রাশিয়া ও ভারতের ঐতিহাসিক ভাবেই খুবই ইতিবাচক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা থাকা স্বত্ত্বেও, আজ এই দুটি দেশের সম্পর্ক বহু ক্ষেত্রেই শুধু বিগত সময়ের জাড্যে বহমান রয়েছে. একই সময়ে নতুন কালের উদ্ভব ও সম্ভাবনাময় প্রবণতা গুলি এতটা দ্রুত সমর্থন আদায় করতে পারছে না. এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন মস্কো শহরে অনুষ্ঠিত যৌথ “মগজ আক্রমণে” অংশ নেওয়া রুশ ও ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা. বিগত বছর গুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রতিনিধিত্ব মূলক “গোল টেবিল” বৈঠক রুশ আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সভা ও ভারতীয় বিশ্ব বিষয় পরিষদের প্রসূত উদ্যোগে হয়েছে. এই বৈঠকের অংশগ্রহণকারী সের্গেই তোমিন প্রসঙ্গতঃ বলেছেন:

“একটা প্যারাডক্স পরিস্থিতি হয়েছে. এক দিকে রাশিয়াতে ভারতকে অন্যান্য এশিয়ার দেশের মধ্যে “ইতিবাচক” ভাবেই নেওয়া হয়ে থাকে আর তার ফলে রুশ লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আগ্রহও ভারত সম্পর্কেই রয়েছে. আর অন্য দিকে, কিছু স্থিতিশীল রয়ে যাওয়া ধারণাই নেতিবাচক ভূমিকা নিয়েছে. যেমন, ভারতকে প্রায়ই ধরে নেওয়া হয়ে থাকে এক দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশ বলেই. এই ধরনের ধারণা প্রমাণ করে দেয় ভারতে বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনের সম্বন্ধে রাশিয়াতে খুবই গভীর ও ভিত্তিমূলক অবমূল্যায়ণ সম্পর্কে. এমনকি যখন রাশিয়াতে ব্রিকস নিয়ে বলা হয়, তখন মস্কোর প্রধান সহকর্মী হিসাবে প্রায়ই নাম করা হয়ে থাকে চিনের. ভারতকে মনে করা হয়ে থাকে শুধু এক গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বৃহত্ রাষ্ট্র হিসাবেই, আর তা প্রাথমিক ভাবে দক্ষিণ এশিয়াতে”.

এই আলোচনায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন, সেই বিষয়ে যে, একই ভাবে রাশিয়া নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যেও বর্তমানে ধারণা পরিবর্তিত হচ্ছে. তাঁদের মতে, ভারতেও একটা পরস্পর বিরোধী পরিস্থিতি তৈরী হচ্ছে. রাশিয়া ভারতের উচ্চ পদস্থ লোকদের মধ্যে ও সমাজের কাছে ইতিবাচক এক তুলনা মনে করিয়ে দেয়, যে এটি এমন এক দেশ, যাদের সঙ্গে ভারতের কোন উল্লেখ যোগ্য বিরোধ ও সংঘর্ষ নেই যেমন রয়েছে চিনের সঙ্গে. কিন্তু এই ক্ষেত্রে সম্ভাবনা সেই রকমেরও রয়েছে যে, রাশিয়া ভারতের জন্য দ্বিতীয় সারিতে চলে যাবে. বহু ভারতীয় সরকারি দলিলে যদি রাশিয়ার উল্লেখ করা হয়, তবে তা প্রায়ই কথা প্রসঙ্গে, বাস্তবের প্রয়োজনে নয়. আর সেটাই শুধু বিপদের নয় যে, ভারতীয়দের মধ্যে রাশিয়া বিরোধী মানসিকতা তৈরী হবে, বরং সেই বিষয়ে যে, রাশিয়া ভারতের জন্য লড়াইতে পশ্চিমের প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে স্রেফ একঘরে হয়ে যেতে পারে.

