সোমবারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ জাপানে সফর শুরু করেছেন – এই দেশে সরকার বদল হওয়ার পরে প্রথমবার. মুখ্য আলোচ্যের মধ্যে রয়েছে – পারমানবিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও জাপানের বিনিয়োগ ভারতীয় অর্থনীতিতে লগ্নি করা. প্রসঙ্গতঃ, এই সফরের সংজ্ঞা অর্থনীতি ছাড়িয়ে অনেক দূরে প্রসারিত – তা দেখা দরকার সমগ্র এশিয়া- প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় স্ট্র্যাটেজিক শক্তি বিন্যাসের কাঠামো তৈরীর পরিপ্রেক্ষিতে.

মোটেও তো মনে হয় না যে, ভারতে কয়েকদিন আগেই সদ্য নিযুক্ত চিনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং সফর করেছেন বিনা কারণেই, আর জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সিঞ্জো আবে ভারতের অতিথির আসার আগেই মায়ানমার হয়ে এসেছেন.

চিনের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময়ে অনেক আশাব্যঞ্জক ঘোষণা করা হয়েছে দুই পক্ষ থেকেই ও সুপ্রতিবেশী হিসাবে সমস্ত সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে. কিন্তু এই সফর শুধু যে সমস্যা সমাধান করেই নি তা নয়, এমনকি খুব একটা উপায় বের করেও দেয় নি বর্তমানের উত্তেজনার পরিস্থিতি কমানোর, যা সদ্য বিগত সময়েই হয়েছে. লি কেকিয়াংয়ের ভারত ছেড়ে যাওয়ার পরেই লাদাখ থেকে, যেখানে কিছু দিন আগেই ভারতীয় ও চিনা সেনাবাহিনী সশস্ত্র অবস্থায় পরস্পরের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছিল, খবর এসেছে যে, চিনা বাহিনী যে শুধু বাস্তব নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে নিজেদের বাহিনী ফিরিয়ে নিয়ে যায় নি, তাই নয়, তারা আবার ভারতীয় এলাকার গভীরে পাঁচ কিলোমিটার পর্যন্ত রাস্তা তৈরী করে ফেলেছে.

জাপানের প্রধানমন্ত্রীর মায়ানমার সফর ছিল কম উচ্চকিত রাজনৈতিক ঘোষণা সংলগ্ন, কিন্তু তাতে ছিল খুবই নির্দিষ্ট ফল: জাপান মায়ানমারের ১৭৪ কোটি ডলারের ঋণ মকুব করে দিয়েছে ও আশ্বাস দিয়েছে আরও পঞ্চাশ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার.

এই সবই, জাপানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সফর শুরু হওয়ার পরে (তাঁর জাপানী প্রধানমন্ত্রী আবের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা বুধবার) – একেবারে নতুন খেলার দৃশ্যমান উপস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, যা শুরু হয়েছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাতে মাত্র দুই বছর আগেরও কম সময়ে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের দ্রুত দিক পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল ও এশিয়াতে ফিরে আসার কথা বলা হয়েছিল. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই দিক পরিবর্তনের লক্ষ্য স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে – চিনের দ্বিতীয় বৃহত্ রাষ্ট্র হিসাবে আত্ম প্রসারের সুযোগ নষ্ট করা, যারা আসন্ন ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয় (এটা এখনই ঘটছে), বরং সারিক- রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও টক্কর দিতে চলেছে. এটাই মায়ানমার রাষ্ট্রের উপরে মনোযোগ বৃদ্ধির কারণ হয়েছে ও তা শুধু আঞ্চলিক রাষ্ট্র গুলির দিক থেকেই নয়, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকেও ও অন্যান্য পশ্চিমের দেশের তরফ থেকেও, যাদের নেতারা এই দেশের প্রশাসনের প্রতি ব্যক্তিগত সহানুভূতি প্রদর্শনের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন”.

এই প্রসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিগত অভিজ্ঞতা, যারা নিকট প্রাচ্যে দুটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে ও তাদের বর্তমানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বেজিংয়ের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ এড়িয়ে যেতে বাধ্য করেছে, তাই তারা চেষ্টা করেছে পারস্পরিক বিরোধের সমস্ত ভার এই এলাকার দেশ গুলির উপরেই ন্যস্ত করতে, যাদের প্রত্যেকেরই চিনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে সমস্যা জমা হয়েছে.

এই মুহূর্ত যথেষ্ট উপযুক্ত: উপরোক্ত বিষয় ছাড়াও লাদাখ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম নিয়ে সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান না হওয়াতে এবং সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে জাপানের সঙ্গে চিনের বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়াতে মুহূর্ত বিরল হয়েছে. এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষকরা মনোযোগ দিয়েছেন সেই বিষয়ে যে, মনমোহন সিংহ জাপানে নিজের উপস্থিতি এক দিন বাড়িয়েছেন – সম্ভবতঃ দুই পক্ষের মদ্যে আলোচনার বিষয় বস্তু রয়েছে.

আর এমনকি অর্থনৈতিক অংশ, যা এই সফরে আলোচ্য হয়েছে, তাও নিজেই উল্লেখ করার মতো. এটা শুধু বড় মাপের পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্পে জাপানের বিনিয়োগ টেনে আনাই নয়, যেমন মুম্বাইয়ের শিল্প করিডর মুম্বাই – দিল্লী, বরং আরও সেই ধরনের স্পর্শকাতর এলাকায় সহযোগিতা, যেমন পারমানবিক ক্ষেত্র, আর তারই সঙ্গে ভারতে জাপানে তৈরী ইউএস-২ উভচর বিমানের সরবরাহ নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তির প্রসঙ্গ. তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারত- জাপানের নৈকট্য – নিজে থেকেই একটা ইতিবাচক ঘটনা কারণ দুটিই এশিয়াতে বৃহত্ রাষ্ট্র ও তাদের মধ্যে যোগাযোগও নতুন নয়. ভারতের অর্থনীতি – এশিয়ার একটি সবচেয়ে দ্রুত উন্নতিশীল অর্থনীতি. জাপান বছর দুয়েক আগে চিনকে এশিয়া গড় বার্ষিক উত্পাদনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের স্থান ছেড়ে দিয়েছে ও তারা কিছুকেই ২০০৮ -২০০৯ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটের পরিণাম থেকে রেহাই পাচ্ছে না, কিন্তু নতুন মন্ত্রীসভা আসার পর থেকেই জীবনের সঞ্চার দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. তাই সহযোগিতা প্রসার – এটা স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়, আর তা শুধু দুটি দেশের জন্যই নয়, বরং সারা এশিয়া জুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্র নির্মাণেও কাজে লাগে”.

শুধু এই সব কিছুর মধ্যে নিজের মনে রাখা দরকার যে, আরও একটি পক্ষ রয়েছে, যাদের এশিয়া সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই, কিন্তু তারা চায় ভারত- জাপান সম্পর্ককে ও তার নৈকট্যকে নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে. আর তাই ভারত ও জাপানের নেতাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার পড়বে, তাঁদের জোট কি চিন বিরোধী ভিত্তিতে তৈরী হওয়া দরকার ও বাস্তবে জ্বলন্ত অঙ্গার অন্য কারও জন্য নিজেদের হাতে নেওয়া দরকার?