এক হাতে অঙ্কুশ ও অন্য হাতে ক্ষীর ভাণ্ড নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হোয়াইট হাউসে মায়ানমার থেকে আসা তাঁর সহকর্মী রাষ্ট্রপতি থেইন সেইনকে স্বাগত জানিয়েছেন. গৃহকর্তা অতিথিকে তাঁর দেশে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য প্রশংসা করে প্রজাতিগত ও ধর্মমত সংক্রান্ত সংঘর্ষ হতে দেওয়া জন্য সমালোচনা করেছেন.

হোয়াইট হাউসে ৪৭ বছর পরে সোমবারে মায়ানমার দেশের রাষ্ট্রপতিকে সাক্ষাত্ করা হয়েছে. মায়ানমারে যেমন গত বছরের নভেম্বর মাসে হয়েছিল, যখন সেখানে ইতিহাসে প্রথম কোনও মার্কিন রাষ্ট্রপতি এসেছিলেন. তখন বারাক ওবামা থেইন সেইনকে এক বড় অগ্রিম লিখে দিয়েছিলেন. তিনি তাঁকে মায়ানমারে যেখানে দেশের পার্লামেন্টে নির্বাচন হয়েছিল, জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল কয়েকশো রাজনৈতিক বন্দীকে, সেখানে পরিবর্তন স্বীকার করে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিমন্ত্রণ করেছিলেন. আর মায়ানমারের বসন্তের প্রতীক গণতন্ত্রের নেত্রী আউন সান চ্ঝি এমনকি দেশের পার্লামেন্ট সদস্যাও হতে পেরেছিলেন.

এর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মায়ানমার সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞার চাপ কম করেছিল. এটাই মনে করিয়ে দিয়েছেন বারাক ওবামা. সর্ব্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনার সময়ে এর অর্থ হল যে, প্রত্যুত্তরে করা পদক্ষেপের অপেক্ষা করা হচ্ছে. এই ক্ষেত্রে – মায়ানমারে আমেরিকার কোম্পানীদের জন্য বিশেষ সুবিধা হওয়ার. এই দেশকে বর্তমানে এশিয়ার নতুন ড্রাগন বলে ডাকা হয়ে থাকে, তাদের খুবই ধনী খনিজ সম্পদের জন্য.

বারাক ওবামা রাজনৈতিক স্তরে আমেরিকার কর্পোরেশন গুলির জন্যে রাস্তা ফাঁকা করছেন, যাতে তারা এই সম্পদে ভাগ বসাতে পারে. রাজনৈতিক সমর্থন না পাওয়া গেলে আমেরিকার লোকদের এখানে খুবই অসুবিধা হবে. এখানে গত বিশ বছর ধরে চিনের কোম্পানীরা কাজ করছে. তারা সেখানে নিজেদের লাফ দিয়েছিল সেই সামরিক জুন্টার শাসনের সময়েই, যখন সেই থেইন সেইন জেনারেলের উর্দি পরে থাকতেন. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম তখন চিনের এই মায়ানমারে গেড়ে বসা ব্যাপারটা খেয়ালে রাখে নি, তারা ব্যস্ত ছিল সামরিক জুন্টার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা গ্রহণ করা নিয়ে. থেইন সেইনকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো – এটা সেই ছেড়ে আসা সুযোগকে পাওয়ার চেষ্টা. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মায়ানমারে বড় খেলা শুরু করেছে চিনের বিরুদ্ধে, এই রকম মনে করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ইনস্টিটিউটের ডেপুটি ডিরেক্টর পাভেল জোলোতারিয়েভ বলেছেন:

“এখানে সবার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই কাজ করছে. তা চিনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে রয়েছে, সেখানে চেষ্টা চলছে চিনের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতাকে আটকে রাখার জন্য, যাতে প্রয়োজন পড়লে তাদের সহায়তা বা অন্তত পক্ষে আনুগত্য পাওয়া যেতে পারে. এই ধরনের ধারণা থেকে তারা ভিয়েতনাম, ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক তৈরী করছে. আর মায়ানমারের সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে দেখা দরকার তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের অবস্থান থেকেই, কোন গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে বলে নয়”.

এখন ওয়াশিংটন চাইছে মায়ানমারে চিনের প্রভাব কম করতে. হোয়াইট হাউসে ও মায়ানমারে জ্বালানী ক্ষেত্রে সহযোগিতার আগ্রহ নিয়ে ঘোষণায় স্বাক্ষর করা হয়েছে. এই ক্ষেত্রেই চিন এই দেশে সবচেয়ে বেশী এগিয়ে রয়েছে. তারা সেখানে গ্যাস পাইপ লাইন ও খনিজ তেলের পাইপ লাইন বানিয়েছে বঙ্গোপসাগর থেকে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্ত অবধি. গ্যাস সমুদ্র বক্ষে উত্পাদন করা হবে আর খনিজ তেল গভীর সমুদ্র বন্দরে জাহাজে করে এনে পাইপ লাইনে চিনের দেশের ভিতরে পাঠানো হবে.

এটা একটা স্ট্র্যাটেজিক প্রকল্প – আমেরিকার স্ট্র্যাটেজি যারা তৈরী করে, তাদের গলার কাঁটা, কারণ তারা এর সাহায্যে আফ্রিকা ও নিকটপ্রাচ্য থেকে খনিজ তেল আনতে পারবে, মালাক্কা প্রণালীর বোতলের গলার মতো জায়গা এড়িয়ে. সেই এলাকা মার্কিন নৌবহর নিয়ন্ত্রণ করে, আর তার মানে হল যে, চিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানীর ধমনী বন্ধ করার খুবই কম উপায় থাকছে.

যখন হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রপতিরা আলোচনা করেছেন, তাঁদের বাড়ীর দেওয়ালের কাছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপরে অত্যাচারের প্রতিবাদ করা হয়েছে. বিগত বছর গুলিতে এই দেশে ধর্মমত সংক্রান্ত সংঘর্ষ বেড়ে গিয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“গত বছরে পশ্চিমের রাজ্য রাখাইন জুড়ে বেশ কিছু রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপরে আক্রমণ করেছে বুদ্ধ ধর্মের নাম নিয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকরা, এই সব ধ্বংসের ফলে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে ও প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার লোক ঘর হারিয়েছেন ও এখনও অবধি উদ্বাস্তু ক্যাম্পে খুবই শোচনীয় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, এই সব ঘটনা প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর সরাসরি প্রশ্রয়ে যদি না ঘটেও থাকে, তবুও তাদের মদতেই হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে”.

বারাক ওবামা এই বিষয় এড়িয়ে যেতে পারেন নি, তিনি ঘোষণা করেছেন যে, এই ধরনের সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার বন্ধ হওয়া দরকার. আর এটা – মায়ানমারে রাজনৈতিক সংস্কার অর্ধেক করা হয়েছে বলে স্বীকার করা. আর তাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অগ্রিম অর্থেই মায়ানমারের জেনারেলদের মাপ করে দেওয়া শুরু করেছে, যদিও তারা মাত্র কয়েকদিন আগেই উর্দি ছেড়ে বেসরকারি পোষাক ধরেছে. আর তারা যত আনুগত্য দেখাবে মায়ানমারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসার জন্য, ততই বেশী হবে তাদের ওপরে মার্কিন বদান্যতা প্রদর্শন. বেজিং, বোঝাই যাচ্ছে, তাদের অবস্থান ছাড়তে রাজী হবে না. কিন্তু আগের মত মায়ানমারে সস্তা জিনিষ পাঠিয়ে ও আর্থিক বিনিয়োগ করে প্রভাব খাটানো, মনে তো হয় না যে সহজ কাজ হবে.