১৯২৮ সালের ২৪শে মে ইতালির মেরু অভিযাত্রী উমবের্তো নোবিলে “ইতালি” নামের একটি হাওয়াই জাহাজে করে উত্তর মেরুতে গিয়ে পৌঁছেছিলেন. পরের দিনই এই বায়ু যানে চড়ে যাওয়া অভিযাত্রীদের যান ভেঙে পড়েছিল. তার পরেই শুর হয়েছিল বিশ্বে প্রথম আন্তর্জাতিক ত্রাণ অভিযান, যাতে ছয়টি দেশ থেকে ১৮টি জাহাজ ও ২১টি বিমান অংশ নিয়েছিল. সেখানে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল সোভিয়েত বরফ ভাঙ্গা জাহাজ “ক্রাসিন”.

উত্তর মেরুতে এর তিন বছর আগে “নরওয়ে” নামের এক হাওয়াই জাহাজে চড়ে নরওয়ে দেশের মেরু অভিযাত্রী রুয়াল আমুন্ডসেন গিয়েছিলেন. সেই হাওয়াই জাহাজ তৈরী করেছিলেন উমবের্তো নোবিলে, আর তিনি নিজেও এই অভিযানের দলে ছিলেন. যখন এই যান মেরুর উপরে পাক খাচ্ছিল, তখন দুই বিখ্যাত অভিযাত্রীর মধ্যে কে প্রথম তাই নিয়ে তর্ক শুরু হয়েছিল. তা আলাস্কা রাজ্যে সফল অবতরণের পরেও শেষ হয় নি, এই কথা উল্লেখ করে সেন্ট পিটার্সবার্গের বিশ্বের মহাসমুদ্রের যাদুঘরের কর্মী ইরিনা মালিনিনা বলেছেন:

“তাই নোবিলে ঠিক করেছিলেন হাওয়াই জাহাজে চড়ে নিজের ব্যক্তিগত উড়ান করার... এই অভিযানের একটা কাজ ছিল আগে অজানা এখানে কোনও ভূমি খুঁজে পাওয়া ও তা মুসোলিনীর নামে নামকরণ করা. এটা ইতালির পক্ষ থেকে করা একটা আদর্শ তৈরীর উপায় ছিল”.

ধারণা করা হয়েছিল যে, ১৬জন যাত্রীরা সকলে উত্তর মেরুতে নামবে, কিন্তু ১৯২৮ সালের ২৪শে মে আবহাওয়া খারাপ থাকায় এই কাজ করা সম্ভব হয় নি. তারা উল্টো দিকে ফেরা শুরু করেছিলেন ও শ্পিত্সবের্গেন থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে গ্যাস লীক করার জন্য তাদের ডিরিঝাবল ভেঙে পড়েছিল. এই ঘটনা নিয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সুমেরু ও কুমেরু যাদুঘরের কর্মী মারিয়া দুকালস্কায়া বলেছেন:

“এই ভেঙে পড়াটা ছিল খুবই ভয়ঙ্কর. তাদের গণ্ডোলা বরফে আছাড় খেয়ে টুকরো হয়ে গিয়েছিল. বেশ কয়েকজন লোক পড়ে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন আহত নোবিলে. বাকীদের জ্বলন্ত ডিরিঝাবল উড়িয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল, তাদের আর কোন দিনও খুঁজে পাওয়া যায় নি, আর তাঁদের নাম সুমেরু অভিযানে মৃতদের তালিকাতে রয়ে গিয়েছে. যারা বরফের টুকরোর উপরে পড়েছিলেন, তাদের ভাগ্য ভাল ছিল: তাদের সঙ্গেই পড়েছিল রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা. তারা তখন এসওএস পাঠিয়েছিল, আর তা প্রথম গ্রহণ করেছিল এক যুবক সোভিয়েত রেডিও প্রেমী নিকোলাই শ্মিডট. এই বিপর্যয়ের খবর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল. ছটি দেশ থেকে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া হয়েছিল”.

