চিন ও পাকিস্তান ঘোষণা করেছে যে, তারা চিনের দক্ষিণ পশ্চিমের সীমান্ত এলাকা থেকে পাকিস্তানের উত্তর পূর্ব এলাকা পর্যন্ত এক পরিবহন ও অর্থনৈতিক করিডর তৈরী করবে. বেজিং ও ইসলামাবাদে আশা করা হয়েছে যে, এই ধরনের করিডর এক বিশাল এলাকার চেহারাই পাল্টে দেবে, সেই এলাকাকে এশিয়াতে বহু পাক্ষিক সহযোগিতার ও নিরাপত্তার এলাকায় পরিণত করবে. এটা – চিনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের ইসলামাবাদ সফরের একটি প্রধান ফল হয়েছে.

এই প্রসঙ্গে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন মন্তব্য করে বলেছেন:

“গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের রাষ্ট্রীয় সভার নতুন প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং দিল্লী সফর সেরে পাকিস্তান এসেছেন, যেখানে তিনি পুরো তিন দিন ছিলেন এবং চেষ্টা করেছেন দুটি নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে বিগত সপ্তাহ ও মাস গুলি ধরে উদ্ভূত উত্তেজনার প্রশমন করতে. ইসলামাবাদে চিনের মন্ত্রীসভা প্রধানের সফরের পরিবেশ ও সুর তাঁর দিল্লী সফরের চেয়ে আলাদা ছিল. চিনের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বিমানকে সাম্মানিক প্রহরা দিয়ে একসঙ্গে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর ছটি বিমান দেশের আকাশে নিয়ে এসেছে. ইসলামাবাদ এসেই প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং পাকিস্তান- চিন মৈত্রী কেন্দ্রে এসেছেন ও এমনকি তিনি শকরপড়িয়াঁ মেমোরিয়াল পার্কেও গিয়ে বৃক্ষ রোপন করেছেন”.

প্রসঙ্গতঃ এই সব প্রকাশ্য বিষয় ছিল বলা যেতে পারে প্রধান বিষয়ের আনুষঙ্গিক মাত্র – সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা, চুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘোষণা সমেত বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে. চিনে খুব একটা বেশী দিন হয় নি নতুন মন্ত্রীসভা ও সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে রদবদল হওয়ার. আর পাকিস্তানে ১১ই মে নির্বাচনের পরে সদ্য ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার সময় এসেছে. তাই দুই দেশের কর্তারা - নতুন ও বিদায়ী সরকার দেখাতে চেয়েছে এর আগের সম্পর্কের বিষয়ে পরম্পরা রক্ষা ও তাদের নতুন পর্যায়ে বিকাশের প্রচেষ্টা.

আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, চিনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রয়াসে সমর্থন অব্যাহত থাকবে, যা এই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও এলাকা সংক্রান্ত অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য করা হচ্ছে – ঘোষণা করেছেন ইসলামাবাদে নেমেই লি কেকিয়াং.

এক সারি পর্যবেক্ষক এই মন্তব্যকে দুই দেশের দিকে ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন – ভারত, যাদের পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী বলে ধরা হয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা পাকিস্তানের এলাকায় ড্রোন বিমান হামলা চালিয়েই যাচ্ছে তাদের সন্ত্রাসের মোকাবিলার নামে, আর যা ওয়াশিংটন এই নিয়ে বিশ্বকে বলতে চেয়েছে.

প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের ইসলামাবাদ সফর পাকিস্তানের নির্বাচন হয়ে যাওয়ার দেড় সপ্তাহের মধ্যেই হয়েছে. আর যদিও লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে নির্বাচনে বিজয়ী মুসলিম লীগের নেতা ও ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের দেখা হওয়ার কথা আগে থেকে উল্লেখ করা হয় নি, তবুও এই প্রশ্ন নিয়ে কৌতুহল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে নি. নওয়াজ শরীফ পাকিস্তানী বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির আয়োজিত চিনের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য দ্বিপ্রাহরিক ভোজের আসরে নিমন্ত্রিত ছিলেন.

এই আলোচনার একটি কাজ ছিল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে প্রশ্রয় দান ও পরিবহন এবং জ্বালানী শক্তি সংক্রান্ত দীর্ঘস্থায়ী প্রকল্প গুলিতে বিনিয়োগ নিয়ে. মনে করিয়ে দেবো যে, গত বছরে পাকিস্তান ও চিনের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমান ছিল এক হাজার দুশো কোটি ডলার অর্থের সমান ও আগামী দুই তিন বছরের মধ্যে দুই পক্ষই আশা করেছে এটাকে দেড় হাজার কোটি ডলারে তুলে নিয়ে যাওয়ার.

প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং ও রাষ্ট্রপতি জারদারি স্বাক্ষর করেছেন দশটিরও বেশী চুক্তি ও সহযোগিতা বিকাশ নিয়ে সমঝোতা পত্রে. এই প্রসঙ্গে চিনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং বলেছেন :

“আমরা আশা করি এক বিশাল অর্থনৈতিক করিডর তৈরী করার, যা শুধু চিনের স্ট্র্যাটেজিক সংজ্ঞাকেই শক্তিশালী করবে না, বরং এশিয়াতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আসবে” – পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারির সঙ্গে আলোচনার শেষে দেওয়া এক সম্মিলিত সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঘোষণা করেছেন চিনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং. তাঁর কথামতো, “চিন- পাকিস্তানের সম্মিলিত অর্থনৈতিক করিডর তৈরী - এটা দুই পক্ষেরই কাজ এক দীর্ঘকালীণ ভবিষ্যতের কথা ভেবে”.

এই পরিবহন- অর্থনৈতিক করিডর চিনের দক্ষিণ পশ্চিম এলাকা থেকে পাকিস্তানের উত্তর পূর্ব এলাকা জুড়ে সীমান্তবর্তী এলাকা গুলিকে জুড়ে দেবে, তাতে দুই দেশের আঞ্চলিক ভাবে অর্থনৈতিক, পরিবহন ও টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে. “যখন আমরা আমাদের আজকের দর্শন বাস্তবে পরিণত করবো, তখন এটার এক বিরাট স্ট্র্যাটেজিক অর্থ তৈরী হবে চিনের, দক্ষিণ এশিয়ার ও সব মিলিয়ে এশিয়ার বিকাশের জন্য” – উল্লেখ করেছেন চিনের প্রধানমন্ত্রী.

0ইসলামাবাদে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হতে চলেছে গোয়াদার গভীর সমুদ্র বন্দরের স্ট্র্যাটেজিক পরিকাঠামো তৈরী করার, যা পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে রয়েছে ও যেটি পরিচালনার ভার এই বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে তুলে দেওয়া হয়েছে চিনের ওভরসীজ পোর্ট হোল্ডিং লিমিটেড কোম্পানীর হাতে. গোয়াদার খুবই বিরল ভৌগলিক অবস্থানে রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে এই বন্দর এলাকাকে পরিণত করতে পারে এই এলাকার বাণিজ্য রাজধানী হিসাবে. বন্দর আরব সাগরে ও তা আবার খরমুজ প্রণালী থেকে খুবই কাছে, যা পারস্য উপসাগরে পৌঁছনোর পথ ও যেখান দিয়ে সারা বিশ্বে ব্যবহার করা খনিজ তেলের শতকরা চল্লিশ ভাগ পরিবাহিত হয়ে থাকে.