আর্থ বাণিজ্য ক্ষেত্রে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমানকে বহু দিন ধরেই বলা হচ্ছে একা হাজার কোটি ডলার অবধি তুলে আনা দরকার, কিন্তু এই ক্ষেত্রেও পরিমাণ এমন কিছু হয় নি, যা দুই দেশের ক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করলে পাওয়া যেতে পারে. রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের বড় দেশ অথবা এমনকি রাশিয়া- চিন আর্থ- বাণিজ্য লেনদেন, যা বর্তমানে ২০ হাজার কোটি ডলারের সমান করার কথা হচ্ছে, তার সঙ্গে ভারত – রুশ বাণিজ্যের পরিমান নিতান্তই অকিঞ্চিত্কর, হেতু এখানে স্পষ্ট, বর্তমানে ও বিগত কুড়ি – পঁচিশ বছর ধরে রাশিয়াতে ভারতের পক্ষ থেকে কাজ করতে ও প্রতিনিধিত্ব করতে আসা লোকদের ব্যক্তিগত গুণমান এর কারণ. আর রয়েছে এখানের অধিকাংশ ভারতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যারা দুর্নীতি বিনা কাজ করতেই সক্ষম হচ্ছে না.

এই বৈঠকের অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের কথায় জোর দিয়ে বলেছেন যে, মস্কোর উচিত্ হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করার, তাতে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে কাজকে আরও সুদূর প্রসারী ও উচ্চ স্তরে উপনীত করা. এই প্রসঙ্গে ভারত রাশিয়ার জন্য স্ট্র্যাটেজিক কারণেই বেশী গুরুত্বপূর্ণ হওয়া দরকার, সেখানে রুশ বিনিয়োগ হওয়া দরকার দীর্ঘ দিনের জন্য. তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় ভাবে গুরুত্ব দেওয়া দরকার ও সেখানে এই মুহূর্তেই লাভের জন্য চিন্তা করার দরকার নেই.

এটা কি করে করা যেতে পারে? এখানে এই রকমের একটি প্রস্তাবিত পথের কথা বলা যাক. রাশিয়া ও ভারতের নেতৃত্বের প্রত্যেক শীর্ষ বৈঠকের পরে ও আন্তর্রাষ্ট্রীয় সমঝোতায় স্বাক্ষর হওয়ার পরে দরকার রয়েছে আরও নির্দিষ্ট রকমের চুক্তি, প্রকল্প, অনুষ্ঠানের, যা হওয়া দরকার দীর্ঘ কাল ধরে. এই কাজে অংশ নেওয়া দরকার ব্যবসায়িক সমিতি গুলির, নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠান গুলির, বিশেষজ্ঞদের. এখানে সমস্ত স্তরেই সহযোগিতার ব্যবস্থা হওয়া দরকার – এক সর্ব ব্যাপী আন্তর্বিভাগীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী.

সব থেকে ভাল হত আগামী পাঁচ- দশ বছরের জন্য নির্দিষ্ট করে কাজের তালিকা, সময় সীমা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির নাম সমেত এক “পথ নির্দেশিকা” তৈরী করা হলে. এই রকমের একটি “পথ নির্দেশিকার” কথা ঠিক করা হয়েছে মস্কো শহরে এই বছরের শেষে আগামী রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সাক্ষাত্কারের সময়ে তোলা যেতেই পারে.

রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই “গোল টেবিল” বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও প্রাচ্য বিশারদরা, প্রাচ্য অনুসন্ধান ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিরা, বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের ও রুশ পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধিরা আর তাছাড়া “রসসত্রুদনিচিয়েস্তভো” (রুশ সহযোগিতা) সংস্থার প্রতিনিধিরাও. ভারতীয় প্রতিনিধি দলের হয়ে এখানে এসেছিলেন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গবেষণা নিয়ে এক প্রাচীনতম বিশেষজ্ঞ সংস্থা ভারতীয় বিশ্ব বিষয় পরিষদের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞরা, র তারই সঙ্গে অবসার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন ও অন্যান্য নেতৃস্থানীয় বৈজ্ঞানিক- গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা.