রবীন্দ্রনাথের জন্মমাস মে’তে ঐতিহ্য অনুযায়ী মস্কোয় চলছে গুরুদেব অঙ্কিত চিত্র প্রদর্শনী, তাঁর রচনা পাঠ ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের সান্ধ্যানুষ্ঠান. রাজধানীর ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে এই সেদিন এমনই এক সান্ধ্যানুষ্ঠানে সমবেত হয়েছিলেন গুরুদেবের গান, কবিতা, ছবি, জীবনদর্শনের গুণমুগ্ধরা. সান্ধ্যানুষ্ঠানটির আয়োজক ও পরিচালক ছিল মস্কোর হিন্দুস্তানি সমাজ. “রবীন্দ্রোত্সবে যোগদানকারীদের সংখ্যা প্রতিবছরে বেড়েই চলেছে” – লক্ষ্য করেছেন রাশিয়ায় ভারতের রাষ্ট্রদূত শ্রী অজয় মালহোত্র.-

       “ভারতের মাননীয় রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করছেন – রাশিয়ায় বিভিন্ন সংস্থায় রবীন্দ্র জন্মদিবস উদযাপন করা হয় এবং শুধু মস্কোতেই নয়. সেন্ট-পিটার্সবার্গেও রবীন্দ্রোত্সব চলছে. আমি সদ্য ক্রাসনাদারে গেছিলাম. ঐ শহরের কলা ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টেগোর সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং তা সাফল্যের সাথে কাজ করছে”.

       রাশিয়ায় রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী পড়া ও চর্চা করা হয়. সম্প্রতি গুরুদেবের সঙ্গীত সৃজনের উপর তাতিয়ানা মরোজোভার লেখা বই প্রকাশিত হয়েছে. রাশিয়ার গবেষকরা তাঁর প্রচারমুলক রচনাবলী অধ্যয়ন করেন, যে শিক্ষাব্যবস্থার রুপায়ন দিতে শুরু করেছিলেন তিনি শান্তিনিকেতনে, তাকে আত্মীগত করার চেষ্টা করেন. এর সারমর্ম ও মূলনীতিগুলি আমাদের সময়েও যুগোপযোগী.

       রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্মের সুবিদিত রুশী গবেষক ও রুশী রাষ্ট্রীয় মানবিক বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সের্গেই সেরেব্রিয়ান্নি বলছেন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ১০০ বছর পূর্তি আগতপ্রায়. ঐ পুরস্কার তাঁকে এনে দিয়েছিল বিশ্বখ্যাতি.-

       তবে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ায় খ্যাতি ও স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন. ততদিনে আমাদের দেশে তাঁর বিশ্ববন্দিত গীতাঞ্জলি কাব্যের রুশী অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিল. সোভিয়েত আমলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলী ১২ খন্ডে কয়েকটি সংস্করনে লক্ষ লক্ষ কপিতে এই দেশে প্রকাশ করা হয়েছিল. সেই সময় রুশী সহ সোভিয়ের ইউনিয়নের বহু প্রজাতন্ত্রের মানুষের মাতৃভাষায় তাঁর রচনাবলী প্রকাশ করা হত. বর্তমানে রুশীতে অনুবাদ করা হচ্ছে তার প্রখ্যাত উপন্যাস – ‘ঘরে বাইরে’. গুরুদেবের প্রচারমুলক রচনাবলীর প্রতি মানুষের আগ্রহেও ভাঁটা পড়েনি. তাঁর ‘জাতীয়তাবাদ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ জাতিধর্ম নির্বিশেষে ভারতবর্ষের জনগণের জন্য সমানাধিকার ও সমসুযোগের আবশ্যকীয়তার যে ধারণা উত্থাপণ করেছিলেন, তা রাশিয়া সহ বহুধর্মানুসারী যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য প্রযোজ্য.

      গুরুদেবের মাতৃভাষা – বাংলা ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয় মস্কো রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ও মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইনস্টিটিউটে. পরম অভিনিবেশের সঙ্গে সেখানে বাংলা শেখান অধ্যাপিকা ইরিনা প্রকোফিয়েভা. তিনি বলছেন – রবীন্দ্রনাথ আমাদের বৃহত্তর ভারতবর্ষের বিপুল ধনশালী সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটিয়েছেন. তাঁর সৃষ্টিকর্ম প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কৃষ্টির সংশ্লেষ বিশ্বের সম্মুখে তুলে ধরেছে.-

     ইরিনা সানন্দে স্বীকার করছেন – “রবীন্দ্রনাথ আমার বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষাদানে অনুপ্রেরণার উত্স. আমার শিক্ষার্থীরা সোত্সাহে তাঁর কাব্য মূল থেকে রুশীতে অনুবাদ করে, তাঁর রচনাবলীর অন্তর্বীক্ষণ করে তারা গুরুদেবের জীবনদর্শন, তাঁর মানবহিতৈষী চিন্তাধারা আত্মস্থ করে. আমার ও আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘কবিগুরু’ শব্দটির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন রবীন্দ্রনাথ. তিনি যেমন একাধারে কবি ও গুরু, তেমনই তিনি কবিদেরও গুরু”.

     এই উষ্ণ সান্ধ্যানুষ্ঠানে সব বয়সের ভারতীয় ও রুশীরা রবি ঠাকুরের গান, কবিতার আবৃত্তি পরিবেশন করেছে. রাশিয়ার রাজধানীতে আয়োজিত রবীন্দ্রসন্ধ্যায় ধ্বনিত কিছু সুর শুনছেন এখন আপনারা.