শনিবারে তেহরিক–এ-ইনসাফ দলের নেত্রী জোহারই শহীদ হুসেইন হত্যা আবারও সমস্ত তীক্ষ্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তানে গণতন্ত্রের ভিত্তি নিয়েই. নির্বাচনের পরে ক্ষমতা বাটোয়ারা এখনও হয় নি. তার ওপরে আবার – এমনকি পার্লামেন্টেও সমস্ত আসন বন্টিত হয় নি, আর রাজনৈতিক শক্তি গুলি ইতিমধ্যেই একে অপরকে দুষছে আইন ভঙ্গ হয়েছে বলে ও দেশকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের কিনারাতে ঠেলে দিচ্ছে. আর এই পরিস্থিতিতে প্রধান প্রশ্ন হয়েছে: নতুন অসামরিক সরকার কি পারবে আরও কিছু একটা সময়ের মেয়াদ পর্যন্ত দেশে সংবিধান সম্মত নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এই পরিস্থিতিতে কি রকম অবস্থান নেবে?

তেহরিক-এ-ইনসাফ দলের উপ সভাপতি জোহারই শহীদ হুসেইন কিভাবে মৃত্যু বরণ করেছেন, তা স্পষ্ট নয়. পুলিশ আপাততঃ সেই ধারণাকেই মুখ্য বলে মনে করছে যে, তাঁকে লুঠ করার উদ্দেশ্য সফল হয় নি বলেই হত্যা করা হয়েছে. কিন্তু বর্তমানের এমনিতেই টানটান ও বিস্ফোরণ সম্ভব পরিস্থিতিতে এত বড় একজন রাজনৈতিক নেত্রীর মৃত্যু রাজনীতির পক্ষ থেকে উদ্ধৃত না হয়ে পারে নি. আর ঠিক সেটাই ঘটেছে.

পাকিস্তানের তেহরিক-এ-ইনসাফ দল তত্ক্ষণাত ঘোষণা করেছে যে এই হত্যার আয়োজক মত্তাহিদা কৌমি আন্দোলন আর তাদের নেতা আলতাফ হুসেইনের কৃত কর্ম. মত্তাহিদা কৌমি দল এক ধর্ম নিরপেক্ষ দল, যারা বেশীর ভাগই নির্ভর করে রয়েছে ভারত থেকে আসা লোক ও তাদের বংশধর মুহাজিরদের উপর, যাঁরা ঐতিহ্য অনুযায়ী পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শহর করাচিতেই বেশী করে আছেন, আর সেখানেই এই হত্যা করা হয়েছে – তা আবার সেই একটি নির্বাচন কেন্দ্রের ভোট হওয়ার আগেই হয়েছে, যেখানে মত্তাহিদা কৌমি দল সবচেয়ে বেশী করে আপত্তি তুলেছে. ইমরান খান একই সঙ্গে নির্দেশ করেছেন যে, প্রায় এক সপ্তাহ আগেই আলতাফ হুসেইন, লন্ডনের নির্বাসনে থেকে নিজের দলের লোকদের আহ্বান করেছিলেন যাঁরা করাচী শহরে নির্বাচনের ফলাফলে সন্তুষ্ট নয়, তাঁদের সকলের প্রতিই হিংসা মূলক কাজকর্ম করার.

মত্তাহিদা কৌমি দলের নেতৃত্ব নিজেদের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগকেই নস্যাত করেছে, যার পরেও তেহরিক-এ-ইনসাফ দলের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল ও গণ সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে – আর তা শুধু পাকিস্তানেই নয়, বরং লন্ডন শহরেও. প্রসঙ্গতঃ, বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই ভাবেই বর্তমানের নির্বাচনী প্রচারের প্যারাডক্স সামনে এসেছে, যা সেই নির্বাচনের সময়েও ছিল, আর তার পরেও চলছে, যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া বহুলাংশেই শেষ হয়ে গিয়েছে. বোধহয়, গণতন্ত্রের ঐতিহ্য পাকিস্তানে এখনও তত বেশী নয়, যাতে বলা যেতে পারে দেশের ইতিহাসে প্রথম সংবিধান সম্মত ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর এক প্রশাসন থেকে অন্য প্রশাসনের হাতে যাওয়ার ফলে গণতন্ত্রের দিকেই অবধারিত ভাবে মোড় ফিরতে পেরেছে”.

বর্তমানের মুহূর্তের বিশেষত্ব হল এই যে, যদি অধিকাংশ আগের হিংসা মূলক কাজকর্মকে সন্ত্রাসবাদীদের কাজ বলে খোলাখুলি ভাবে বলা যেতে পারা গিয়ে থাকে, যেমন – তেহরিক-এ-তালিবান পাকিস্তানের কাজ বলে, তবে এখন অভিযোগ করা হয়েছে এক ধর্ম নিরপেক্ষ দলের নামে, যারা প্রসঙ্গতঃ, নিজেরাই এই নির্বাচনী প্রচারের সময়ে সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে একাধিকবার.

এটাই শুধু বিশেষ করে উল্লেখ করে যে, সংবিধানের গণতান্ত্রিক গড়ন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে আর সন্ত্রাসের রাজনীতির মধ্যে বর্তমানে পাকিস্তানে সীমারেখা খুবই সূক্ষ্ম. তাই বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই পরিস্থিতিতে বিশেষ করে একটি প্রশ্ন উঠে দাঁড়ায় যে, নতুন অসামরিক প্রশাসন, যা আজ জোর দিয়েই বলা যেতে পারে যে, নেতৃত্ব দেবেন নওয়াজ শরীফ, তারা কি পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম হবে ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে সংবিধান অসম্মত ও অপরাধী মৌলকে শেষ করতে পারবে. একদিক থেকে নওয়াজ শরীফের প্রতি জনগনের তরফ থেকে ভরসার ঋণ দেওয়া হয়েছে একেবারেই বলা যেতে পারে যথেষ্ট মজবুত রকমের: তিনি খুব সম্ভবতঃ, সরকার গঠনও করতে পারবেন, এমনকি তার জন্য তাঁকে অন্যান্য দলের সঙ্গে জোট বাঁধতেও হবে না, যারা আগে জোটের মধ্যে ছিল. কিন্তু, অন্য দিক থেকে, নওয়াজ শরীফ আগেও দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, আর দুই বারেই তাঁর প্রশাসনের ইতি হয়েছে পতন দিয়ে”.

তাই আজ তাঁর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হল সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে সমর্থন পাওয়া, যারা বিগত বছর গুলিতে লোক দেখানোর মত করেই রাজনীতি থেকে দূরে সরে থেকেছে, কিন্তু তা স্বত্ত্বেও পাকিস্থানে রয়ে গিয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি হিসাবেই.

আর সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, অন্তত, প্রথম দিকে সামরিক বাহিনীর লোকরা তৈরী আছে নওয়াজ শরীফের আগামী মন্ত্রীসভাকে সমর্থন করতে. অন্তত পক্ষে এই নিয়েই পাকিস্তানের সামরিক প্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানির সঙ্গে আগামী প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের আলোচনা হয়েছে. এই সাক্ষাত্কার অনেক কারণে একেবারেই অভূতপূর্ব রকমের হয়েছে – আগে কখনও সর্ব্বোচ্চ সামরিক প্রধান পদে আসীন হওয়া আগে আগামী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন নি.

প্রসঙ্গতঃ, আজকের পাকিস্তানে সব কিছুই প্রথম হচ্ছে. প্রশ্ন হল যে, এই ধরনের নতুনত্ব আবার একেবারেই অননুমেয় ঘটনা পরম্পরা প্রসারের কারণ হবে না তো!