ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত সংক্রান্ত বিরোধ – পুরনো সমস্যা, এশিয়ার দুটি দৈত্যাকার দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতাকে নিগড়ে বেঁধে রেখেছে, আর তা সমাধান হওয়া অবশ্যই উচিত্. এই বিষয়ে দিল্লী ও বেজিং ভারতের রাজধানীতে ১৯-২০শে মে চিনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সফরের সময়ে সমঝোতা করেছে. একদিকে সহযোগিতা করে, ভারত ও চিন অন্য দিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে. দুই দৈত্যের এই সহযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আসন্ন আগামী দিনেও তাদের সম্পর্কের সত্তা নির্ণয় করবে, যা নাগরদোলার মতই উঠবে ও নামবে. আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেছেন:

“গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের রাষ্ট্র সভার নতুন প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং (চিনা উচ্চারণে – লি খেছ্যঙ)ভারতের রাজধানীতে তাঁর প্রথম বর্তমান পদে আসান অবস্থায় বিদেশ সফর করেছেন. চিনের কূটনীতির পক্ষ থেকে এক সাহসী ও আচমকা পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়েছে ঐতিহ্য অনুযায়ী এই মোটেও সহজ নয়, এমন এক প্রতিবেশী বড় দেশ থেকে বিদেশ সফর নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরু হওয়াকে, আর এটাও একটা ইঙ্গিত হতে পারে যে, এই দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সম্ভবতঃ অন্য এক পরিবর্তনের শুরু হতে চলেছে”.

চিনের সহকর্মী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে আলোচনা শেষ হওয়ার পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ বলেছেন – “আমরা মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া পশ্চিমের এলাকার ঘটনা থেকে একটা পাঠ নিতে পেরেছি. আমরা আমাদের বিশেষ প্রতিনিধিদের সীমান্ত এলাকায় পরবর্তী সময়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ব্যবস্থা দেখতে বলেছি. আমরা সমঝোতায় এসেছি যে, আমাদের বিশেষ প্রতিনিধিরা খুব শীঘ্রই দেখা করবেন ও তাঁরা একটি আলোচনায় বসবেন ও ন্যায্য, শুভ বুদ্ধি সমস্ত আর পারস্পরিক ভাবে গ্রহণযোগ্য সীমান্ত সংক্রান্ত চুক্তির ব্যবস্থা করবেন”.

ভারত ও চিনের ক্রমবর্ধমান বিশ্ব জোড়া ভূমিকার কথা উল্লেখ করে দুই পক্ষই রাজী হয়েছে রাষ্ট্রপ্রধান ও মন্ত্রীসভা পর্যায়ে নিয়মিত ভাবে সফরের জন্য, তাই সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“সুতরাং দুই পক্ষই উদাহরণ দেখিয়েছে নতুন করে চিন্তাধারার, যা তাদের কাছ থেকে দূরধিগম্য উঁচু পাহাড়ী জায়গার এলাকা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে রয়ে যাওয়া বিতর্কের বিষয়ে আরও বেশী নমনীয়তা দেখানোর দাবী করেছে. এখানে সেটাও আশার সঞ্চার না করে পারে না যে, দুই পক্ষই সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার পক্ষে. ভারত-চিনের আলোচনা আগামী মাস গুলিতে যে আরও সক্রিয় হবে, তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই”.

এটাও ঠিক যে, দিল্লী ও বেজিংয়ে ক্ষমতায় রয়েছেন বাস্তববাদী লোকরা, যাঁরা খুব ভাল করেই বুঝতে পারেন যে, বিরোধের সঞ্চার হলে তার মূল্য কত হতে পারে. ব্রিকস গোষ্ঠীর দুটি প্রতিবেশী দেশকে অনেক কিছুই জুড়ে রেখেছে. তাদের সহযোগিতায় আরও বেশী করেই ভূমিকা নিচ্ছে খুবই শক্তিশালী আর্থ-বাণিজ্য ও বিজ্ঞান- প্রযুক্তি বিষয়ক অংশগুলি. বহু বিশেষজ্ঞের মতে, যদি চিন ও ভারত তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে সহযোগিতা করতে পারে, তবে তারা এই ক্ষেত্রে বিশ্বে নেতৃত্বের অবস্থানে থাকতে পারে. আর এটা এশিয়াতে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে এক শতাব্দীর শুরু করতে পারে.

আরও একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিক গতে পারে জ্বালানী শক্তি: চিন ও ভারত তাদের দ্রুত উন্নতিশীল অর্থনীতির জন্য খুবই বেশী করে জ্বালানীর চাহিদার সম্মুখীণ হয়েছে, আর এটা তাদের কাছ থেকে আরও বেশী সক্রিয় সহযোগিতা আন্তর্জাতিক খনিজ তেল ও গ্যাসের বিষয়ে দাবী করে. তাছাড়া, দুই পক্ষই ঠিক করেছে স্বাধীন বাণিজ্য এলাকার বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার.

উল্লেখযোগ্য হল যে, বিগত সময় পর্যন্ত ভারতীয় ব্যবসা খুবই সাবধান হয়ে চিনের প্রতিযোগীদের খেয়াল করছিল, তারা ভয় পেয়েছিল যে, বাজারে চিনে উত্পাদিত পণ্যের প্লাবন বয়ে যাবে. তা স্বত্ত্বেও, বিগত বছর গুলিতে ভারতীয় ব্যবসায়িক মহলে খুবই গুরুতর পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে. ভারতীয় ব্যবসার বহু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে চিনের দিকে ঐতিহ্য সুলভ সন্দেহ ও ভয়কে ঝেড়ে ফেলা হয়েছে, আর এর জায়গায় ভারতের কিছু নেতৃস্থানীয় কোম্পানী এই দেশে কাজ করতেও শুরু করেছে.

পারস্পরিক স্বার্থ – এটা সেই নিরাপত্তার কুশন, যা সীমান্ত সংক্রান্ত প্রশ্নে লাল সঙ্কেত দেওয়া চিহ্নকে পার হতে দেয় না. কিন্তু এই প্রসঙ্গে দিল্লী ও বেজিংয়ের মধ্যে সম্পর্ক নতুন করে বিন্যাস হওয়াকে দেখা দরকার খুবই সাবধান হয়ে, কোন রকমের ইউফোরিয়া ছাড়াই. কারণ এক ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে, দিল্লী ও বেজিং অন্য ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী থেকেই যাচ্ছে. এই ধরনের একটি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়াচ্ছে এশিয়া ও বিশ্বের বাজারের জন্য তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠা প্রতিযোগিতা.

এলাকা সংক্রান্ত সমস্যা সম্বন্ধে যা বলা যেতে পারে, তা হল যে, তা এখনও সেই পক্ষগুলির জন্য একটা ধীরে হলেও কাজ করতে পারে এমন মাইন হয়ে দাঁড়াচ্ছে. এই সম্বন্ধে মনে করা যেতে পারে যে, সেই আট বছর আগে, ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভেন ঝিয়াবাও এর ভারত সফরের সময়েও কথা হয়েছিল পুরনো এলাকা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করা হবে.

এই সিদ্ধান্তকে তখন বলা হয়েছিল “যুগান্তকারী”. কিন্তু সেই প্রশ্নে হাল এখনও যে কে সেই রয়েছে. সুতরাং আপাততঃ হ্যাপি এন্ড হয়েছে বলাটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে.