সিরিয়া বা মালি রাষ্ট্রের ঘটনার সঙ্গে সুইডেনের রাজধানী বা শহরতলির শৃঙ্খলা ভঙ্গের কি যোগাযোগ থাকতে পারে? কয়েকজন বিশেষজ্ঞরে মতে, এই ধরনের যোগাযোগ রয়েছে, আর তা একেবারেই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যদিও পশ্চিম তা স্বীকার করার জন্য তাড়াহুড়ো করছে না.

আমাদের সমীক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ যেমন মনে করেন যে, কারণটা হল যে, সঙ্কট বিদীর্ণ দেশ গুলি তাদের অস্থিতিশীলতাকেই বিশ্বের সর্বত্র রপ্তানী করছে. কিন্তু সেটা কথা নয় যে, এশিয়া ও আফ্রিকা সুশৃঙ্খল পশ্চিমের সঙ্গে নিজেদের অস্থিতিশীলতা ভাগ করে নিচ্ছে. আমাদের সমীক্ষকের মতে সব কিছুই হচ্ছে উল্টো. তিনি বলেছেন:

“কানাডা, গ্রেট ব্রিটেন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানীর প্রশাসন স্বীকার করেছে যে, তাদের দেশের নাগরিকরা সিরিয়াতে ভাড়াটে সেনা হিসাবে লড়াই করছে. সেখানে এমনকি কিছু অস্পষ্ট খবরও পাওয়া গিয়েছে যে, ভাড়াটে যোদ্ধাদের মধ্যে উত্তর ইউরোপের যোদ্ধারাও রয়েছে. তাই কেন এই সমস্ত দেশের নাগরিকরা, যাদের মনে করা হয়েছে যথেষ্ট রকমের ভাল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, তারা এখানে মানুষ মারতে ও যুদ্ধ করতে গিয়েছে? তারা কি নিজেদের “পশ্চিমের স্বর্গে” কোন তীক্ষ্ণ অনুভূতি পাওয়ার জন্য আকৃষ্ট হয়েছে? মনে হচ্ছে এটাই ব্যাপার নয়”.

এখন স্টকহোম শহরের শহরতলিতে গণ বিশৃঙ্খলার খবর দিতে গিয়ে ইউরোপের সংবাদ মাধ্যম খুব চেষ্টা করছে ইউরোপের জন্য খুব অস্বস্তিকর বর্ণ ও জাতি বিদ্বেষের কথা এড়িয়ে যেতে. তারা বলছে যে, যুব সমাজ নিজেদের জায়গা সমাজে খুঁজে না পেয়ে বিদ্রোহ করেছে, - আর এটা সত্যি কথাও বটে. সুইডেনের সরকারের সামাজিক ও শ্রম সংক্রান্ত রাজনীতিতে পতনের কথাও বলেছে. আর এটাও সত্য কথা – যদিও এর আগে পর্যন্ত সুইডেনের সামাজিক রাজনীতিকে বলা হয়েছে ইউরোপে সেরা, আর এমনকি সুইডেনের সমাজতন্ত্র নামে একটা প্রতীকী বাক্যও চালু করা হয়েছিল. শুধু বলা হচ্ছে না যে, যদি শতকরা একশ ভাগ নাও হয়, তবুও শতকরা নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে যারা বিদ্রোহ করেছে, তারা হয় এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে এসে নাগরিকত্ব পাওয়া লোকজন, অথবা তাদের বংশধররা.

এই অর্থে স্টকহোম ২০০৫ সালে আগুন জ্বলে ওঠা প্যারিসের শহরতলির চেয়ে কোনও অংশেই আলাদা নয় অথবা ২০১১ সালের ইংল্যান্ডের শহর গুলি, যেগুলিতে আগুন জ্বেলেছিল, তাদের চেয়েও কোন ভাবে পৃথক নয়.এক সময়ে ইউরোপে ভাল জীবনের খোঁজে আসা লোকরা আর এই জীবনে সুখী নন. অন্তত পক্ষে তাদের মধ্যে অনেকেই. তাদের ছেলেমেয়েরা, যারা জন্মের সময় থেকেই নতুন জন্মভূমির নাগরিক, তারাও. আর ব্যাপারটা শুধু সেটাই নয় যে, এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা লোকদের পরিবার অর্থকরী ভাবে সাধারণতঃ এখানকার অধিবাসী লোকদের চেয়ে খারাপ ভাবেই থাকে. একটা প্রধান অভিযোগ হল যে, তাদের প্রতি সরকারের ও সমাজের নজর রয়েছে দ্বিতীয় শ্রেনীর মানুষের মতো করে. দারিদ্র, তা তুলনা মূলক ভাবে হলেও প্রজাতিগত গর্ব খর্ব হওয়ার ফলে একটা বিস্ফোরক মিশ্রণ তৈরী করেছে. একটা দেশলাই জ্বালানোই যথেষ্ট, সঙ্গে সঙ্গেই বিস্ফোরণ অবধারিত.

আর সেই সমস্ত উপাদানই - দারিদ্র, সামাজিক ন্যায়ের অভাবের অনুভূতি, খুবই উপযুক্ত মাধ্যম, যাতে সন্ত্রাস বাসা বাঁধে. অল্প বয়সী ইউরোপের লোকদের মধ্যে কেউ রাস্তায় বের হয় গাড়ী জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য, আর কেউ বের হয় কোন সংগঠনের মিটিংয়ে, যারা যেমন সিরিয়াতে পাঠানোর জন্য যোদ্ধা ভাড়া করে. দেখা যাচ্ছে যে, নিজেদের আভ্যন্তরীণ সমস্যাকে পশ্চিম এই ভাবে অন্যান্য এলাকায় রপ্তানী করছে. আর যদি সিরিয়া রাষ্ট্র নিয়ে বলতে হয়, তবে তারা এখন শুধু নিজেদের হিসাবে ভুল হওয়ার জন্যই খরচে বাধ্য হচ্ছে না, বাধ্য হচ্ছে অন্যের খরচের দামও দিতে.

পশ্চিমে আল-কায়দা বা অন্যান্য একই ধরনের সংস্থার জন্য মুখের কথায় অভিশাপ কম দেওয়া হচ্ছে না. কিন্তু কাজের সময়ে এই সব গোষ্ঠীর দূতেরা পশ্চিমে কাজ করছে অবাধে. তাহলে এটা কেমন হল? এই নিয়ে আমাদের রাজনীতিবিদ ভিক্টর নাদেইন রায়েভস্কি বলেছেন:

“একেক সময়ে মন হয় যে, পশ্চিমে ডান হাত জানে না, বাঁ হাত কি করছে. যেমন ফ্রান্সের সামরিক বাহিনী মালি রাষ্ট্রে আল- কায়দা গোষ্ঠীর এক বিভাগের সঙ্গে লড়াই করছে, আবার একই সময়ে এই যোদ্ধাদের আরেকটি দল সিরিয়াতে প্রশাসন বিরোধী শক্তির সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে, যাদের আবার ফরাসী সরকার থেকে সাহায্য করা হচ্ছে. কিন্তু তা নিয়ে কোন পরস্পর বিরোধী কথা উঠে না. এটা পশ্চিমের দুই রকমের নীতির স্পষ্ট প্রমাণ. যদি অপরাধীরা খোদ লন্ডনে ব্রিটেনের সামরিক বাহিনীর কর্মীকে মেরে ফেলে থাকে, তবে এটা সাধারন ফৌজদারী মামলা নয়, এটা সন্ত্রাসের কাণ্ড. কিন্তু যখন লন্ডনে অন্যান্য দেশে থেকে আসা চরমপন্থীরা সেখানে গেড়ে বসে সেখানের মুসলমান লোকদের মধ্যে ও বিদেশ থেকে আগতদের মধ্যে প্রচার চালাচ্ছে, এটা কিন্তু লন্ডনের চোখে কোনও সন্ত্রাসবাদ বা তার প্ররোচনা নয়, এটা তখন দাঁড়ায় বাক্ স্বাধীনতা হিসাবে. অর্থাত্ সন্ত্রাস – এটা শুধু যখন পশ্চিমের স্বার্থে আঘাত লাগে, শুধু তখনই. এই ধরনের অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের মোকাবিলায় কোন বিজয় সম্ভব নয়”.

জেহাদীদের অংশগ্রহণ নিয়ে যা বলা যেতে পারে – তা হল পশ্চিমের নাগরিকরা অন্যান্য দেশের এলাকায় যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে, যাদের নিয়ে এবারে পশ্চিমের বিশেষ বাহিনীর পক্ষ থেকে কিছুটা উদ্বেগের সুর শোনা যাচ্ছে. কিন্তু এটা মোটেও সেই জন্য নয় যে, তারা অন্য দেশে গুলি করে মারতে গিয়েছে, বরং শুধু সেই জন্য যে, তারা পরে আবার ফিরে আসতে পারে বলে. আইন রক্ষাকারী সংস্থাদের জন্য খালি ভালই হত, যদি এখানের সমস্ত উত্তেজিত জেহাদী লোকরা কোথাও একটা দূরে চলে যেত.

ফলে একটা প্যারাডক্স দেখতে পাওয়া যাচ্ছে: পশ্চিম এখন ঐস্লামিক বিশ্বে জেহাদী সরবরাহের কাজ নিচ্ছে. আর যদি ভেবে দেখা হয়, তবে তাতে কিছুই অবাক হওয়ার মতো নেই.