গত শতাব্দীর আটের দশকে স্বদেশী ও ইউরোপীয় চিত্রতারকাদের অভিনয় সমৃদ্ধ তেহেরান-৪৩ ছায়াছবিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল. ফিল্মটিতে বর্ণনা করা হয়েছিল, যে কিভাবে সোভিয়েত গুপ্তচর বিভাগ ১৯৪৩ সালে ত্রয়ী মহাশক্তির শীর্ষনেতাদের সম্মেলন চলাকালে তাদের হত্যা করার প্রচেষ্টা বানচাল করতে পেরেছিল. সম্মেলনে সোভিয়েত রাষ্ট্রনায়ক স্তালিন, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট ও বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ফ্যাসিস্ট জার্মানী ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে গ্রহণীয় রণকৌশল নিয়ে আলোচনা করছিলেন. ততদিনে জার্মান বাহিনী একের পর এক লড়াইয়ে পর্যুদস্ত হচ্ছিল. তবে যুদ্ধের স্রোতধারার চূড়ান্ত মোড়বদল তখনো হয়নি এবং হিটলারের কাছে তখনো সুযোগ ছিল বৃহত ত্রয়ীকে নতজানু করিয়ে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার. তেহেরান-৪৩ ছায়াছবিটিতে দর্শকদের শিরদাঁড়া টানটান করে আসনে বসিয়ে রাখার সকল উপাদানই উপস্থিত ছিল – গুপ্রচরদের কাহিনী, প্রাণপণে তাড়া করা, গুলি বিনিময় এবং অবশ্যই ভালোবাসা. কিন্তু এটা সিনেমা মাত্র, বাস্তবে কি ঘটেছিল?

   স্তালিন, রুজভেল্ট ও চার্চিলের সাক্ষাত্কারের খবর জার্মান গুপ্তচর বিভাগ জানতে পেরেছিল মার্কিনী সামরিক নৌবাহিনীর গোপন কোড উন্মোচন করে. হিটলারের ব্যক্তিগত নির্দেশে দীর্ঘ লাফ নামক অপারেশনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল. জার্মান অন্তর্ঘাতীদের একটি দলের কর্তব্য ছিল লুকিয়ে তেহেরানে প্রবেশ করে চার্চিলের জন্মদিন, ৩০শে নভেম্বর স্থানীয় জার্মান গুপ্তচরদের চক্রের সহায়তায় তিন রাষ্ট্রনায়ককে খতম করার. ১৯৪৩ সালের শরত্কালে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬ জন জার্মান চর সেই উদ্দেশ্যে ইরানের রাজধানীতে আসে স্থানীয় জার্মান গুপ্তচরদের ভরসায়.

    কিন্তু সোভিয়েত গুপ্তচর বিভাগ শত্রুর ফন্দি ধরতে পেরে নাশকতাপ্রয়াসীদের পাকড়াও করার জন্য সমস্ত শক্তি সন্নিবেশ করলো. প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছিল তারাঃ বহুলক্ষ জনবসতি সমৃদ্ধ নগরে তারা খুঁজে বের করেছিল সন্ত্রাসবাদীদের আস্তানা. তাদের উপর নজরদারী জারি করে ইরানের কিছু সামরিক কর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের সাথে তাদের যোগাযোগ আবিষ্কার করা হয়. বার্লিনের সাথে ওয়ারলেসে বাক্যালাপের কোড ভেঙে ফেলা হয়. শীঘ্রই নাশকতাপ্রয়াসীদের গ্রেফতার করা হল, দীর্ঘ লাফ অপারেশন ভেস্তে গেল.

    মহাত্রয়ী তিন সাম্রাজ্যের নেতারা তাঁদের জীবন রক্ষা পাওয়ার জন্য কার কাছে ঋণী ছিলেন ? কেবলমাত্র ইদানীংকালে সেটা জানা গেছে. পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রস্তুত করা নাত্সীদের অপারেশন ভেস্তে দিয়েছিল একদল সোভিয়েত তরুন, যাদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সী গুপ্তচর গেভোর্ক ভর্তানিয়ান. তার পিতা আন্দ্রেই ভর্তানিয়ান ছিলেন তেহেরানে কনফেকশনারি ফ্যাক্টরির মালিক এবং সোভিয়েত গোয়েন্দা বাহিনীর স্থায়ী স্থানীয় প্রতিনিধি. ১৬ বছর বয়সে গেভোর্ক ব্যবসা ও গোয়েন্দাগিরিতে বাবার সহযোগী হয়ে ওঠে. ঐ কিশোর সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থক সাতজন তরুনকে বেছে নিয়েছিল. তারা কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণই পায়নি. পেশাগত চাতুর্য্য তারা নিজেরাই আয়ত্ত করেছিল. ১৯৪০ সাল থেকে ছেলেরা তেহেরানে কর্মরত জার্মান গুপ্তচরদের উপর নজর রাখতো, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তাদের গুপ্তচরের জালের হদিশ করতো. ছেলেরা নগরে যাতায়াত করতো সাইকেলে চড়ে আর তাই ঠাট্টা করে তাদের হাল্কা অশ্বারোহী বলে ডাকা হত. দুই বছর কাজের সময়ের মধ্যে অশ্বারোহীরা হিটলারের স্বপক্ষে কাজ করা ৪০০ ইরানিকে আবিষ্কার করে হাতেনাতে ধরেছিল.

    ১৯৪৩ সালের শরত্কাল অশ্বারোহীদের জন্য ছিল ভারী উত্তপ্ত. প্রয়োজন পড়েছিল যে কোনো মূল্যে তিন মহারথীর হত্যাপ্রয়াসী জার্মান অন্তর্ঘাতীদের চিনে বার করা. – “আমরা দিনে ১৭ ঘন্টা করে রাস্তাঘাটে জার্মান গুপ্তচরদের গতিবিধি অনুসরন করতাম, ওয়ারলেসে তাদের কথাবার্তা আড়ি পেতে শুনতাম– গল্প করেছিলেন গেভোর্ক ভর্তানিয়ান. দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তরুন সোভিয়েত গুপ্তচরদের মনোযোগ আকর্ষন করেছিল সোভিয়েত ও বৃটিশ রাষ্ট্রদূতাবাসের অনতিদূরে অবস্থিত একটি নাতিবৃহত্ ভিলা. শীঘ্রই তারা ঐ ভিলা থেকে বার্লিনের সাথে কথাবার্তা ট্যাপ করে শোনে. তার পরে কি ঘটেছিল – সে আমাদের জানা.

    গেওর্গ ভর্তানিয়ান ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ইরানে কাজ করেছিলেন. সেখানেই তার পরিচয় হয়েছিল হবু পত্নী হোয়ারের সাথে. পঞ্চাশের দশকের শেষাশেষি গেভোর্ক আর হোয়ার ভর্তানিয়ান ছদ্মবেশি সোভিয়েত গুপ্তচর হয়ে দাঁড়ান. বিভিন্ন ছদ্মনামে তারা অর্ধেক বিশ্ব পরিভ্রমণ করেছিলেন, অসংখ্য দেশে দায়িত্বপূর্ণ টাস্ক পূরণ করেছিলেন ও একবারও বিফল হননি. পরবর্তীকালে গেওর্ক ভর্তানিয়ান বলেছিলেন, যে তেহেরান-৪৩ এর সঙ্গে তুলনাযোগ্য বড়মাপের বহু সাফল্য তারা অর্জন করেছিলেন, কিন্তু সেসব সম্পর্কে গল্প করার সময় এখনো আসেনি.

    কয়েক বছর আগে গেওর্ক ও হোয়ার ভর্তানিয়ানের নাম প্রকাশ্য আলোকে আনা হয়. ২০০৭ সালে সোভিয়েত গুপ্তচরের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন উইনস্টন চার্চিলের নাতনি সেলিয়া স্যান্ডিস. তার বহুদিনের স্বপ্ন ছিল সেই মানুষটির করমর্দন করার, যিনি একদিন তার পিতামহের জীবন রক্ষা করেছিলেন.

    সোভিয়েত ইউনিয়নের বীর শিরোপায় ভূষিত গেওর্ক ভর্তানিয়ান ৮৮ বছর বয়সে ২০১২ সালে পরলোকগমন করেন. এই অসামান্য গুপ্তচরের অন্যান্য সফল কীর্তির কথা জানার আগে বহু কাল কেটে যাবে. তবুও অনেক কাহিনী খুব সম্ভবতঃ মহাফেজখানায় একান্তই গোপনীয় তকমা আঁটা বাক্সে বন্দী অবস্থায় পড়েই থাকবে.