কয়েকদিন আগে চিনের পরিবেশ সংরক্ষণ মন্ত্রণালয় সী-চুয়ান প্রদেশে দাদুহে নদীতে শুয়াংজিয়াংকৌ বাঁধ তৈরী করার স্বপক্ষে নিজেদের রায় দিয়েছে. এই বাঁধ তৈরী করার মানে হল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বাঁধ তৈরী, যার উচ্চতা হতে চলেছে ৩১৪ মিটার. এখানে জলবিদ্যুত কেন্দ্রের ভবনটি তৈরী করা হবে মাটির নীচে, যাতে এটা তৈরী ও ব্যবহার করা যায় তাই অনেক সুড়ঙ্গ পথ কাটা হচ্ছে. যদিও মন্ত্রণালয় থেকে স্বীকার করা হয়েছে যে, এই বাঁধ তৈরী করা হলে পরিবেশের নির্দিষ্ট রকমের ক্ষতি হবে ও প্রয়োজন পড়বে কয়েক লক্ষ স্থানীয় মানুষকে তাদের ঘর বাড়ী থেকে উচ্ছেদ করার, তবুও এটা তৈরীর জন্য সবুজ সঙ্কেত দেওয়া হয়েছে.

দাদুহে নদী সী-চুয়ান প্রদেশের পশ্চিমে বয়ে গিয়ে মিনঝিয়ান নদীতে মিলিত হয়েছে, সেই নদী আবার ইয়ানঝি নদীর এক অববাহিকা. শুয়াংজিয়াংকৌ বাঁধ তৈরী হলে তার থেকে দুই গিগাওয়াট বিদ্যুত শক্তি পাওয়া যাবে ও বছরে আটশো কোটি কিলোওয়াট – হাওয়ার বিদ্যুত শক্তি উত্পাদিত হবে, ফলে এটাকে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবেই দেখা হচ্ছে, যা থেকে পুনরুত্পাদন করা সম্ভব এমন বিদ্যুত শক্তির উত্স হতে চলেছে. ২০২০ সালের মধ্যে চিনে ব্যবহার করার সমস্ত বিদ্যুত শক্তির মধ্যে শতকরা পনেরো শতাংশ পাওয়ার কথা এই ধরনের উত্স থেকেই.

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই প্রকল্প বিরল প্রজাতির মাছের চলাফেরা ও বংশবৃদ্ধিতে ক্ষতি করবে, আর তারই সঙ্গে পাশের এলাকার গাছপালার ক্ষতিও করবে – অংশতঃ, সেই ধরনের বিরল হয়ে আসা প্রজাতির গাছ যেমন চিনের ইউ গাছের. কিন্তু এই বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে বেস কয়েকটি সংরক্ষণ সংক্রান্ত কাজও করা হতে চলেছে, তার মধ্যে জলে ডুবিয়ে দেওয়া হবে যেসব এলাকা সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীদেরও পাঠিয়ে দেওয়া হবে অন্য জায়গায়. তাই সব মিলিয়ে মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পকে সমর্থন করেছে.

এই প্রকল্পকে শুধু চিনের জন্যই অর্থবহ প্রকল্প হিসাবেও দেখা যেতে পারত, কারণ দাদুহে নদী ও অন্যান্য সব উল্লেখ করা নদী, যারা পরে এই জল বয়ে নিয়ে যায়, তা সীমান্তবর্তী নদী না হত, শুধু চিনের মধ্য দিয়েই বয়ে যেত. কিন্তু এই প্রকল্পের দীর্ঘস্থায়ী পরিণাম প্রতিবেশীদের জন্য মারাত্মক হতে পারে, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“শুরু করা যাক সেটা দিয়েই যে, এই প্রকল্পের পরিবেশ সংক্রান্ত ক্ষতি সম্বন্ধে, যা পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট করে দেবে, তার কোন সীমান্ত থাকে না. আর যেমন অন্য একটি বড় প্রকল্প যা ইয়ানঝি নদীতে করা হয়েছে বর্তমানের বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জলবিদ্যুত কেন্দ্র স্যাংক্সিয়া তৈরী করা থেকে, তার অভিজ্ঞতা থেকে দেখতে পাওয়া গিয়েছে যে, এই ধরনের বাঁধ ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় খুবই বেশী করে ধ্বস নামা ও ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে থাকে”.

সী-চুয়ান প্রদেশ চিনের পশ্চিমে তিব্বতের সীমানায় রয়েছে আর সেখান থেকে মায়ানমার, ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল বেশী দূরে নয়. তার ওপরে আবার চিনের পশ্চিমে বড় বাঁধ তৈরী করার পরিকল্পনা যা সী-চুয়ান প্রদেশ ও তিব্বতে চাষ বাসের কারণে জলের প্রয়োজন মেটানোর জন্য করা হচ্ছে, তা অনেকদিন ধরেই এই এলাকার অববাহিকায় নীচের দিকে থাকা দেশ গুলির সন্দেহের কারণ হয়েছে – বিশেষত ভারত ও বাংলাদেশের, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“চিন নিজেদের জলবিদ্যুত শক্তি উত্পাদনের রাজনীতিতে নিজেদের একচেটিয়া অধিকার আছে বলেই মনে করে. তারা এশিয়ার বহু সংখ্যক দেশের বহু নদীর উপরের দিকের প্রবাহের পথে রয়েছে, যার থেকে কম করে হলেও তিনশো কোটি মানুষের জীবন নির্ভর করছে. চিন বাস্তবে সেই সব দেশের স্বার্থকে উপেক্ষাই করেছে, যারা এই সব নদীর প্রবাহের নীচের দিতে থাকে ও খুব ভাল হলে – নিজেদের ঠিক প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ভাবেই শুধু সমস্যা সমাধান করে থাকে, যার ফলে তারা স্রেফ শক্তির অবস্থান থেকেই কথা বলে. বহু পাক্ষিক কাঠামোতে এই নিয়ে আলোচনার প্রতি চিনের অনীহা স্পষ্ট করে দেখা গিয়েছে মেকং নদী নিয়ে ইন্দোচিন অঞ্চলের দেশ গুলির পরিষদে অংশ গ্রহণ করতে না চাওয়াতে. ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গেও ব্রহ্মপুত্র নদী নিয়ে কথা বলতে চায় না, আর ইরতীশ নদীর উপরের দিকের প্রবাহ ব্যবহার নিয়ে কথা বলতে শুধু তৈরী কাজাখস্থানের সঙ্গে, কিন্তু এই নদীর নীচের দিকের প্রবাহে থাকা রাশিয়ার সঙ্গেও নয়”.

এই দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই স্বাভাবিক যে, যে কোনও রকমের বড় প্রকল্প যা শুয়াংজিয়াংকৌ বাঁধ নিয়ে বলা যেতে পারে, তা সমস্ত আগ্রহী দেশের এর প্রতি খুবই তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে যেতে পারে না, কারণ পরিবেশের ক্ষতি হওয়া ছাড়াও, তা এই ধরনের প্রকল্প সীমান্ত পার হয়ে যাওয়া নদী গুলিতেও তৈরী হতে পারে, যার ফলে সরাসরি ভাবে প্রতিবেশী দেশ গুলির জল সংক্রান্ত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে.