শুরু করছি আমাদের সাপ্তাহিক অনু্ষ্ঠান – ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’. অনু্ঠানটি সঞ্চালন করছেন ল্যুদমিলা পাতাকি এবং আমি, জামিল খান.
এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাদের পাঠানো প্রশ্নাবলীর উপর ভিত্তি করে রাশিয়া সম্পর্কে জানিয়ে থাকি.
তাই ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মরিশাসে আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে অনুরোধ যত বেশি সম্ভব প্রশ্ন পাঠানোর. লিখুন, রাশিয়ার বিষয়ে কি আপনাদের কাছে সবচেয়ে আগ্রহোদ্দীপক.

আজ আমরা ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের গোলাবাজার থেকে বদ্রীপ্রসাদ ভার্মা অঞ্জনের পাঠানো প্রশ্নের ভিত্তিতে আরও একজন রুশী চিত্রকর সম্পর্কে জানাবো, যাঁর চিত্রকলায় ভারতের বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল. শিল্পীর নাম – মিখাইল রোমাদিন.

আর ভারতেরই বিহার রাজ্যের গোরাদিহা থেকে ডক্টর হেমন্ত্ কুমার জানতে চেয়েছেন, যে রাশিয়ার কয়েকটি শহর নিয়ে গড়ে ওঠা ‘সোনার বৃত্ত’ বা ‘গোল্ডেন রিংয়ের’ এত মহিমা কেন.
বদ্রীপ্রসাদ ভার্মা অঞ্জন রাশিয়ার চিত্রশিল্পীদের সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন. ভারতের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী, মানুষজন, ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিজেদের আঁকা ছবিতে ফুটিয়ে তোলা রুশী শিল্পীদের দীর্ঘ তালিকা থেকে আজ আমরা বেছে নিয়েছি মিখাইল রোমাদিনকে.

মিখাইল রোমাদিনের জন্ম হয়েছিল চিত্রশিল্পীদের পরিবারে. তার পিতা ও ঠাকুর্দা ছিলেন চিত্রশিল্পের খ্যাতিমান ওস্তাদ. রোমাদিন সর্বরাশিয়া সিনে ইনস্টিটিউট থেকে পাস করে কয়েকটি ছায়াছবির সেট নির্মান ও সজ্জার কাজ করেছিলেন. পাশাপাশি তিনি ছবিও আঁকতেন ও বইয়ের প্রচ্ছদ অলংকরণ করতেন.

মিখাইল রোমাদিন ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ সালে – দুবার ভারত ভ্রমণ করেছিলেন. তিনি গিয়েছিলেন চেন্নাই, মুম্বাই, খাজুরাহো, বেনারস, দিল্লি ও আগ্রায়. মহাবলিপুরম ও কাঞ্চিপুরমের সুপ্রাচীন মন্দিরগুলির স্থাপত্য ও ভাস্কর্য্য এবং মাদ্রাজের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ব্রোঞ্জের পাতের সূক্ষানুসূক্ষ কাজ দেখে তিনি

মুগ্ধ হয়েছিলেন. ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিকতা, ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার নিবিড় সংমিশ্রণ শিল্পীর সৃষ্টিজগতের গভীরে নাড়া দিয়েছিল. তাঁর সৃষ্টিতে ভারতীয় থিমের আবির্ভাব প্রথম ঘটেছিল ১৯৮২ সালে রুশী ভাষায় ছোটদের রামায়ন
বইয়ের অলংকরণের সময়. ঐ বইটির নাম দেওয়া হয়েছিল – ‘রাম, সীতা ও উড়ন্ত বানর হনুমানের লোকগাথা’. তাঁর অলংকরণ ছিল বর্ণোজ্জ্বলতায় বিশিষ্ট এবং সেগুলি একাধিকবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত শিল্পীর ব্যক্তিগত প্রদর্শনীতে দেখানো হয়েছে.

প্রথমবার তাঁর ভারত ভ্রমণের নীটফল বলে চিহ্নিত করা যায় ‘আফানাসি নিকিতিনের যাওয়া আসা’ নামক সুদৃশ্য ট্রিলজি.

‘সমুদ্র পাড়ি’ নামক তাঁর প্রথম ছবিতে শিল্পী ত্ভের শহর থেকে সুদূর ভারতবর্ষে পাড়ি দেওয়া রুশী বণিক আফানাসি নিকিতিনকে এঁকেছেন জাহাজের ওপর. ট্রিলজির দ্বিতীয় ছবির নাম – ‘ভারতে’ – যেখানে আঁকা হয়েছে ভারতীয় মন্দির, মানুষের ভীড়, যার মধ্যে বিশেষ করে চোখে পড়ে লালশাড়ি পরিহিতা এক
নারী, গরম ও আর্দ্র ভূমির গাছপালা. ট্রিলজির শেষ ছবিটির নাম – ‘প্রত্যাবর্তণ, অসুখ’. সেখানে দেখানো হয়েছে আফানাসি নিকিতিনকে কুটিরে,
যেখানে তিনি তাঁর অবিস্মরণীয় পরিব্রজ্যা সম্পর্কে পুস্তকে শেষ আঁচড় দিচ্ছেন. এই ছবিটিতে ভারতের উপস্থিতি একমাত্র নিকিতিনের টেবিলের ওপর বসানো ব্রোঞ্জের নটরাজ মূর্তিতে. মিখাইল রোমাদিন বলেছিলেন, যে এই ছবির ট্রিলজির মাধ্যমে তিনি অসাধারণ পুরুষ আফানাসি নিকিতিনের প্রতি নিজের প্রজন্মের কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করতে চেয়েছেন, তাদের জন্য পরম সুন্দর ও অনন্যসাধারণ ভারতবর্ষের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেওয়ার জন্য.


বিভিন্ন সময়ে আমাদের সম্প্রচার বিভাগের সংবাদদাতারা মিখাইল রোমাদিনের ইন্টারভিউ নিয়েছেন. যেমন, ১৯৮৯ সালে উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বরে তাঁর ব্যক্তিগত প্রদর্শনী চলাকালীন. তাঁর সম্পর্কে বহুবার আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের জানানোর সুযোগ আমাদের হয়েছিল. দুর্ভাগ্যবশতঃ, রোমাদিন গত

বছর প্রয়াত হয়েছেন. কিন্তু তাঁর অলংকরণ করা বইপত্র ও আঁকা ছবি রাশিয়ার বহু সংগ্রহশালার শোভাবর্ধন করে.


আপনারা শুনছেন ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠান. এবার উত্তর দিচ্ছি ডক্টর হেমন্ত্ কুমারের

প্রশ্নের – রাশিয়ার সোনার বৃত্তে অবস্থিত শহরগুলি সম্পর্কে. সোনার বৃত্তের প্রাচীন শহরগুলি মস্কোর চারিপাশ ঘিরে অবস্থিত. এককালে এই শহরগুলি ভূস্বামীদের(নাইটদের) রাজধানী ছিল. আজকাল পর্যটকরা সানন্দে সোনার বৃত্তের রুশী শহরগুলি ভ্রমণ করেন. আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের উপর অতীতের প্রভাব সম্পর্কে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর একটি উদ্ধৃতি এখানে দিতে চাই. তাঁর ‘ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে নেহেরুজি লিখেছিলেন – “অতীত সর্বদাই আমাদের সঙ্গে রয়েছে. আজ আমাদের যা কিছু আছে, সেই সবকিছুর উত্স হল অতীত. তাই অতীতকে বিস্মৃত হওয়ার মানে বর্তমানকেই অস্বীকার করা”. উপরোক্ত কথাকটি রাশিয়া সম্পর্কেও প্রযোজ্য. মস্কোর চারিদিকে অবস্থিত প্রাচীন শহরগুলি তাদের স্থাপত্য,

কৃষ্টি ও হস্তশিল্প নিয়ে আজও আমাদের জন্য অতীতের কিছু দ্বীপ হয়ে বিরাজ করছে.

সোনার বৃত্তের উজ্জ্বলতম মুক্তো নিঃসন্দেহে সুজদাল. বাস্তবেই এটা শহর-মিউজিয়াম. শুধুমাত্র একবারই – দ্বাদশ শতাব্দীর সূচনায় সুজদাল তার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল. তখন মস্কো নগরীর গোড়াপত্তনকারী নাইট দোলগারুকি সুজদালকে তাঁর রাজত্বের রাজধানী করে তোলেন. সাথে সাথে নির্মান করা হল পাথরের ক্রেমলিন(অর্থোডক্স গির্জা সহ প্রাচীরবেষ্টিত দূর্গ), কয়েকটি মঠ, ক্যাথেড্রাল ও গির্জা. অলৌকিকভাবে কালের ছোঁয়াকে ফাঁকি দিয়ে

এখনো অক্ষত রয়েছে কাঠের সব কুটির, কৃষকদের বসতবাটি, তার পার্শ্ববর্তী রাস্তাঘাট. এই সবকিছু পর্যটকদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে রুশী রুপকথাকে বাঙ্ময় করে তুলে.


সুজদাল থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐ দ্বাদশ শতাব্দীতেই ইউরি দোলগারুকির পিতৃদেব নাইট ভ্লাদিমির মানোমাখের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ভ্লাদিমির শহর. তিনি ইতিহাসে তার নাম অবিনশ্বর করার উদ্দেশ্যে শহরটির নামকরণ করেছিলেম নিজের নামে. ভ্লাদিমির শব্দটির অর্থ জাহাঙ্গীর(দুনিয়ার মালিক). সেখানেও শহর পত্তন করার সাথে সাথে শুরু হয়েছিল ক্যাথেড্রাল, পাথরের প্রাচীরবেষ্টিত বহু বুরুজ সম্বলিত দূর্গ নির্মান ও দূর্গের প্রাচীরের বাইরের গায়ে মাটি কেটে গভীর পরিখা খনন. দুর্ভাগ্যক্রমে ভ্লাদিমির শহরে শুধুমাত্র ক্যাথেড্রালগুলি ও দূর্গ প্রাচীরের একাংশ – শহরে প্রবেশপথের উপর তোরণগুলিই আজ পর্যন্ত টিঁকে আছে. ঐ তোরণের নাম– স্বর্ণ তোরণ. ব্যাপারটা হচ্ছে এই, যে দ্বাদশ শতাব্দীতে ঐ তোরণগুলির দ্বার বানানো হয়েছিল ভারী ওককাঠ দিয়ে এবং সেগুলির ওপর সোনার জল করা তামার পাত লাগানো হয়েছিল. তাই লোকের মুখে মুখে ওগুলির নাম হয়েছে – স্বর্ণ তোরণ.
এর পরে পর্যটনের রুট ধরে অবস্থিত সুপ্রাচীন সব রুশী শহর – সের্গিয়েভ পোসাদ, পেরেস্লাভল, রস্তোভ ভেলিকি, ইয়ারোস্লাভল, কোস্ত্রামা, ইভানোভা. এক শহর থেকে পার্শ্ববর্তী শহরের দূরত্ব ৬০-৭০ কিলোমিটার. প্রাচীনকালে ঘোড়সওয়ারিরা দিবালোকে এক দিনে মোটামুটি ঐ দূরত্ব অতিক্রম করতে পারতো এবং আঁধার ঘনিয়ে আসার আগেই দূর্গের প্রাচীরের আড়ালে আশ্রয় নিত. আজকের দিনে উত্সাহী পর্যটকরা টুরিস্ট বাসে ৩ থেকে ৫ দিনে ঐ দূরত্ব অতিক্রম করে. তারা রাত্রিযাপন করে হোটেলে.


গাইডরা আরও একবার নাইট দোলগারুকিকে স্মরণ করে, যখন পর্যটকদের তারা নিয়ে আসে পেরেস্লাভলে. চঞ্চলমতি প্রতিবেশি রাজ্যগুলির হামলা থেকে মস্কোকে আড়াল করার জন্য তিনি ১১৫২ সালে প্লেশেভ হ্রদের তীরে পেরেস্লাভল শহরটির পত্তন করেছিলেন. সপ্তদশ শতকের শেষদিকে এই হ্রদেই প্রথম ছোট

জাহাজগুলি বানিয়েছিলেন তরুন পিটার – রাশিয়ার ভাবী সম্রাট পিটার দ্য গ্রেট. স্থানীয় মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে তাঁর নিজের হাতে গড়া ছোট্ট একটি জাহাজ. অবশ্যই তাকে সাহায্য করেছিলেন স্থানীয় ওস্তাদ কারিগররা.


হস্তলিখিত বর্ণনায় রস্তোভ ভেলিকির নাম প্রথমবার উল্লিখিত হয়েছিল ৮৬২ খ্রীষ্টাব্দে. নেরো হ্রদের দিক থেকে এই শহরের ক্রেমলিনটাকে দেখতে অপরূপ লাগে. হ্রদের স্বচ্ছ, প্রশান্ত জলরাশির দিগন্তে আগাগোড়া শ্বেতপাথরের অনন্যসুন্দর রস্তোভ আকাশের দিকে নিজেকে মেলে ধরেছে. রস্তোভের স্থাপত্য সমাহারের কম দুর্যোগ অতিক্রম করতে হয়নি. এর ক্ষয় ঘটিয়েছে সময়, মানুষের অবহেলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ. তবু শহরটি প্রতিবার আবার গড়ে তোলা হয়েছে. আজ রস্তোভ রুশদেশের পরম গর্বের সম্পদ. পর্যটকরা এখানে আরও আসে ১৩টি স্থানীয় গির্জার ঘন্টাধ্বনির অপূর্ব মূর্চ্ছনা শোনার জন্য. উনবিংশ শতাব্দীর মহান রুশী সুরকার মিখাইল গ্লিনকা ও মোদেস্ত মুসোরস্কিকে প্রচন্ড নাড়া দিত এই ঘন্টাগুলির সুরতান.

প্রাচীন রুশী শহর ইয়ারোস্লাভল, কোস্ত্রামা, ইভানোভাও কম আকর্যক নয়. রুশীরা এই সব শহরে আসে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ছোঁয়া পেতে, সুদূর অতীতের সাথে আজকের দিনের আত্মীকতা অনুভব করতে. আর বিদেশী পর্যটকরা এই সব শহরে এসে প্রাচীন রুশদেশের অন্তরস্থলে উঁকি দিয়ে দেখা, তার অনবদ্য সব গির্জা, হাতে খোদাই করে অলংকৃত কাঠের কুটির, সুদৃশ্য বাগান, বাগিচার সৌন্দর্য্য উপভোগ করার

সুযোগ পায়. অবশ্যই এগুলির পুনর্নির্মান করা হয়েছে বহুবার. ...তাসত্বেও এই শহরগুলি দেখে প্রাচীন রুশীদের জীবনযাত্রা সম্মন্ধে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়.



 আমরা আপনাদের কাছ থেকে রাশিয়া সম্পর্কে চিত্তাকর্ষক নতুন নতুন প্রশ্নের

অপেক্ষায় থাকবো. ইন্টারনেটে আমাদের কাছে চিঠি লেখবার ঠিকানা – letters a ruvr.ru