বৃহস্পতিবারে শেষ হওয়া চিনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের পাকিস্তান সফর যেমন প্রতিবেশী ভারতে, তেমনই পাকিস্তানেও একই সংজ্ঞাবহ প্রতিক্রিয়া উদ্ভব করে নি. ভারতে পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দর ও চিনের সিনঝিয়ান উইগুর স্বয়ংশাসিত এলাকার মধ্যে পরিবহন করিডর তৈরীর পরিকল্পনায় দেখতে পাওয়া গিয়েছে চিনের উপস্থিতি বৃদ্ধির বিপদ আর তার ফলে, বর্তমানের কাশ্মীরের সঙ্গে বিভক্ত স্ট্যাটাস মজবুত হওয়া. আর পাকিস্তানে কিছু সংবাদ মাধ্যমে দেখানো হয়েছে চিন – পাকিস্তান সহযোগিতায় সমান অধিকারের অভাবের চরিত্র.

যদি শুধু সরকারি ঘোষণা দিয়ে দেখা হয়, তবে লি কেকিয়াংয়ের পাকিস্তান সফরকে বলা যেতে পারে হর্ষ ধ্বনিতে মুখর সফর বলেই.চিনের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানকে তাদের “শক্ত থাকা ও অটল থাকার” জন্য প্রশংসা করেছেন ও আরও এই দেশে “একের পর এক আশ্চর্য সৃষ্টি” হয়েছে বলে ঘোষণা করেছেন.

“চিন ও পাকিস্তানের বন্ধুত্ব সমস্ত বাধা পার হয়ে আসতে পেরেছে ও এখন তা সোনার চেয়েও দামী”, - ঘোষণা করেছেন লি কেকিয়াং. তাঁর সফরের প্রধান ফল – এটা, অবশ্যই, অর্থনৈতিক করিডর তৈরীর জন্য সমঝোতায় স্বাক্ষর, যা পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরকে (চিনের সহায়তায় তৈরী) সিনঝিয়ান- উইগুর স্বয়ংশাসিত এলাকার সঙ্গে জুড়ে দেবে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই প্রকল্পের অর্থনৈতিক সংজ্ঞা দুই দেশের জন্যই বিশাল. চিনের জন্য এটা প্রথমতঃ, জিনিষপত্র সবচেয়ে কম সময়ে পারস্য উপসাগরীয় এলাকা থেকে নিয়ে যাওয়ার পথ, যার মধ্যে প্রাথমিক ভাবে রয়েছে খনিজ তেল, আর দ্বিতীয়তঃ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যা দেশের পশ্চিমের তুলনা মূলক ভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকাকে অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত করবে, এই এলাকাকে একটি অর্থনৈতিক বিকাশের কেন্দ্রে পরিণত করবে ও মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকায় উন্নয়ন সাধন করবে, যা পরবর্তী কালে উইগুর এলাকার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পায়ের তলার মাটি কেড়ে নেবে”.

পাকিস্তানও খুব আগ্রহী বড় মাপের পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্প করার জন্য – আর তা দেশের সেই বেলুচিস্তানেই, যেখানে গোয়াদার বন্দর রয়েছে ও যেখানে রয়েছে প্রভূত পরিমানে খনিজ সম্পদ আর যা বাস্তবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না সেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জন্যই.

অর্থনৈতিক করিডর তৈরী করার মানে হল যে, অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে স্ট্র্যাটেজিক কারাকুম সড়কের প্রসার ও আধুনিকীকরণ – পরিবহনের ধমনী, যা পাকিস্তান ও চিনের মধ্যে যোগাযোগের রাস্তা, আর এই রাস্তা নিয়েই ভারতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ব্যাপার হল যে, কারাকুম সড়ক কাশ্মীরের পাক অধিকৃত এলাকা দিয়েই গিয়েছে – আর সেখানে চিনের অর্থনৈতিক উপস্থিতি বৃদ্ধির অর্থ হল যে, এই এলাকাতে অনিবার্য ভাবেই সামরিক স্ট্র্যাটেজি অনুযায়ী ভারসাম্য ক্ষুণ্ণ হওয়া. এখনই ভারত থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে যে, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর এলাকায় প্রচুর চিনা সেনাবাহিনীর লোক জমায়েত হয়েছে. চিনারা বলছে এরা নির্মাণ কর্মী, সামরিক বাহিনীর লোক নয়, যদিও একটি অন্যটিকে বাদ দিয়ে হয় না”.

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, সরকারি ঘোষণাতে এই রকম বাহাদুরি দেওয়া স্বত্ত্বেও, পাকিস্তানে কিন্তু সবাই মোটেও ইতিবাচক ভাবে লি কেকিয়াংয়ের সফরকে দেখেন নি. যেমন “এক্সপ্রেস ট্রিবিউন” সংবাদপত্রে লেখা হয়েছে যে, “পাকিস্তানকে চিন কিছুই দিচ্ছে না”, আর এই দুদিনের সফরে চিনের প্রধানমন্ত্রী বাস্তবে শুধু এটাই দেখাতে চেয়েছেন যে, তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের “প্রথম সফর ভারতে ও আবার তা তিন দিন ধরে করার পরেই তিনি সোজা পাকিস্তানে এসেছেন, যাতে সটান চড় পাকিস্তানের গালে না মারা হয়”. এই প্রবন্ধের নাম দেওয়া হয়েছে “কেন চিন পাকিস্তানের জোট অর্থনীতির জন্যই অর্থহীণ”.

এখানে সত্যি যে, মনে রাখা দরকার “এক্সপ্রেস ট্রিবিউন” সংবাদপত্র আমেরিকা পন্থী আর সেখানে চিনের সঙ্গে মেলামেশা ভাল চোখে দেখা হয় না, কিন্তু ততটাই উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হল যে, পাকিস্তানে এমন অনেক লোক আছেন, যাঁরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঐতিহ্য বরাবর মেলামেশা বন্ধ করে চিনের পথে হাঁটাকে ভাল চোখে দেখেন না.

এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে সংবাদ মাধ্যমে একটু কম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে পাকিস্তানের সদ্য নির্বাচিত হবু প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সঙ্গে চিনের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত্কারের প্রসঙ্গে, যদিও বরিস ভলখোনস্কি মনে করেন যে, এই দেখা হওয়ার সময়েই খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘোষণা করা হয়েছে, তিনি তাই বলেছেন:

“চিনের প্রধানমন্ত্রী আগামী পাকিস্তানের সহকর্মীকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, চিন সমস্ত কিছুই করবে, যাতে পাকিস্তানের শক্তি সমস্যা দূর হয়, তার মধ্যে পারমানবিক শক্তি ক্ষেত্রেও. এখানে কথা নিশ্চয় করে বলা হয়েছে শুধু শান্তিপূর্ণ পরমাণু নিয়ে নয়. কিন্তু হিসাবের মধ্যে আনা দরকার যে, পাকিস্তানের সামরিক পারমানবিক পরিকল্পনা তৈরী করাই হয়েছিল স্পষ্টই, যদিও তা গোপনের চেষ্টা হয়েছিল, সেই চিনের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই. আর নিজেদের ১৯৮৮ সালে পাকিস্তান নিজেদের পারমানবিক পরীক্ষা করেছিল সেই সময়ে, যখন নেতৃত্বে ছিলেন এই প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ”.

সুতরাং খুবই মনে করা যেতে পারে যে, পরমাণু নিয়ে কথাবার্তা শুধু তার শান্তিপূর্ণ ব্যবহার প্রসঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকে নি.