সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে লেবানন আরও একটি ফ্রন্টে পরিণত হতে চলেছে. এটা স্পষ্ট হয়েছে গতকাল সিরিয়ার সশস্ত্র বিরোধীদের পক্ষ থেকে বেইরুটে শিয়া মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় রকেট হামলার পরে. জঙ্গী সিরিয়ার স্বাধীন সামরিক বাহিনী লেবাননের এলাকায় নতুন আক্রমণের ভয় দেখিয়েছে. সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসাবে সিরিয়ার জঙ্গীরা লেবাননের ত্রিপোলি ও বেইরুট শহরের নানা জায়গাকে উল্লেখ করেছে. তার মধ্যে রাফিক হারিরি নামাঙ্কিত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরও রয়েছে.

 লেবাননের উত্তরের বৃহত্তম শহর ত্রিপোলি তে স্থানীয় সিরিয়ার প্রশাসনের সমর্থক ও বিরোধী সশস্ত্র সিরিয়ার জঙ্গী সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ আজ প্রথম মাস চলছে না. কিন্তু বেইরুট এখনও অবধি ছিল শান্ত. তার মধ্যে দেখাই যাচ্ছে যে, এই কারণে যে পরস্পর বিরোধী শক্তিগুলি বুঝতে পারছিল যে, রাজধানীকে এই বিরোধে জড়িয়ে ফেলা খুবই বিপজ্জনক. এখনও সেখানে গত শতকের সত্তর ও আশির দশক জুড়ে হওয়া গৃহযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে প্রকট হয়েই রয়েছে, যা বাস্তবে হয়েছিল বেইরুটের প্রতিটি রাস্তায়. তাই শিয়া এলাকায় গতকালের রকেট হামলা লেবাননে খুবই গুরুতর ভাবেই নেওয়া হয়েছে.

 দেশের রাষ্ট্রপতি মিশেল সুলেইমান এই হামলার যারা উদ্যোগ করেছে, তাদের “লেবাননে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আক্রমণ করা সন্ত্রাসবাদী” বলেছেন. এর পরে সিরিয়ার স্বাধীন সামরিক বাহিনী, যারা এই হামলার অব্যবহিত পরেই নতুন হামলার আশ্বাস দিয়েছিল, তারাই নিজেদের অবস্থান ১৮০ ডিগ্রী পাল্টে ফেলেছিল আর নিজেদের প্রথম ঘোষণা থেকে সংযোগ অস্বীকার করেছিল. এর আগে পর্যন্ত স্বাধীন সামরিক বাহিনীর তথ্য সচিব “সিরিয়া থেকে লেবাননে বিরোধের আগুন” ছড়িয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল.

 যদিও পরে জঙ্গীরা এই সব কথা থেকে অস্বীকার করেছে, তবুও বাস্তবে তারা নিজেদের দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী কাজই করেছে. তাদের লেবাননের সমর্থকদের আক্রমণের কেন্দ্র হয়েছে শিয়া দল “হেজবোল্লা”, যারা সিরিয়া প্রশাসনের প্রতি তাদের সমর্থন অস্বীকার করে নি. শনিবার ২৫শে মে “হেজবোল্লা” দলের নেতা শেখ হাসান নাসরুল্লা এই সমর্থনের কথা আবারও বলেছেন, তিনি ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর দল “সিরিয়ার আগুন ছড়িয়ে দেওয়াকে” চলতে দিতে পারে না. এটাকে নাসরুল্লা বলেছেন “প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের পতন ও ইজরায়েলের পক্ষ থেকে লেবানন অধিগ্রহণ” বলে.

 সিরিয়ার বিরোধকে আরও বড় পরিপ্রেক্ষিতেই দেখা দরকার, যাতে রয়েছে নিকটপ্রাচ্যে আন্তর্ধর্মীয় পারস্পরিক বিরোধ, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক মূল্যায়ণ ও বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক সের্গেই দেমিদেঙ্কো বলেছেন:

 “সিরিয়ার এলাকা দিয়ে বর্তমানে এক রকমের জল বিভাগ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যা শিয়া ও সুন্নী বিশ্বের মধ্যে এক সীমান্ত তৈরী করেছে. এটা তাদের যুদ্ধের ফ্রন্ট, যা ইরাক থেকে সিরিয়াতে ছড়িয়ে পড়েছে. এই ক্ষতকে চাগিয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র. তারা এক সময়ে ইরাকে আক্রমণ করে একেবারেই ভাবে নি যে, সেই সমস্ত পরিণতি হতে পারে, যা এই অনুপ্রবেশের ফলেই হয়েছে. একটি সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি হয়েছে বাস্তবে শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যে যুদ্ধ. যা আমরা আজ সিরিয়াতে দেখতে পাচ্ছি”.

 আর এবারে – লেবাননে. সেই সমস্ত লোকের পরিকল্পনা কার্যকরী হয়েছে, যারা তিনটি আরব দেশের মধ্যে সম্ভাব্য জোটকে হতে দিতে চায় না, যেখানে শিয়া জনসংখ্যাই বেশী – ইরাক, লেবানন ও সিরিয়া. এই জোট, যদি তা তৈরী হত, তবে ইরানের ভরসা যোগ্য জোট সঙ্গী হতে পারত. এই ধরনের ঘটনাকে অনেকেই পশ্চিমে ভয় পেয়েছিল, আর এমনকি এই এলাকাতেও. কিন্তু আপাততঃ, তিনটি দেশই বাস্তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে গিয়েছে – তাদের এখন মাথায় সম্পূর্ণ অন্য চিন্তা জুটেছে.