মস্কো শহরে এই মে মাসের দারুণ দিন গুলিতে একটি উজ্জ্বল ও মনে রাখার মতো সাংস্কৃতিক উত্সব হয়ে গেল ইন্ডিয়ান সামার বাজার. এই ঘটনার জন্যই মস্কোর ভারতীয় রাজদূতাবাসে দেখা গেল নানা রঙের শিবির ও অন্য ধরনের খাবার দোকান, নানা রকমের খেলা ও প্রতিযোগিতার জন্য আলাদা জায়গা আর তাই এখানে এই সবই একেবারে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে একেবারে ছোট থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ পর্যন্ত নানা বয়সের নগর বাসী. আমরা প্রচুর অতিথির জন্য তৈরী হলেও এত জন এবারে আসবেন, তা ভাবতেও পারি নি, নিজের খুশী গোপন না করেই উল্লেখ করেছেন ভারতীয় নারী সমাজের সভাপতি ও বর্তমান রাষ্ট্রদূত শ্রী অজয় মলহোত্রর স্ত্রী শ্রীমতী ইরা মলহোত্র. তিনি বলেছেন:

“এটা প্রধান ঘটনা গুলির একটি, যার আয়োজন করার জন্য আমাদের স্বল্প সংখ্যক সদস্যারা সারা বছর ধরে তৈরী হই. আমাদের কর্মী সংখ্যা ৬৫ ও এঁরা অনেকেই ভারতীয় দূতাবাসের কর্মীদের স্ত্রী ও স্থানীয় ভারতীয় মহিলারা. আমরা এতে অংশ নেওয়ার জন্য বহু ভারতীয়কেই আহ্বান করি, যাঁরা মস্কো শহরে আছেন ও কাজ করছেন. তাঁদের মধ্যে ভারতীয় ব্যবসার প্রতিনিধিরাও রয়েছেন, আছেন ভারতীয় কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষিকারা, আর অবশ্যই রয়েছেন রুশ নাগরিকরা, যাঁরা রাশিয়ার রাজধানীতে ভারতীয় সংস্কৃতি কেন্দ্রের বহু সংখ্যক ক্লাসে অংশ নিয়ে থাকেন”.

রাশিয়ার তবলা বাদক সের্গেই এমেলিয়ানভ এখানে শিক্ষক বদ্রী নারায়ণ পণ্ডিতের এক সবচেয়ে ভাল ছাত্র – সে তাঁর কাছে এই সংস্কৃতি কেন্দ্রে বাজনা শেখে ও মনে করে যে, ২০১৩ সালের সামার বাজার তার আকৃতি, ধরণ ও অংশগ্রহণে এক বিশাল সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে, তাতে মস্কোর লোকদের এবারে উত্সাহ ছিল অনেক বেশী, সে বলেছে:

“আমরা এখানে যারা সকলে বিশেষ করে এই ধরনের উত্সবের জন্য তৈরী হয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের সঙ্গীত মিশ্রণে ফিউশান পরিবেশন করেছি, তাদের যেমন রুশ লোকেরা তেমনই ভারতীয় লোকরাও ভাল ভাবেই নিয়েছেন. বর্তমানে এই ধরনের সঙ্গীতই লোকের বেশী পছন্দ, ধ্রুপদী সঙ্গীতের জন্য তৈরী সেতার, সন্তুর বাঁশি, তবলা ব্যবহার করে মেলায় আসা লোকদের জন্যই তাদের উপযুক্ত সঙ্গীত শোনানো হয়েছে. তাই এই সব সুধীজন আমাদের মতো এই অনবদ্য সঙ্গীত শিল্পীদের ছাড়তে চায় নি, আমরা কয়েক ঘন্টা ধরেই এই রকমের একই সঙ্গীত বারে বারে বাজিয়ে গিয়েছি. এটা একটা দারুণ ব্যাপার যে, এই রকমের সঙ্গীতই বর্তমানের সামার বাজারে প্রধান একটা অংশ হতে পেরেছে”.

প্রসঙ্গতঃ, ভারতীয় নৃত্য যারা এখানে পরিবেশন করেছে তাদের মধ্যে ভারতীয় ও রুশীরা সকলেই ছিল, স্কুলের বাচ্চা ও রুশ নাচিয়েরা সকলেই বুঝেছে যে এই বাজারেই তাদের নাচ সব থেকে বেশী জমেছে.

যে কোন বাজারেই কেনাবেচা হয়ে থাকে, খাওয়া দাওয়া হয়ে থাকে, এখানেও তাই ছিল ভারত থেকে নিয়ে আসা শাল, পশমিনা, রেশমী কাপড়ের রামধনুর মতো সম্ভার, আয়ুর্বেদের নাম দিয়ে তৈরী ভারতীয় প্রসাধন সামগ্রী, ওষধি আর অবশ্যই ভারতীয় চা – এই সবই মস্কোর বাজারে সবচেয়ে বেশী বিক্রী হয়েছে.এখানে ভারতীয় চা বোর্ডের প্রতিনিধি শাকের হুসেইন বলেছেন যে, নব্বইয়ের দশকে রাশিয়াতে ভারতীয় চা বিক্রী হওয়ার পরিমান কিছু কম হওয়ার পরে বর্তমানে তা আবার করেই বাড়ছে. আর রাশিয়ার লোকদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় আসাম ও দার্জিলিংয়ের চা. এই ধরনের চা ভারতীয় সামার বাজারে সবচেয়ে বেশী বিক্রী হয়েছে.

এখানে ভারতীয় খাবার দাবারের ব্যবস্থাও ছিল প্রচুর, তন্দুরী চিকেন, সামোসা, পনীর, কাশ্মীর, রাজস্থান ও বাঙালী মিস্টি সব কিছুই বানিয়ে এনেছিলেন স্থানীয় ভারতীয় রেস্তোরাঁ থেকে রাঁধুনির দল. রাশিয়ার রাজধানীতে থাকা ভারতীয় এই ধরনের খাওয়ার জায়গার মধ্যে দুটি রেস্তোরাঁ পরিচালনা করেন সিদ্ধার্থ বোস, তিনি মস্কো শহরে একটি কোম্পানীর প্রতিনিধি ও এই সামার বাজারের এক পৃষ্ঠপোষক. তিনি এই সূত্রে বলেছেন:

“আমাদের মহারাজা নামের রেস্তোরাঁ ১৯৯৪ সাল থেকে কাজ করছে, আমাদের দ্বিতীয় রেস্তোরাঁ ফিউশান প্লাজা বিখ্যাত হতে পেরেছে. ভারতীয় সামার বাজারে অংশগ্রহণ আমাদের জন্য এক সন্তোষ জনক ও সম্মান জনক ব্যাপার. আমরা রাশিয়ার লোকদের হিন্দুস্থানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই. আমরা অনেক রকমের দাতব্য অনুষ্ঠানেও অংশ নিই, যা এই ভারতীয় নারী সমাজ আয়োজন করেন”.

ভারতীয় সামার বাজারে বহু ভারতীয় কোম্পানী পৃষ্ঠপোষক হয়ে সহায়তা করেছে, তারা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছিল. সব থেকে ভাল পুরস্কার ছিল – গোয়া, কেরালা, দিল্লী, আগ্রা ও জয়পুর যাওয়ার ট্যুরিস্ট ভাউচার. সবচেয়ে মিস্টি উপহারও ছিল দারুণ. এটা একটা ভারতীয় ফল দেওয়া কেক. এটা জিততে পেরেছে এক যুবতী অথচ অভিজ্ঞ মস্কোর গৃহিণী নিনা ব্রিয়ানশেভা. কোন রকমের ওজনের যন্ত্র ছাড়াই শুধু হাতে তুলে ধরে বলতে পেরেছে যে, এই কেকের সঠিক ওজন তিন কিলোগ্রাম.

সামার বাজার আয়োজন করে যে কয়েক হাজার ডলার অর্থ জমা করা সম্ভব হয়েছে, তা দিয়ে রাশিয়ার কিছু অনাথ সদনে অর্থ ও দ্রব্য সহায়তা পাঠানোর কথা. এই সদনগুলি মস্কো শহর ছাড়াও অন্যান্য শহরে রয়েছে, যে সব শহরের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ রয়েছে, সেই গুলি হল ইয়ারোস্লাভল, কালিনিনগ্রাদ, সিয়েভেরোদ্ভিনস্ক, ক্রাসনাদার, ভ্লাদিভস্তক, আর্খাঙ্গেলস্ক.