সোমবার মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি থেইন সেইন সরকারি সফরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছাচ্ছেন - গত ৪৭ বছরের মধ্যে এটাই প্রথম এই ধরনের সফর. আমেরিকা-মায়ানমারের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির পক্ষের লোকরা আগামী সফরকে বলছেন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন মাইল প্রস্তর ও ওয়াশিংটনের তরফ থেকে মায়ানমারে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সহায়তার সাক্ষ্য. সমালোচকরা জোর দিচ্ছেন যে, মায়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আজও সমানে চলেছে. কিন্তু যেমন প্রায়ই এটা হয়ে থাকে, মানবাধিকার এই ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে স্রেফ একটা ধোঁয়াশা হিসাবে, যা দরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও বড় রকমের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য, যার মধ্যে মুখ্য হল – মায়ানমার দেশকেই চিনের প্রভাব থেকে বের করে আনা ও নিজেদের জন্য স্ট্র্যাটেজিক ভাবে একটা গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দাঁড়ানোর জায়গা তৈরী করা.

প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে মায়ানমারে শাসন করেছে সামরিক কর্তৃপক্ষ. এই দেশের বিরুদ্ধে পশ্চিম থেকে খুবই কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছিল ও বাস্তবে মায়ানমারের একমাত্র জোট সঙ্গী দেশ ছিল চিন.

২০১১ সালে মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন প্রাক্তন জেনারেল থেইন সেইন, যিনি দেশের ভেতরে গণতান্ত্রিক প্রশাসন করার পথ ধরেছিলেন ও পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে বেশী করে খোলা হওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন. কয়েকশো রাজনৈতিক বন্দীকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, আর বিরোধী পক্ষের নেতা নোবেল বিজয়িনী আউন সান সু চ্ঝি, যাঁকে দীর্ঘদিন গৃহবন্দী রাখা হয়েছিল, তাঁকেও ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, এমনকি তিনি দেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনেও জয়ী হতে পেরেছিলেন.

পশ্চিম নিজেদের অবস্থানকে নরম করেছিল ও বেশীর ভাগ নিষেধাজ্ঞাই তুলে নিয়েছিল. গত বছরের নভেম্বরে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ইতিহাসে প্রথম কোনও আমেরিকার রাষ্ট্রপতির মায়ানমার সফর সম্পন্ন করেছিলেন.

কিন্তু সেই সমস্ত সংশোধন, যা মায়ানমারে করা হয়েছে, তা অর্ধেক হয়েই রয়ে গিয়েছে. তার ওপরে প্রজাতিগত ও ধর্মমত নিয়ে সংঘর্ষ এই দেশে বিগত কয়েক বছরে শুধু বেড়েই গিয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“গত বছরে পশ্চিমের রাজ্য রাখাইন জুড়ে বেশ কিছু রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের উপরে আক্রমণ করেছে বুদ্ধ ধর্মের নাম নিয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠ লোকরা, এই সব ধ্বংসের ফলে প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে ও প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার লোক ঘর হারিয়েছেন ও এখনও অবধি উদ্বাস্তু ক্যাম্পে খুবই শোচনীয় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, এই সব ঘটনা প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর সরাসরি প্রশ্রয়ে যদি না ঘটেও থাকে, তবুও তাদের মদতেই হয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মায়ানমারের রাষ্ট্রপতির আগামী সফরের প্রাক্কালে মূল্যায়ণ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে নানা রকমের.

থেইন সেইনের দপ্তর প্রধান জাউ হ্তাই ফ্রান্স প্রেস সংস্থাকে বলেছেন যে, এই সফরের অর্থ হল যে, ওয়াশিংটন মায়ানমারের বসন্তকে সমর্থন করেছে, আর এই বসন্ত আরব বসন্তের চেয়ে অনেক নির্দিষ্ট ও সেই সমস্ত মূল্যবোধকেই নিয়ে চলছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে প্রচার করতে চেয়েছে.

হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধি জে কার্নি উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্রপতি ওবামা আশা করেন মায়ানমারের জনগনের জন্য যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা খুলে যাচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনার ও সেটাও, যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে কি সাহায্য করতে পারে.

নিজেদের দিক থেকে মানবাধিকার রক্ষা কর্মীরা উল্লেখ করছেন যে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি মানব সমাজের বিরুদ্ধে করা অপরাধের দিকে ও প্রজাতিগত বাছাই করার দিকে তাকাচ্ছেন না, যা আজ মায়ানমারে ঘটছে, আর তারা এমনকি সেখানের পরিস্থিতিকে সরাসরিই বলছেন অ্যাপারথেইড বলে. এই প্রসঙ্গে ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আসলে মানবাধিকারের প্রশ্ন - এটা স্রেফ একটা ধোঁয়াশা, যা আরও গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ের জন্য ছড়ানো হচ্ছে. মায়ানমার এই সেদিনও চিনের মুক্তামালা নীতির জন্য একটি স্ট্র্যাটেজিক কেন্দ্র ছিল. মায়ানমার দিয়ে চিনের দক্ষিণের এলাকায় আফ্রিকা ও নিকট প্রাচ্য থেকে আনা জিনিষপত্রের সবচেয়ে নাতিদীর্ঘ পথে সরবরাহ করা সম্ভব. এই ক্ষেত্রে খুবই মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে চিনের সহায়তায় নির্মিত চাউফু (ক্যায়ুকফু)বন্দর, যা সেই রাখাইন রাজ্যেই রয়েছে. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা ২০১১ সালের শেষে এশিয়াতে ফিরে আসা নিয়ে তাদের স্ট্র্যাটেজিক ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বলেছে, তারা বিশ্বের এই অংশে চায় চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে কম করতে”.

এই স্ট্র্যাটেজিতে আন্তর্প্রজাতি দ্বন্দ্ব খুব ভাল করেই খাপ খেয়ে যায়. সেই পুরনো নীতি বিভেদ করো ও শাসন করো শুধু চিনের বড় পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্প তৈরী করাতেই সমস্যা সৃষ্টি করে না, বরং অনেক রকম ভাবে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কলকাঠি হাতে ধরে রাখতে সাহায্য করে. সুতরাং ওয়াশিংটন, দেখাই যাচ্ছে যে, এর পরেও খুবই বাছাই করে মায়ানমারে মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করবে – যেমন, অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রেও করে থাকে, এই কথাই উল্লেখ করেছেন বরিস ভলখোনস্কি.