এই নতুন হরতাল.

হরতাল ও ধর্মঘট যারা করছে, তাদের প্রধান স্লোগান – তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার, শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভার সময়ের আগেই ইস্তফা, যা এমনিতেই শেষ হওয়ার কথা এই বছরের ডিসেম্বর মাসে ও নতুন নির্বাচন ঘোষণা করা দেশে কেয়ারটেকার সরকারের নামে নিরপেক্ষ সরকার তৈরী করে, যে কোনও দলের পক্ষেই যাবে না, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই ভাবেই নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী প্রশাসনের কাজকর্ম বিরোধী পক্ষের কাজ কর্মকেও ততটাই সক্রিয় করেছে, যতটা সরকারের পক্ষ থেকে টের পেয়েছে বিরোধীরা, তাই এবারে প্রধান প্রশ্ন হল, পরবর্তী কালের ঘটনা সংবিধান সম্মত থাকবে কি না, অথবা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্র এবারে রাস্তায় নেমে আসবে”.

বাংলাদেশে পরিস্থিতি বেহাল করার জন্য যে, অনেকেই আগ্রহী – আর তা যে শুধু এই দেশের ভেতরেই নয়, বরং দেশের বাইরেও, তা জানাই রয়েছে. বর্তমানের শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দলকে মনে করা হয়েছে ভারতের পক্ষে, অন্যান্য নেতৃস্থানীয় দলগুলি ততটা নয়. কিন্তু এটা আবার অনেকেরই পছন্দ হচ্ছে না, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বাংলাদেশ স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়েছে, প্যারাডক্স মনে হলেও ভারতের উত্তর পূর্বের রাজ্য গুলির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বাংলাদেশের মধ্যে দিয়েই সহজে করা সম্ভব. আর এটা দিয়েই বাংলাদেশের গুরুত্ব চিনের ভারতকে চারদিকে ঘিরে ফেলার মুক্তামালা নীতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে”.

চিন ছাড়া, দেশের বর্তমানের লক্ষ্য পরিবর্তন করানোর জন্য আগ্রহী হতে পারে নিকটপ্রাচ্যের আরব শক্তি গুলিও, যারা বিগত সময়ে নিজেদের এলাকায় কিছু আরব দেশের সরকার পরিবর্তনে সাফল্য অর্জন করার পরে পারস্য উপসাগরীয় এলাকা থেকে বিশ্বের সমস্ত মুসলিম প্রধান দেশ গুলিতে নিজেদের কারবার করে দেখতে চাইছে, আর বাংলাদেশের ঐস্লামিক দলের মাধ্যমে বিএনপি দলের মধ্যেও এসে ঢুকেছে.

সুতরাং বিশ্বের সংবাদ মাধ্যম গুলি ও তাদের মধ্যে ভারতের সংবাদ সংস্থা গুলি যে বাংলাদেশের আজকের ঘটনার উপরে কম মনোযোগ দিয়েছে, তা হয়ত এই ঘটনার সংজ্ঞা ও প্রসারের মূল্যায়ণ করে দেখা হলে মনে হবে যে, উপযুক্ত হয় নি.