মঙ্গলবারে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই দুই দিনের ভারত সফরে এসে ভারতের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত্কার করেছেন – রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জ্জী ও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহের সাথে. এখানে অন্যান্য বিষয়ে মধ্যে কথা হয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানে সামরিক সহায়তা বৃদ্ধির – বিশেষ করে সেখান থেকে ন্যাটো জোটের সেনা বাহিনী চলে যাওয়ার পরে. প্যারাডক্স হল যে, ২০১৪ সালের পরের সময় নিয়ে চুক্তিতে আসতে চাইছেন সেই সমস্ত নেতারা, যারা সেই সময়ে মনে তো হয় না যে, তাঁদের নিজেদের দেশের নেতৃত্বেই আর থাকবেন.

আজকের আফগানিস্তান - এটা একেবারেই কোন রকমের ভবিষ্যতে কি হবে বলা যায় এমন দেশ নয়. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সেখান থেকে সেনা বাহিনী সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হওয়ার জন্য ঘোষণা হয়েছে যেন সম্পূর্ণ ভাবেই, তবুও কোন বিশেষজ্ঞই সন্দেহ করছেন না যে, সেখানে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি থাকবেই ২০১৪ সালের পরে. এখন বেশী করেই বলা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জন্য পাঁচটা থেকে ছয়টা গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি রেখে দেবে – একটা কেন্দ্রে (কাবুলের কাছে), দেশের উত্তরে (মধ্য এশিয়ার দেশ গুলির সঙ্গে সীমান্তের কাছে), দেশের পশ্চিমে (ইরান সীমান্তে), আর দক্ষিণে (অর্থাত্ সেখানে, যেখান থেকে তালিবানের উদ্ভবের সবচেয়ে বেশী হুমকি রয়েছে). কিন্তু বারাক ওবামা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শেষ অবধি কত সৈন্য মোতায়েন রাখা হবে, তা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয় নি. রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“আজ বেশী করেই ২০১৪ সালের পরে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আঞ্চলিক শক্তি গুলির কথা উঠছে. আর এখানেই সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, যখন পুরনো সেই নীতি – শত্রুর শত্রু – আমার বন্ধু একেবারেই আর কাজ করছে না. সেই ২০১৪ সালেই কারজাইয়ের আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপতি থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, আর বিগত বছর গুলিতে তিনি সমস্ত বিদেশী শক্তির সঙ্গেই বিরোধ করতে পেরে উঠেছেন, তা যেমন একসময়ে তাঁর সমর্থন করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, তেমনই পাকিস্তানের সঙ্গেও. এই প্রসঙ্গে দেশের ভিতরেও তাঁকে সর্বজনীন ভাবে সমর্থন জানানো হয় নি. কারজাইয়ের খুবই ইচ্ছা হয়েছে, যাতে ২০১৪ সালের পরেও আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর কোনও কাছের লোক থাকেন, কিন্তু মনে হয়েছে যে, তাঁর এই ইচ্ছার বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ একা”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র – পাকিস্তানের পুরনো জোটও আর কাজ করছে না, যা আশির দশকে করতো খুবই সক্রিয় ভাবে, আর যে ভাবে এই দুই দেশ মিলে মুজাহেদ জঙ্গীদের সাহায্য করেছিল সোভিয়েত দেশের সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে আর আফগানিস্তানে আমেরিকার অপারেশনের প্রথম বছর গুলিতে, তা এখন দেখাই যাচ্ছে যে, থমকে দাঁড়িয়েছে. সমস্ত ইতিহাসে এখন আমেরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভরসা হয়েছে সবচেয়ে কম, আর পাকিস্তানে আমেরিকা বিরোধী মানসিকতা জনগনের মধ্যে বিশ্বের অন্য যে কোনও জায়গার চেয়ে অনেক বেশী, তাই বরিস ভলখোনস্কি উল্লেখ করেছেন:

“এই পরিস্থিতিতে বেজিং ও ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠতা বেশী করেই বাড়ছে. যখন চিন এই দেশে স্ট্র্যাটেজি করে নরম ভাবে অনুপ্রবেশ করছে আর বিগত কয়েক বছরে সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগকারী হয়ে দাঁড়িয়েছে আবার এরই মধ্যে চিন আফগানিস্তানের কোন একটাও পরস্পর বিরোধী শক্তির উপরে নিজেদের ভরসার কথা ব্যক্ত করে নি, যেমন আগের উত্তরের জোটের সঙ্গে সরাসরি ও তালিবদের সঙ্গে পাকিস্তানের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করেও”.

এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুবই দরকার পড়েছে আফগানিস্তানের বিষয়ে রাজনীতি পরিবাহক হওয়ার জন্য ভারতবর্ষকে. আর মনে হতে পারে এর জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশও রয়েছে. ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতই এই দেশে চিনের প্রভাব বৃদ্ধিতে আগ্রহী নয়, আবার তার ওপরে একেবারেই বিরোধী যে, আফগানিস্তান পাকিস্তানের পশ্চিমের পিছনের মাঠ হয়ে দাঁড়াক. এটাই ভারতকে আফগানিস্তানে তালিব প্রশাসন আসার সবচেয়ে বেশী বিরোধী করেছে, যারা পাকিস্তানের সঙ্গে বহু দিনের সম্পর্কে আবদ্ধ ও পাকিস্তানকে একটা ভূ-রাজনৈতিক মঞ্চ দিতে পারে, যেখান থেকে ভারতের স্বার্থের উপরে আঘাত করা যায়.

কিন্তু যে কোনও ভারতীয় কাজেরই স্পষ্ট বাধা দেওয়া হবে আফগানিস্তানে ভারতের ভূমিকা বা প্রভাব বৃদ্ধি করতে গেলে – কারণ দুই দেশের মধ্যে কোনও সংযুক্ত সীমানা নেই. আফগানিস্তান যাওয়ার সবচেয়ে ছোট রাস্তা হল পাকিস্তান হয়ে, কিন্তু সে পথ ভারতের জন্য বন্ধ. একটাই পথ বাকী রয়েছে – ইরানের বন্দর ছাভার হয়ে, তথাকথিত উত্তর দক্ষিণ করিডর দিয়ে, এই নিয়ে কথা বহুদিন ধরেই হচ্ছে, কিন্তু এখনও বাস্তবায়ন হয় নি. এই করিডর ভারতকে শুধু আফগানিস্তানে যাওয়ার সুযোগ করেই দিত না, বরং কার্বন যৌগে সমৃদ্ধ মধ্য এশিয়ার এলাকা গুলিতেও যেতে দিত. তারপরে রাশিয়া ও ইউরোপেও পৌঁছনো যেত. আর এখানেই ভারতের স্বার্থ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে ঠোকর খেয়েছে, যাদের জন্য ইরান তাদের আশা অনুযায়ী সিরিয়াতে বাশার আসাদের প্রশাসন ধ্বংস করার পরের লক্ষ্য হয়েছে.

এই ভাবেই বিভিন্ন দেশের পরস্পর বিরোধী স্বার্থের সংঘাত খুবই বহুমাত্রিক ও বহু সংজ্ঞাবহ চরিত্র পেয়েছে. আর এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল যাতে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এই এলাকার দেশ গুলির জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে পরিণত না হয়. তাই ভলখোনস্কি মন্তব্য করে বলেছেন:

“আসলে আঞ্চলিক রাষ্ট্র গুলির স্বার্থের নৈকট্য যতটা বিরোধ, তার চেয়ে বেশী. এখানে মুখ্য হল যে, সকলেরই দরকার স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ আফগানিস্তান, যার থেকে প্রতিবেশীদের জন্যে সন্ত্রাসের হুমকি নির্গত হবে না. আর এর অর্থ হল যে, নব্বইয়ের দশকের সকলের সঙ্গে সকলের যুদ্ধ শেষে চরমপন্থী প্রশাসন হওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াতে সমস্ত পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে”.

আর মনে তো হয় না যে, এই ক্ষেত্রে বর্তমানের রাষ্ট্রপতি কারজাইয়ের উপরে কোনও বাজী ধরা যেতে পারে, কারণ তিনি অনেক দিনই ল্যাংড়া হাঁসে পরিণত হয়েছেন, আর আফগানিস্তানের প্রশ্ন ভবিষ্যতে বোঝাই যাচ্ছে যে, একেবারেই অন্য লোকরা সমাধান করবেন.