জাতীয় পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক সমাজ চেষ্টা করছে সম্ভাব্য উন্নয়নের মাত্রা নির্ধারণ করার, যার পরে শান্তিপূর্ণ গবেষণা শেষ হয়ে সামরিক প্রযুক্তি তৈরী শুরু হয়ে যায়. কারণ এখন পারমানবিক অস্ত্র করায়ত্ত করতে চেয়েছে অনেক গুলি দেশ ও তাদের মধ্যে আবার অস্থিতিশীল প্রশাসন সমেত দেশও রয়েছে.

সুইজারল্যান্ডের মনত্রিয়ে শহরে শেষ হতে চলেছে আন্তর্জাতিক পারমানবিক বিপর্যয় রোধ নিয়ে লকসেমবর্গ সম্মেলন. এটা একটা প্রতিনিধিত্ব মূলক সম্মেলন, যা আন্তর্রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হিসাবে কোনও আলাদা করে সরকারি মর্যাদা না পেলেও, যথেষ্ট উদ্বেগের মানসিকতা নিয়েই চলেছে. এই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা শুধু সমস্বরে ঘোষণা করতেই বাকী রেখেছে যে প্রতীকী রক্ত রেখা, যার অর্থ হল পারমানবিক অস্ত্র করায়ত্ত হওয়া. তার কাছে এখন অনেক বেশী দেশই এসে গিয়েছে.

বিশেষজ্ঞ সমাজের উদ্বেগ যথেষ্ট রকমের ভিত্তি মূলক – আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এই মুহূর্তে বাইশটি দেশ, যারা পারমানবিক গবেষণা করছে, তারা এখনও এই সংস্থার প্রস্তাবিত বাড়তি প্রোটোকল গ্রহণ করে নি, যা ১৯৯৭ সালে দেওয়া হয়েছিল. আর এটাকে দেখা যেতে পারে সামরিক পারমানবিক গবেষণা বিষয়ে আপাতঃ প্রমাণ বলেই, যা এই সব দেশে গোপনে করা হচ্ছে, এই কথাই আয়োজক কমিটির সভাপতি রুশ জেনারেল ভ্লাদিমির দ্ভোরকিন উল্লেখ করেছেন. মনে করিয়ে দিই যে, পারমানবিক অস্ত্র প্রসার রোধ নিয়ে চুক্তি পারমানবিক গবেষণা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভাবে নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাকে প্রসারিত করে.

সেই সমস্ত দেশ, যারা এই প্রোটোকল গ্রহণ করে নি, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উদ্বেগের কারণ হয়েছে ইরান ও উত্তর কোরিয়া. শেষ দেশটি প্রায় সরকারি ভাবেই ২০০৬ সাল থেকে পারমানবিক অস্ত্র আয়ত্ত করেছে, আর ইরান আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার সন্দেহ অনুযায়ী এখন এক রেড লাইনের সামনেই রয়েছে.

বাড়তি করে এই প্রোটোকল গ্রহণের ধারণা উদয় হয়েছিল ১৯৯১ সালে ইরাকে অনুপ্রবেশের পর থেকেই, এই কথা রেডিও রাশিয়াকে মনে করিয়ে দিয়ে এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই বাকলিতস্কি. তখন আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার বিশেষজ্ঞরা ইরাকের এলাকায় ঢুকে পড়তে পেরেছিল ও সেখানে প্রমাণ পেয়েছিল যে, ইরাকে পারমানবিক অস্ত্র তৈরীর জন্য সক্রিয়ভাবে প্রয়াস হয়েছিল. এর আগে পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা তাঁদের আগ্রহ হওয়ার মতো জায়গা গুলিতে যেতে পারতেন শুধু কোন না কোনও রাষ্ট্রের নেতৃত্বের কাছ থেকে অনুমতি পেলে তবেই. সেই সব দেশ যারা আন্তর্জাতিক পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও প্রসার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর ও সম্পূর্ণ ভাবে গ্রহণ করেছে, তারা বাধ্য নিজেদের এলাকায় এই সংস্থার বিশেষজ্ঞদের অবাধে চলাফেরার করার অধিকার দিতে.

কিন্তু পরবর্তী কালের বাস্তব আচরণ থেকে দেখা গিয়েছে যে, এই বাড়তি প্রোটোকল স্বাক্ষর ও গ্রহণ করতে রাজী হয়েছে প্রধানতঃ সেই সমস্ত দেশই, যাদের এমনিতেই কেউ কোন রকমের সন্দেহ করছে না, এই কথা উল্লেখ করে বাকলিতস্কি বলেছেন:

“বাড়তি প্রোটোকল গ্রহণ – এটা স্বেচ্ছায় করার মতো কাজ, কেউই কোন দেশকে এটা স্বাক্ষর ও গ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারে না. ২০০৩ সালে ইরান বাড়তি প্রোটোকল স্বাক্ষর করলেও, পরে তা গ্রহণ করে নি. এই নিকট প্রাচ্যেই ইরান ছাড়া আরও একসারি রাষ্ট্র রয়েছে, যারা বাড়তি প্রোটোকল স্বাক্ষর করে নি. সেই সৌদী আরবই বাড়তি প্রোটোকল স্বাক্ষর করে নি. নীতিগত ভাবে সেই বাস্তব ঘটনা যে, কোন দেশ বাড়তি প্রোটোকল স্বাক্ষর করে নি বলে, তা নিজে থেকেই বলে দেয় না যে, তারা পারমানবিক অস্ত্র সৃষ্টি করেছে অথবা তা নিয়ে কাজ করছে”.

কিন্তু যদি এই তথ্য পাওয়া যায় যে, দেশ প্রোটোকল স্বাক্ষর করে নি ও তাদের এলাকায় পারমানবিক জ্বালানী নিয়ে গবেষণা চলছে, তবে আন্দ্রেই বাকলিতস্কি বলেছেন যে, সেখানে পারমানবিক গবেষণা গোপনে করা হচ্ছে বলে সন্দেহ খালি বেড়েই যায়.

ইরানের পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ, এখন প্রায় বিশ্বাসে পরিণত হতে চলেছে, তার ফলে নিকট প্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়েছে ও অন্যান্য দেশকেও উদ্বুদ্ধ করেছে এই ধরনের অস্ত্র তৈরীর চেষ্টা করতে, এই রকম রসবিজনেসকনসাল্টিং ডেইলি পত্রিকায় মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে সুইজারল্যান্ডের সম্মেলনের অংশগ্রহণকারী বিখ্যাত পদার্থবিদ রোয়াল্ড সাগদেয়েভের. তাঁর কথামতো, তুরস্ক, সৌদী আরব, আলজিরিয়া ও ইজিপ্ট প্রাথমিক ভাবে চেষ্টা করছে ইরানের সঙ্গে পারমানবিক গবেষণা ক্ষেত্রে সাম্য রক্ষা করার. তাই যা চারদিকে ঘটছে, তা নজর করে দেখলে এই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের সামনে প্রধান লক্ষ্য স্থির করেছেন – পারমানবিক সহনশীলতা নিয়ে গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণের. অর্থাত্ এই সম্মেলনের সভাপতি ভিয়াচেস্লাভ কান্তর যেমন বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কাঠামোর মধ্যে এমন কিছু পরিমাপ তৈরী করতে হবে, যা পারমানবিক অস্ত্র বিহীণ দেশ গুলিকে অধিকার দেবে সম্পূর্ণ রকমের পারমানবিক শৃঙ্খল ব্যবহার করার. যেই শুধুমাত্র পারমানবিক জ্বালানী শক্তির ব্যতিরেকে এই অধিকার অন্যভাবে পারমানবিক অস্ত্র নির্মাণে ব্যবহারের ইঙ্গিত দেখতে পাওয়া যাবে, তখনই কোন না কোনও দেশের পারমানবিক পরিকল্পনাকে বাধা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে.

আজকের মুহূর্তে একই সঙ্গে সমস্ত বাস্তবে জানা সংস্থার পক্ষ থেকে পারমানবিক সহনশীলতা নিয়ন্ত্রণে চেষ্টাতে কোনও ফল হয় নি. আন্তর্জাতিক সমাজের পক্ষ থেকে দুই ভাবেই ব্যবহার যোগ্য প্রযুক্তি প্রসারের বিরুদ্ধে কার্যকরী কিছু করাও সম্ভব হচ্ছে না. খুবই উচ্চ প্রশিক্ষিত সংস্থার কর্মীরও গুপ্তচর বিভাগ থেকে দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছেন না, যা রেডিও প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাওয়া যাচ্ছে, এই কথা উল্লেখ করে ভিয়াচেস্লাভ কান্তর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা মূলক ক্ষেত্রে পারমানবিক অস্ত্র বহনের উপযুক্ত রকেট সফল ভাবে মূল্যায়ন করতে পারছেন না.

সম্ভবতঃ, যতক্ষণ বিশেষজ্ঞরা নিজেদের পারমানবিক সহনশীলতার মাত্রা স্থির করে উঠতে পারছেন না, ততক্ষণ বেশী ফলপ্রসূ পারমানবিক প্রযুক্তি প্রসারের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারেন তথাকথিত পারমানবিক ক্লাবের সদস্য দেশ গুলি, তারাই - রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ. নিজেদের শক্তি ও সম্ভাবনা অনুযায়ী তারা এমনিতেই চেষ্টা করছেন ইরান ও উত্তর কোরিয়াকে মধ্যস্থতাকারী পাঁচ পক্ষের কাঠামোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করতে.

কিন্তু এই প্রক্রিয়াতে নিয়মিত ভাবেই পারমানবিক ক্লাবের কোন না কোন একক সদস্যের সহনশীলতার মাত্রা বিঘ্ন তৈরী করছে. রাশিয়ার পারমানবিক সভার উপসভাপতি সের্গেই কুশনারিয়েভ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করে বলেছেন:

“এটা বড় ধরনের কূটনৈতিক খেলা. যেখানে এই ধরনের খেলা চলে, সেখানে সমস্ত পক্ষের একত্রে কোন সমঝোতায় আসা কঠিন. কারণ কোন একটা দেশ, ধরা যাক, যাদের ইচ্ছা হয়েছে পারমানবিক অস্ত্র করায়ত্ত করার, তাদের সাথে এই পারমানবিক ক্লাবের এক সদস্য বন্ধুত্ব করছে ও সবরকমের সাহায্য করছে. আর অন্যেরা এটাকে সমালোচনা করছে, আবার উল্টোটাও ঘটছে”.

সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ বাছাই করে দেওয়া পারমানবিক প্রযুক্তি প্রসারের বিষয়ে – এটা বর্তমানের তথাকথিত যুব পারমানবিক ক্লাবের সদস্য দেশ গুলি – যেমন ভারতবর্ষ ও পাকিস্তান. এখনও সঠিক ভাবে প্রমাণ সমেত জানা নেই যে, কাদের সহায়তায় তারা নিজেদের পারমানবিক অস্ত্র সম্ভার তৈরী করেছে ও তার প্রযুক্তি তৈরী করেছে. ইজরায়েল ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণও খুবই দেখার মতো, যারা কিছু তথ্য অনুযায়ী নিজেরা তৈরী করেছে ও এমনকি পরীক্ষা করেও দেখে নিয়েছে কারও একটা ভাল রকমের সহায়তা পেয়ে এই ধরনের অস্ত্র. পারমানবিক সহনশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া কি ভাবে এগোবে – তা এখন বলা কঠিন. কিন্তু এমনকি পারমানবিক অস্ত্র নিয়ে সেই সমস্ত দেশ যেমন ইজিপ্ট, আলজিরিয়া অথবা সৌদী আরবের উত্সাহ উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ উত্পন্ন করে যে, পারমানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্ত আরও আচমকা হয়ে যাতে পারে, যা পুরনো পারমানবিক ক্লাবের সদস্য দেশ গুলির বিখ্যাত বিশেষজ্ঞরা ধারণা করতে পারেন, তার থেকে.