ভারতের বেসরকারি সংগঠন:শিকারী নাকি শিকার?

ভারত সরকার বেসরকারি সংগঠন গুলির কাজকর্মের নিয়মকে কঠোর করেছেন, এবারে সেই সমস্ত সংগঠনকে দেশের বাইরে থেকে অর্থ সহায়তা পাওয়া বন্ধ করা হচ্ছে, যারা প্রশাসনের সমালোচনা করে বক্তব্য প্রকাশ করছে. এই ধরনের বাধা তার পরেই দেওয়া হয়েছে, যখন সরকার সেই ধারণাতে উপনীত হয়েছে যে, বিদেশ থেকে অজ্ঞাতসারে বিরোধ তৈরী করার জন্য অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়েছে, যে সমস্ত সহায়তা দেওয়ার সব থেকে বড় সংস্থা গুলি রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে. প্রত্যুত্তরে বেসরকারি সংগঠন গুলির প্রতিনিধিরা দেশের সরকারকে তাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার বিষয়ে অভিযোগ করেছে. আর আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমে তাড়াহুড়ো করে খবর দেওয়া হয়েছে যে, ভারত সরকারের কাজকর্মের মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে. কিন্তু “বিশ্বের সর্ব বৃহত্ গণতন্ত্রের” চলে আসা নিয়মে তাতে কোনও ধ্বংস দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না, এই রকম মনে করেন আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন. কারণ যে কোনও গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য – আর তা স্বাভাবিক অভ্যাসের ব্যাপার, যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারই এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তিনি তাই বলেছেন:

“ভারত সরকার যে কয়েকশো বেসরকারি সংগঠনের পেছনে লেগেছে, সে বিষয়ে কয়েকদিন আগে খবর দিয়েছে আমেরিকার সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট. এই সংবাদপত্র মনোযোগ আকর্ষণ করেছে সেই বিষয়ে, যে, অল্প কিছু কাল আগে বিদেশী অর্থ সাহায্যের বিষয়ে যে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে, তা সারা দেশের সাতশোটিরও বেশী এই ধরনের সংগঠনের জোট ভারতীয় সামাজিক ক্রিয়া মঞ্চ বা “ইনসাফ” সংগঠনকে স্পর্শ করেছে. মনে করিয়ে দিই যে, “ইনসাফ” সংগঠনের ভিতরে যে সমস্ত সংগঠন রয়েছে, তারা প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে সেই এলাকার মূল জনগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য লড়াই করে থাকে, পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে, পারমানবিক শক্তি উত্পাদনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, তারা মানবাধিকার সংক্রান্ত কাজকর্ম করে থাকে ও ধর্মীয় চরমপন্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে”.

এই সব কাজের জন্য আর্থিক অনুদান, বহু বছর ধরেই তারা বিদেশ থেকে অবাধে পেয়েছে, বাস্তবে বর্তমানে তা বন্ধ হয়েছে. ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে লেখা এক পত্রে ইনসাফ সংগঠনের কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে যে, এই গোষ্ঠীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কাজ কারবার বন্ধ করা হয়েছে, আর আগে তাদের দেওয়া বিদেশী সহায়তা পাওয়ার জন্য লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে. ভারত সরকারের এক উত্স থেকে, যার কথা উল্লেখ করেছে “দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট” সংবাদপত্র, স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, বেশ কিছু বেসরকারি সংগঠন বিদেশ থেকে পাওয়া অর্থ, তাদের সনদে লেখা উদ্দেশ্য অনুযায়ী, কোনও উন্নয়ন মূলক কাজে ব্যয় না করে সরকার বিরোধীতার জন্যই খরচ করছে. “একেক সময়ে পরিস্থিতি প্রায়ই এত জটিল হয়ে পড়ে যে, বোঝাই যায় না, এই ধরনের সংগঠনের কাজকর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য আসলে কি রকমের”.

এই ধরনের বাধা নিষেধ নিয়ে ভারতের প্রশাসন যতই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার কথা অস্বীকার করুন, বেসরকারি সংগঠনের প্রতিনিধিরা এই পরিস্থিতিকে অন্য রকম করে দেখেছেন. তাঁদের মতে, “সরকার অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করছে বিরোধীদের মুখবন্ধ করানোর উদ্দেশ্য নিয়ে. সরকারের কাজ শুধু সেই জন্যই করা হচ্ছে, যাতে আমাদের মেনে না নেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা সম্ভব হয়”, - ঘোষণা করেছেন “ইনসাফ” সংগঠনের সক্রিয় কর্মী অনিল চৌধুরী. – “আমরা বেসরকারি সংগঠনকে দেওয়া বিদেশী আর্থিক অনুদান সংক্রান্ত আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছি, সেটা আদালতে মামলায় তুলে. আমরা পারমানবিক শক্তি উত্পাদনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি ও জিন স্তরে পরিবর্তিত খাদ্যদ্রব্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি”. আমরা দেশের প্রধানমন্ত্রীর শান্তির ঘুম নষ্ট করে দিয়েছি. তাঁর কথার পরিপ্রেক্ষিতে সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এই পরিস্থিতি, যা এখন হয়েছে, তাকে কি কোনও ভাবে স্ক্যান্ডাল বলা চলতে পারে – আর তাতে কি ভূমিকা সেই বিদেশ থেকে করা আর্থিক সাহায্য নিতে পারে, যা নিয়ে এই সব গণ্ডগোল শুরু হয়েছে আর বেসরকারি সংগঠন গুলি প্রশাসনের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করেছে? মনে করিয়ে দিই যে, ভারতের কয়েকশো বেসরকারি সংগঠন গুলি, যাদের শতকরা নব্বই ভাগ বিদেশী সহায়তায় চলছে, তাদের প্রধান স্পনসর গোষ্ঠী থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই. হতে পারে যে, তাই “দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট” এই ইতিহাস নিয়ে বেশী লেখালেখি করছে, এমনকি ভারতের সংবাদ মাধ্যমের চেয়েও বেশী করেই. বিদেশী স্পনসরদের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গ্রেট ব্রিটেন ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে জার্মানী. ২০১১ সালের মার্চ মাসে শেষ হওয়া আর্থিক বছরে, যে বিষয়ে শেষ পরিসংখ্যানের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, ২২ হাজার ভারতীয় বেসরকারি সংগঠন বিদেশী সহায়তা পেয়েছিল দুশো কোটি ডলার সমান অর্থের চেয়েও বেশী”.

নতুন বাধা নিষেধের নিয়ম, যা নেওয়া হয়েছে, তার সম্বন্ধে অনেক সময় ভারতকে প্রায়ই যে নামে ডাকা হয়, সেই “বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের” চলে আসা নিয়ম ভাঙ্গার কথা বলা হচ্ছে. এটা মনে তো হয় না যে, জায়গা মতো বলা হয়েছে. কারণ যে কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই থাকে – এটা খুবই স্বাভাবিক বাস্তব. প্রশাসনের স্বার্থ – এক রকমের আর বেসরকারি সংগঠনের স্বার্থ আবার অন্য রকমের. তার ওপরে, ভারতের পরিস্থিতিতে সামাজিক সক্রিয় কর্মীদের খুবই শক্তিশালী মাধ্যম রয়েছে, নিজেদের অধিকার বজায় রাখার জন্য – এটা আদালত. ভারতের বিচার ব্যবস্থা বাস্তবেই স্বাধীন বলে মনে করলে, দেখা যাবে যে, প্রশাসন প্রায়ই তাতে মামলায় হারতে বাধ্য হয়েছে.

সুতরাং ভারতীয় বেসরকারি সংগঠন গুলিকে “শিকার” বলা মনে তো হয় না যে, জায়গামতো হচ্ছে. এমনকি প্রশাসনের কাছ থেকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা প্রতিপক্ষের উপরে আক্রমণও করতে পারে, নিজেরাই “শিকার” থেকে “শিকারি” হয়ে দাঁড়াতে পারে, যারা প্রধানমন্ত্রীকে শান্তিতে রাত্রে ঘুমাতেও দেবে না.