এই অভিযানের সময়ে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল রুয়াল আমুন্ডসেনের. আরও কয়েকটি বিমানের দুর্ঘটনা হয়েছিল. এই অপারেশনে চারটি সোভিয়েত জাহাজ অংশ নিয়েছিল. তাদের মধ্যে ছিল বরফ ভাঙ্গা জাহাজ ক্রাসিন. সেই জাহাজের বিশ্বে কোনও সমকক্ষ শক্তিশালী জাহাজ সেই সময়ে ছিল না. তার উপরে ছিল পাইলট বরিস চুখনভস্কির তিনটি মোটর চালিত বিমান. তার পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল ইতালি ডিরিঝাবল ভেঙে পড়া অভিযাত্রীদের তাঁবু খুঁজে বার করা. এঁদের বাঁচিয়ে নিয়ে ফেরাই বরফ ভাঙ্গা জাহাজ “ক্রাসিন” বিশ্ব বিজয় বলে মনে করেছিল. ফেরার পথে এই জাহাজ আবার পর্যটনের জাহাজ “মন্টে সের্ভান্টেস” উদ্ধার করেছিল, যার দেড় হাজার যাত্রী জাহাজের ক্যাপ্টেনকে জোর করে রাজী করিয়েছিল সোভিয়েত বরফ ভাঙ্গা জাহাজ “ক্রাসিন” দেখতে যেতে, যাতে স্বচক্ষে বীরদের দেখতে পাওয়া যায়. ফলে এই যাত্রীবাহী জাহাজ একটি হিমশৈলের গায়ে ধাক্কা খায় ও তার পরিণতি “টাইটানিক” জাহাজের মতই হতে পারত, যদি না সময় মতো তাদের সাহায্য করতে ক্রাসিন জাহাজ নিজেই উপস্থিত না হত. পরবর্তী দশকে এই বরফ ভাঙ্গা জাহাজ একাধিকবার সুমেরু এলাকায় বিপদে পড়া জাহাজ উদ্ধার করেছে, আর এখন সেটি সেন্ট পিটার্সবার্গে নোঙর ফেলে রয়েছে.তার উপরে একটি যাদুঘর রয়েছে. কিন্তু কয়েক দিন আগেই আবার “ক্রাসিন” জাহাজের নাবিকরা বিপদ থেকে উদ্ধারের কাজ করেছেন, এই কথা উল্লেখ করে যাদুঘরের কর্মী ইরিনা মালিনিনা বলেছেন:

“বরফ সরে যাওয়ার সময়ে দেখা গেল একটা কালো বিড়াল বরফের খণ্ডের উপরে ভেসে চলেছে. বরফের টুকরো ধরে ফেলা হয়েছিল, সেটাকে ঘাটের কিনারায় নিয়ে আসা হয়েছিল ও তারপরে বিড়াল উদ্ধার করা হয়েছিল. সে এখন এই জাহাজেই থাকে. এই ইতিহাসের আবার একটা পুনরাবৃত্তিও রয়েছে”.

ঠিক একই রকমের বিড়াল ১৯২৮ সালে তোলা এই জাহাজ নিয়ে তথ্যচিত্রে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল, যা উমবের্তো নোবিলে উদ্ধার অভিযানের সময়ে তোলা হয়েছিল. দেখা গেল যে, একই রকমের বিড়াল এই জাহাজের উপরে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও, যখন কামান ও রকেট সজ্জিত হয়ে “ক্রাসিন” জাহাজ মেরু পার করে দিয়েছিল জোটের সঙ্গীদের জাহাজ গুলিকে. এখানে বলা দরকার যে, এই জাহাজ তৈরী করা হয়েছিল ১৯১৬ সালে, রাশিয়ার ভাইস অ্যাডমিরাল স্তেপান মাকারভের ড্রয়িং অনুযায়ী ইংল্যান্ডের জাহাজ তৈরী কারখানায়. আর ব্রিটেনের নাবিকদের একটা সঠিক আচার রয়েছে: “জাহাজে কালো বিড়াল – মানে হল যে, সাফল্য অবধারিত”. যেটা প্রমাণ করে দিয়েছে সুমেরু নৌবহরের বিখ্যাত ভেটেরানদের উদাহরণ. কয়েকটা কথা যেমন বলা যাক উমবের্তো নোবিলে পরে কি করেছিলেন, তা নিয়ে. উমবের্তো নোবিলে বরফের বন্দী শিবির থেকে মুক্তি পেয়ে ফিরে এসে বেনিটো মুসোলিনীর কোপে পড়েছিলেন. তার পরে পাঁচ বছর কাজ করেছিলেন সোভিয়েত দেশে, যেখানে এমন এক ডিরিঝাবল তৈরী করেছিলেন, যা আকাশে ভেসে থাকার বিষয়ে বিশ্ব রেকর্ড করতে পেরেছিল. তার পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বছর গিয়ে থেকে ছিলেন আর শুধু যুদ্ধ শেষের পরেই নিজের দেশ ইতালিতে ফিরে আসতে পেরেছিলেন.